আমি নীরব কই: সু চি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিপীড়নে নীরবতার জন্য সমালোচিত দেশটির নেত্রী অং সান সু চি বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি মোটেও নীরব নন, মানুষ কেন এটা বলছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিদোতে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তিনি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে দুই নেতার বক্তব্য এবং প্রশ্নোত্তরের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

ফক্স নিউজের প্রতিবেদক সেরাফিন গোমেজ তার প্রশ্নে বলেন, ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন এখানে এসেছিলেন তখন এদেশে গণতন্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য আপনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। এই মানবিক সংকট দেখা দেওয়ার পর এ বিষয়ে নীরবতার জন্য আপনার অনেক সমালোচনা হয়েছে। আপনি এই সংকট নিয়ে নীরব কেন?

জবাবে সু চি বলেন, “আমি ‍বুঝতে পারছি না লোকে কেন বলছে আমি নীরব ছিলাম। আমি নীরব নই।

“প্রকৃতপক্ষে, আমার দপ্তর থেকে বহু বিবৃতি দিয়েছি এবং আমি নিজের থেকেও বিবৃতি দিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে, আমি যা বলছি তা মানুষের কাছে ততটা আগ্রহের ঠেকছে না।

“কিন্তু আমি যা বলছি তা চমকপ্রদ হওয়ার জন্য নয়, তা-ই যথার্থ। লোকজনকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় না করিয়ে আরও সম্প্রীতি সৃষ্টি এবং সবার জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরিই আমার বক্তব্যের লক্ষ্য।”

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গার পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর পদ নিয়ে কার্যত সরকারপ্রধান অং সান সু চি।

রোহিঙ্গাদের ওপর এই সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধনের’ চেষ্টা হিসেবে দেখছে জাতিসংঘ। সেখানে ‘গণহত্যা’ চলছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই নিষ্ঠুরতা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সমালোচিত সু চি ইতোমধ্যে তাকে নানা সময়ে দেওয়া বিভিন্ন সম্মাননা হারিয়েছেন।

সু চির সমালোচনা করে আইরিশ সঙ্গীতজ্ঞ ও অধিকারকর্মী বব গেলডফ গত সপ্তাহে তার সঙ্গে পাওয়া সম্মাননা ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেন।

এর আগে গত মাসে সু চির ‘ফ্রিডম অব দি সিটি অব অক্সফোর্ড অ্যাওয়ার্ড’ প্রত্যাহার করে যুক্তরাজ্যের এই শহর কর্তৃপক্ষ। তার আগে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্ট হিউ কলেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয় তার প্রতিকৃতি।

গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে এক যুগ আগে সু চিকে দেওয়া সম্মাননা সেপ্টেম্বরে স্থগিত করে যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম ট্রেড ইউনিয়ন- ইউনিসন।

প্রশ্নোত্তরে সু চি বলেন, “আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, রাখাইনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে এবং তাদের যদি দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও সৌহার্দ্যের সাথে একসঙ্গে বাস করতে হয় তাহলে এখন আমরা তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না।

“আমরা এমন ধরনের বিবৃতি দিতে পারি না, যা তাদের আরও দূরে ঠেলে দেয়। বক্তব্য নিয়ে আমাদের অধিক সতর্ক থাকার এটাই কারণ। কিন্তু আপনি যদি পরীক্ষা করেন দেখবেন আমি নীরব ছিলাম না।”

তিনি বলেন, “আমি উসকানিমূলক বা চমক সৃষ্টিকারী বিবৃতি দিচ্ছি না, কিন্তু কী ঘটছে এবং পরিস্থিতির উত্তরণে কী করার চেষ্টা করছি, সে বিষয়গুলো সব সময় জনগণকে অবহিত করেছি।”

সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন।

তিনি বলেন, “রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সেইসঙ্গে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।

“এ বিষয়ে সব বৈঠকে আমি মিয়ানমার সরকারের প্রতি একটি কার্যকর স্বাধীন তদন্তে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দলকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে বলেছি।”

রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগের বিবরণ দিলেও তা অস্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।

এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর মঙ্গলবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, নারীদের ধর্ষণ, গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা লুটপাটের কোনো ঘটনায় ‘সেনা সদস্যরা জড়িত নয়’।

সূত্র: বিডিনিউজ।