অনলাইনে কিছু লিখলে কি জেলে যেতে হবে?

সাম্প্রতিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (২০০৬) আইনের সংশোধনীর ফলে মুক্তচিন্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন আলোচকেরা। কী ধরনের লেখার ফলে কী পরিমাণ শাস্তি হতে পারে, কিংবা কোন ধরনের ছবি আপলোড করলে দেশের বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে অথবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে কী ধরনের স্ট্যাটাসের ফলে সাত থেকে ১৪ বছরের জেল হতে পারে, তা নিয়ে ভাবিত তাঁরা।গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের সংশোধনী: মুক্তচিন্তার অন্তরায়?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব অভিমত ও আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। বৈঠকের আয়োজক প্রথম আলো। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্য জুনাইদ আহমেদ বলেন, ‘সব ধরনের আইন সংশোধনযোগ্য। আমরা চাই এ আইন যেন “মুক্তচিন্তার রক্ষাকবচ” হয়।’ তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি এই আইনের সংশোধনীর ক্ষেত্রে আপত্তির দিকগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট পরামর্শসহ মতামত প্রদানের জন্য সবার কাছে অনুরোধ জানান। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, এ আইনের সংশোধনীর বিষয়ে পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে মতামত নেওয়া হয়েছে। আইনটি সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল সাইবার অপরাধের মাত্রা কমিয়ে আনা। তিনি এ আইন থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিধান সরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, এতে করে ক্ষতিগ্রস্তরা সহজে আইনের সাহায্য পাবেন।

সংশোধিত আইনের বিশ্লেষণ করে আইনজীবী তানজিব-উল-আলম বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার আওতাভুক্ত অপরাধমূলক বিষয়সমূহকে অত্যন্ত শিথিলভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে বিল উত্থাপন ছাড়াই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অপরাধসংক্রান্ত বিধানাবলির সংশোধন কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য নয়। একে তিনি ‘ড্রাকনিয়ান আইন’ (অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম) বলে অভিহিত করেন।

তিনি বৈঠকে এই আইনের অপরাধ সংজ্ঞায়নের অস্পষ্টতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে (পুলিশ) সীমাহীন ক্ষমতায়ন, লঘু পাপে গুরুদণ্ড, গণভীতি সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা, বিশেষ করে গণজাগরণোত্তর বিভিন্ন ঘটনা মোকাবিলায় সরকার দ্রুত এই পথ বেছে নিয়েছে। তিনি মনে করেন, সংশোধিত এই আইন দিয়ে ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগও করা যাবে না। বরং এই আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীর ফলে আইনটি বাকস্বাধীনতার অবসান এবং জনসাধারণের হয়রানির একটি হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি আইনের মৌলিক সূত্রের পরিপন্থী এমন অধ্যাদেশ জারি করে সরকার মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করতে চায়। ৫৭ ধারায় অনির্দিষ্ট অথবা অস্পষ্ট শব্দগুচ্ছ, যেমন ‘রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়’, ব্যবহারের মাধ্যমে ফৌজদারি আইনের ‘সুনির্দিষ্ট নীতি’র মৌলিক অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত যেকোনো নির্দোষ বা ন্যায়সংগত অনলাইন প্রকাশনা বা সম্প্রচারকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মর্জিমাফিক শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

আইটি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, আইনের এই ধারা তথ্য অধিকার আইন, তথ্যনীতি, ডিজিটাল বাংলাদেশ নীতি ও কার্যক্রমের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এমনকি আইনটিতে তদন্তের কোনো সংজ্ঞা নেই। এমনকি ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি।

ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ এই আইনকে ‘ভীতিকর’ উল্লেখ করে বলেন, এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া যাঁরা এখন আইনের বাস্তবায়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন কিছুদিন পর তাঁরাই আবার এ আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম ‘ইন্টারনেটকে জেলখানা’ মনে করবে উল্লেখ করে বেসিসের মহাসচিব রাসেল টি আহমেদ বলেন, এমন একটি সময়ে এই সংশোধন আনা হলো, যখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা তড়তড়িয়ে বাড়ছে। গত তিন মাসেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ২০ লাখ নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ বছরের শেষে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময় ব্যবহারকারীদের সামনে এ ধরনের সংবিধান পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক আইন করার আগে আরেকটু সময় নেওয়া উচিত ছিল।

সামহয়্যারইন ব্লগের পরিচালক সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস বলেন, ৫৭ ধারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী, তাই অবশ্যই এই ধারা বাতিল করা প্রয়োজন।

প্রথম আলোর ব্লগ সঞ্চালক নুরুন্নবী চৌধুরী বলেন, কখন কোন পোস্ট আপলোডে কোন সমস্যা হতে পারে, তা কেউ জানে না। তিনি মনে করেন অনেক তাড়াহুড়ো করে এ আইনের সংশোধন করা হয়েছে।

উৎসঃ প্রথম আলো