সহোদর শিশু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ ও শোকসভা – ‘হত্যাকারীদের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে হবে’

হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী, নাইক্ষ্যংছড়ি :
রামুর গর্জনিয়ার বড়বিল গ্রামের সহোদর শিশু শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান শাকিল ও মোহাম্মদ হোছাইন কাজলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল আইনে হবে বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল।

৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় গর্জনিয়ার বড়বিল গ্রামে আয়োজিত হাসান-হোছাইন হত্যার প্রতিবাদ ও শোক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, রামুর ইতিহাস সম্মানের। রামুর মানুষ সব সময় সম্মান এনে দিয়ে রাজনীতি, শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছেন। কিন্তু এক শ্রেণীর মানুষ অপরাধ কর্মকান্ড সংঘটিত করে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার পাশাপাশি উন্নয়নের ব্যাঘাত ঘটাতে তৎপর।

আবেগ আপ্লুত হয়ে সাইমুম সরওয়ার আরো বলেন, ইসলামের ইতিহাসে প্রথম কারবালার প্রান্তে হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোছাইনকে হত্যা করা হয়েছিল। ঠিক তেমনি ভাবেই কয়েক হাজার বছর পর রামুর গর্জনিয়ার হাসান-হোছাইনকে হত্যা করেছে অপরাধীরা। যা খুবই লজ্জাজনক। এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ ছাড় পাবে না। তাদেরকে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

বড়বিলের ইউনুছ মাতবরের সভাপতিত্বে ও আয়ামীলীগ নেতা ইয়াহিয়া চৌধুরীর পরিচালনায় আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) মোহাম্মদ কায় কিসলু, পেকুয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মনজুরুল ইসলাম, গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী, সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই আনিছুর রহমান, উপজেলা সৈনীকলীগের সভাপতি ইউনুস খান, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক তপন মল্লিক, গর্জনিয়ার বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা হাবিব উল্লাহ চৌধুরী প্রমূখ।

প্রতিবাদ সভায় শত শত মানুষ উপস্থিত হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ নেন। আলোচনা সভা শেষে সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল নিহত হাসান-হোছাইনের পিতা মোহাম্মদ ফোরকান ওরপে মিন্টুকে সমবেদনা জানান। এই সময় তিনি তাদেরকে নগদ অর্থ প্রদান করেন।

জানা গেছে, গত ১৯ জানুয়ারি দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পুলিশ-জনতার উদ্ধার অভিযান চলাকালে অপহরণকারিরা রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বড়বিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফোরকানের বড় ছেলে মোহাম্মদ হাসান শাকিল (১০) ও মোহাম্মদ হোছাইন কাজল (০৮) কে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহত হাসান বাইশারী শাহ নুরুদ্দিন মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণির এবং হোছাইন নারিজবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র।

অপহরণের পর দুই শিশুকে বর্বরোচিতভাবে হত্যার ঘটনায় জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ফুসে উঠে গর্জনিয়াবাসী। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কোমলমতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিরা।

সহোদর দুই শিশু হত্যাকারিদের ফাঁসি এবং শিশুদের নিরাপত্তার দাবিতে ২৪ জানুয়ারি গর্জনিয়ায় মানবন্ধন-সমাবেশ করেছে শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এর আগে ২১ জানুয়ারি বেলা ১২টার দিকে গর্জনিয়ার বড়বিলে হাসান-হোছাইন হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে লাঠি হাতে বিক্ষোভ মিছিল করে এলাকাবাসী। এসময় আটককৃত ও পলাতক সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তারা।

পুলিশ সূত্র জানায়, হত্যাকান্ডের ঘটনায় বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ১২ জনের মধ্যে ৯ জনকে গত ২১ জানুয়ারি দুপুরে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিয়িশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে দশ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কায় কিসলু। রিমান্ড আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারক নিশাদুজ্জামান ৮ আসামীর বিরুদ্ধে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।

তারা হলেন, গর্জনিয়া ১নং ওয়ার্ডের বড়বিল এলাকার আব্দু শুক্কুরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, মৃত মো. নবীর ছেলে ইমাম হোসেন ওরফে টুইল্যা, আমির হোসেনের ছেলে আলমগীর হোসেন, আব্দুল্লাহ, মো. ইউনুস, রুমান উদ্দিন ওরফে নোমান, লাইলা বেগম ও রশিদা বেগম। রিমান্ড চালাকালিন সময়ে ২৪ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে তিনটায় কক্সবাজার সিনিয়র জুডিয়িশাল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাদুজ্জামানের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে দুই সহোদর হত্যার দায় স্বীকার করেছেন মামলার অন্যতম আসামী জাহাঙ্গীর।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) মোহাম্মদ কায় কিসলু জানান, হত্যাকান্ডের সমস্ত তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে। এ ঘটনায় আটককৃতরা ছাড়াও আরও ৫ ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। তাদেরকেও আটকের মধ্য দিয়ে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, ১৭ জানুয়ারি (রোববার) বিকেলে বাড়ির পাশে খেলা করার সময় অপহরণকারি চক্র মোহাম্মদ হাসান শাকিল ও মোহাম্মদ হোছাইন কাজলকে অপহরণ করে। পরে অপহরণকারিরা শিশুদের অভিভাবকদের মোবাইল ফোনে কল করে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

অপহরণের পর থেকে তিনদিন পুলিশ ও স্থানীয় জনতা রামুর বড়বিল, থিমছড়ি, বাইশারী, ঈদগড় সহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় নিষ্ফল অভিযান চালায়। পরে গত ১৯ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) রাত সোয়া একটার দিকে বড়বিলের একটি বাগান থেকে শিশুদের লাশ উদ্ধার করা হয়। অনেকের ধারণা সন্ত্রাসীরা মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে পুলিশ-জনতার উদ্ধার অভিযানের মূখে তাদেরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন।

প্রসঙ্গত, গেল ২০১৪ সালের ১১ আগষ্ট রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বড়বিল গ্রামের নারাইম্মা ঝিরি নামক গহীন এলাকায় হাত-পা ও গলা কেটে আব্দুল মাবুদের ছেলে মো.ইলিয়াছ (২৭) ও আব্দুল মোনাফের ছেলে আব্দুর রহিম (২৬) কে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। উক্ত স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এখনো সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় ফের জোড়া হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।