এসো হে বৈশাখ- বাঙালির সর্বজনীন প্রাণের উৎসব আজ

এম.এ আজিজ রাসেল:
কালের যাত্রা নিরন্তর, নিরবধি। মহাকালের রথ সেই পথযাত্রায় পেরিয়ে গেল ১৪২৩ বাংলা বর্ষের সীমারেখা। আজ পহেলা বৈশাখ, বঙ্গাব্দ ১৪২৪। নতুন বছরের পরিক্রমা শুরু হলো বাঙালির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে। নতুন আলোর কিরণধারায় শুরু হলো সুন্দর আগামীর পথচলা। আজ বৈশাখী উৎসব। আজ সকাল ৮টায় পাবলিক লাইব্রেরী থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বের হয়েয়ে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বসেছে বৈশাখী মেলা।

এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তারকা মানের হোটেল গুলো পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান পালন করছে।

পূর্বাকাশে লাল টকটকে সূর্যের কিরণচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ার আগেই নতুন স্বপ্নের উচ্ছ্বাস নিয়ে ঘুম ভেঙেছে প্রতিটি বাঙালির। জরা-জীর্ণকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করে নিতে গেয়েছে বৈশাখী গান। জোরালো কণ্ঠে ধ্বনিত হল জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।

বাংলা নববর্ষে মহামিলনের এ আনন্দ উৎসব থেকেই অনুপ্রেরণা নেবে বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করার। কুসংস্কার আর কূপম-ূকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। আজ বাঙালির সবচেয়ে বড় অসম্প্রদায়িক উৎসব।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এক অভিন্ন হৃদয়াবেগ নিয়ে মিলিত হবে একই উপলক্ষে। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে গৌরব বোধ করে। এই গৌরব ও চেতনাই বাঙালিকে প্রেরণা জুগিয়েছে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। আজ গোটা দেশজুড়ে সুরে সুরে ধ্বনিত হল জাতির মঙ্গলবার্তা। আর এই মঙ্গলালোকে স্নাত হতে বাঁধভাঙা জোয়ারে মানুষ আছড়ে পড়বে শহর-বন্দরসহ প্রতিটি জনপদে। গোটা রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হল এক অভাবনীয় দৃশ্যের। সকালে শহীদ দৌলত ময়দানে সুর ধ্বনিতে মানুষের যে অংশগ্রহণ দিনমান এমনই ব্যস্ততা সবখানে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক এ উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা গোটা দেশ।

হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত সমৃদ্ধ এ সংস্কৃতির চেতনা বিকশিত বাঙালির দেহ-মনে। বসনে-ভূষণে বৈশাখকে ধারণ করে বাঙালি আজ মেতে উঠেছে প্রাণের জোয়ারে। বাঙালির ঘরে ঘরে নানা আচার-আয়োজনে নববর্ষের নানা আয়োজন।

সে সঙ্গে পান্তা ইলিশ, মুড়ি-মুড়কি, খই আর মিঠাই বাতাসার স্বাদ গ্রহণের হিড়িক। আড্ডা, আমন্ত্রণ, উচ্ছ্বাসে কেটে যাবে গোটা দিন। বিশেষত, ঢাকায় শহুরে নাগরিকদের গৎবাঁধা জীবনযাত্রায় যোগ হবে ভিন্নতার স্বাদ। সকালেই নগরবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে সুসজ্জিত হয়ে। নারীরা পরবেন লাল-সাদা শাড়ি, পুরুষের পরনে নকশা করা পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকবে গালে, বাহুতে আলপনা আঁকা ফুটফুটে শিশুরা।

প্রভাতী গানের আসর, মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্রসরোবরে গানের আসর, বৈশাখী মেলা। শহরজুড়ে আরও নানা আয়োজন। নবীন গ্রীষ্মের প্রখর তাপ উপেক্ষা করে পথে পথে ঘুরে, গাছতলায় বসে তুমুল আড্ডায় মেতে কেটে যাবে উৎসবের বেলা।

বাংলা সনের প্রবর্তন কবে হয়েছিল, কে তার প্রবর্তক, তা নিয়ে পন্ডিতমহলে আছে নানা বিতর্ক। বেশিরভাগ মানুষেরই মত, মোগল সম্রাট আকবর এর প্রবর্তক। তিনি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে, হিজরি ৯৬৩ সালে যে ‘তরিক-ই-ইলাহি’ নামের নতুন সনের প্রবর্তন করেছিলেন দিল্লিতে, তখন থেকেই আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। তবে রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ ও তিব্বতের রাজ স্রংসনকেও বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন কেউ কেউ। ‘সন’ শব্দটি আরবি এবং ‘সাল’ শব্দটি ফারসি। এই শব্দ দুটির কারণে বাংলা সন বা সাল মুসলিম শাসকদেরই প্রবর্তিত বলে পন্ডিতেরা মনে করেছেন। বৈদিক যুগে অঘ্রাণকে বছরের প্রথম মাস বলে গণ্য করা হতো। তবে এই অঞ্চলের চাষাবাদের সঙ্গে মিলিয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি সন হিসেবে বৈশাখকেই বছরের প্রথম মাস ধরে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। সুবেদার মুর্শিদ কুলি খানের সময়ে বৈশাখ মাসের শুরুতে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে পহেলা বৈশাখে এক ধরনের আর্থ-সামাজিক আনন্দ-উৎসবের সূচনা হয়েছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন।

বছরের প্রথম দিনে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার রীতি-রেওয়াজ মানবসমাজে সুপ্রাচীন। কৃষিপ্রধান বাংলায় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বছরের প্রথম দিনে পুণ্যাহের আয়োজন করতেন রাজা বা জমিদারেরা। প্রজারা এ দিন খাজনা দিয়ে নতুন বছরের জন্য জমির পত্তন নিতেন। জমিদারেরা প্রজাদের জন্য আয়োজন করতেন ভোজের। আরও একটি অনুষ্ঠানের সংযোগ ঘটেছিল পহেলা বৈশাখে; সেটি হালখাতা। ব্যবসায়ীরা এর আয়োজন করতেন। সাংবৎসরিক যাঁরা বাকিতে কেনাকাটা করতেন, তাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। উত্তম আহারাদির বন্দোবস্ত করা হতো। দোকানঘরটি ধুয়েমুছে করা হতো ঝকঝকে। ছিটানো হতো পঞ্চবটীর পাতা ভেজানো পবিত্র জল। আপ্যায়ন শেষে পুরনো বাকি শোধ করে খাতকেরা আগামও কিছু জমা করে যেতেন নতুন খাতায়। পুণ্যাহ ও হালখাতা ছিল মূলত অর্থনীতিনির্ভর অনুষ্ঠান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পুণ্যাহ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং হালখাতাও তার জৌলুস হারাতে
থাকে।

নববর্ষ উপলক্ষে পত্রপত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠান।

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে দেশের সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হবে। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। অভিজাত হোটেল, রেস্টুরেন্টগুলো আয়োজন করেছে ইলিশ-পান্তার । অনেকের বাসাবাড়িতে তৈরি হবে বাঙালি খাবার-ইলিশ মাছভাজা, শুটকি-বেগুন-ডাল-আলু-কালিজিরাসহ নানা পদের ভর্তা। আবার অনেকের ঘরে সর্ষে ইলিশও থাকবে। কায়মনে বাঙালি হয়ে উঠার বাসনা ছাড়া সব কিছুই তুচ্ছ মনে হবে সবার। শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই নয়, পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে, সেখানেই বর্ণাঢ্য উৎসবের পালিত হবে পহেলা বৈশাখ।
এদিকে কোনো ধরনের হুমকি না থাকলেও আত্মঘাতী জঙ্গিরা হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে কক্সবাজারের নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। বিভিন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা নিয়ে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।