ডাকাত থেকে মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আল অ্যাকিন প্রশিক্ষক হলেন আবদুল হাকিম- টেকনাফের পাহাড়ে অস্ত্র মজুদ ও জঙ্গি প্রশিক্ষণ চলছে

বিশেষ প্রতিবেদক:
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র লড়াই করার নামে গঠিত ‘আল অ্যাকিন’ আলোচিত বিদ্রোহী সংগঠন টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লানপাড়ার উঁচু পাহাড়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র মজুদ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে ছড়িয়ে কয়েকটি ভিডিও বার্তা সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের মংডু জেলাধীন দক্ষিণ বড়ছড়ার জয়নাল আলী প্রকাশ জানে আলমের ছেলে আবদুল হাকিম ডাকাত এ প্রশিক্ষণের সামরিক প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

আল অ্যাকিন এর প্রধান প্রশিক্ষক আবদুল হাকিম ডাকাত সংগঠনের বিস্তারিত তুলে ভিডিও বার্তায় বলেছেন, এখানে তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরী হচ্ছে, আরএসও, আরএনও, এআরআইএফসহ কয়েকটি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠন থেকে বাছাই করে অস্ত্র চালনায় দক্ষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, মিয়ানমারের গিয়ে শ্রীঘ্রই কিছু করবে। তার পিছনে রয়েছে তাদের সদস্যদের উচ্চতা যাচাই, পেছনে মুখে ঢাকা অবস্থায় অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিচ্ছে, । এছাড়া মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি এলাকার লোকজনকে হুমকি-ধমকি দিয়ে তাদের সংগঠনের কাজে সহযোগিতা ও যোগ দেওয়ার আহবান জানাচ্ছে ভিডিও বার্তায়।

সূত্রমতে, কিছু রোহিঙ্গাকে নিয়ে ২০১২ সালে মিয়ানমারে গঠিত হয় আরাকান বিদ্রোহী সংগঠন ‘আল অ্যাকিন।’ মিয়ানমারের থাকা রোহিঙ্গা আরাকানের বিভিন্ন পাহাড় ও বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা টেকনাফে পুরান পল্লানপাড়ার পাহাড়ে এদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে কার্যক্রম চলছে।

আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংস্থার সঙ্গে রয়েছে আল অ্যাকিনের যোগাযোগ। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের ঘটনায় আল আ্যাকিনের সশস্ত্র গেরিলা ট্রেনিং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংস্থার সমর্থন আদায় করতে পেরেছে।
স্থানীয়রা বলেছেন, ক্ষমতাধর কয়েক নেতার ছয়ছায়ায় আবদুল হাকিম ডাকাতের নেতৃত্বে পাহাড়ে অবস্থান করে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুরান পল্লানপাড়া, জাহালিয়াপাড়া ও বরইতলী এলাকার লোকজন তাদেরকে সহযোগিতা করে আসছে।

জানা গেছে, মাত্র ৮ বছর আগে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ উপজেলার শাহপরীরদ্বীপে চলে আসেন আবদুল হাকিম ডাকাত, এর কয়েকবছর পর তার আরো ৫ ভাই বশির আহমদ, কবির আহমদ, নজির আহমদ, হামিদ হোছনকে নিয়ে আসে এপারে। এরপর আবদুল হাকিমের নেতৃত্বে সাগরও নদীতে ডাকাতি শুরু করে। এ ঘটনা শাহপরীরদ্বীপের জানাজানি হয়ে গেলে ৬ ভাই টেকনাফে এসে বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করে। এর মধ্যে ডাকাত আবদুল হাকিম যোগ দেন আল অ্যাকিন নামক রোহিঙ্গা বিদ্রোহী জঙ্গি সংগঠনে। এ সংগঠনের সামরিক প্রধান প্রশিক্ষণ দায়িত্ব নিয়ে উপজেলা সংলগ্ন পুরান পল্লানপাড়ার জহির আহমদের মেয়েকে বিয়ে করে টেকনাফ বন রেঞ্জের উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের উত্তর-পশ্চিম দিকের আনুমানিক এক কিলোমিটার পর্যন্ত বনভূমি দখল করে আল আ্যকিনের প্রশিক্ষক কার্যক্রম শুরু করে।

এর মধ্যে ডাকাত হাকিমের ৫ ভাইসহ শ্বাশুড় পক্ষের লোকজন জাফর আলম, মো: রফিক, নুরুল আলম, মো: আনোয়ার, ফরিদ উল্লাহ, মো: ইউনুছ, আলম ডাকাত, সাব্বির আহমদ, সেলিম মিস্ত্রী ও তার ছেলে নুরুল আবছার নুরুকে নিয়ে একটি ডাকাত দল গঠন করে প্রতিনিয়ত ডাকাতি, চাঁদাদাবি, চাঁদা না দিলে অপহরণ করে খুন, খুনের পর গুম করার ঘটনাও রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য আবদুল লতিফের ছেলে নুরুল কবির, সিএনজি ড্রাইভার মো: আলী হত্যা, মুন্ডি সেলিম, নতুন পল্লানপাড়ার সিরাজ মেম্বার হত্যা, আবদুল হাফিজ ও তোফায়েল হত্যা সহ অহরহ ঘটনার জম্মদেন এ আবদুল হাকিম ডাকাত।

Homki-2

এছাড়া পুরান পল্লানপাড়ার নুরুর কাছ থেকে ৮ লাখ, সেলিমের কাছ থেকে ৫ লাখ, টমেটোর কাছ থেকে ৪০ হাজার, ছুরা খাতুনের কাছ থেকে ৪০ হাজার, শাহপরীরদ্বীপে বসবাসরত বার্মাইয়া জানে আলমের কাছ থেকে ১০ লাখ, শফিউল্লাহ মাঝি থেকে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন।

তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একাধিক হত্যা ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। মামলাগুলো হল টেকনাফ মডেল থানার মামলা নং-১০/১৬তাং-৫/৭/১৬ইং, মামলা নং-৪৩/১৬ তারিখ ১৯-০৬-১৬ইং, মামলা নং- ৪৪/১৬ তারিখ ১৯/০৬/১৬ইং, মামলা নং- ৪৬/১৬ তারিখ ২০-০৭-১৬ইং, মামলা নং- ৪৭/১৬ তারিখ ২০-০৭-১৬ইং, টেকনাফ মডেল জিআর নং-৪১৫/১৫ তারিখ ১২/০৬/১৫ইং,অপহরণ মামলা সিআর ৯৪/২০১৭ইং, এছাড়া টেকনাফ মডেল থানায় অপর একটি বৈদেশিক নাগরিক আইন, মাদক মামলা রয়েছে ।

রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিমের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শিবিরের আনসার ক্যাম্পে অস্ত্র লুট ও আনসার হত্যার অভিযোগ ও অর্ধ ডজন মামলা থাকার পরও ডাকাত হাকিমকে কেন গ্রেফতার করা যাচ্ছেনা। এটা এখন সচেতন মহলের প্রশ্ন।

এদিকে মিয়ানমারের তিনটি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিজিপি’র অন্তত ৯ সদস্যকে হত্যা এবং বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আল আ্যকিন।

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে মিয়ানারের রাখাইনের মংডুতে হামলা এ ঘটনা নিয়ে সংগঠনের প্রধান আবু আম্মর জুনুনী ফেসবুকে বেশ কয়েকটি ভিডিও বার্তা পাঠান। সশস্ত্র পাহারারত অবস্থায় এ সব ভিডিও বার্তায় তিনি রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য তাদের আহবানে সাড়া দেওয়ার অনুরোধ জানান।

তবে সীমান্তে এ গোষ্ঠীর সক্রিয় কর্মকান্ড বন্ধের জন্য বাড়তি নজরদারি বাড়ানো উচিৎ বলে মনে করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ভাষ্য এখনি সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে।

মিয়ানমারের আরাকানে হামলার পর পর বেশ কিছুদিন ফেসবুকে সক্রিয় ছিল আল অ্যাকিন। এরপর অনেকটা পর্দার আড়ালে চলে যায় সংগঠনের কর্মকর্তারা। আল-অ্যাকিনের সদস্যরা অনেকটা আড়ালে চলে গেলেও আরো একটি বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে এমনটি ধারণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ও সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেকনাফ লেদার এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, আল-অ্যাকিন প্রধান প্রশিক্ষক আবদুল হাকিম ডাকাত বাহিনী বেশ সক্রিয় রয়েছে, কৌশলের কারণে এখন আড়ালে থাকলেও সময়মতো তারা আবার জ্বলে উঠবে। আবদুল হাকিমকে ধরা না গেলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরো জানান আরএসও, আরএনও, এআরআইএফ নামের রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠনগুলো এক সময় সক্রিয় থাকলেও এদের অবস্থান বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে। আরাকানের অভ্যন্তরে এদের কোনো জনসমর্থন তেমন ছিল না। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল আল-অ্যাকিন।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ পৌরসভার মেয়র হাজী মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, আবদুল হাকিম ডাকাতের অত্যাচারে পুরান পল্লানপাড়া ও নাইট্যংপাড়ার মানুষ নিরাপদ নয়, তারা আতংকের মধ্যে দিন খাটাচ্ছে। এছাড়া অনেকে এলাকা ছেড়েছে। তার বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা থাকার পরেও সে প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছে, এবং নিরীহ লোকজনকে অপহরণ করে তার আস্তানায় মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করছে। তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তিনি।

Hakim-4

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ মডেল থানার পরিদর্শক ও আনসার অস্ত্র লুট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেখ আশরাফুজ্জামানিআমাদের রামু ডটকমকে বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হওয়ায় মামলায় নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে। এখন মামলাটির তদন্তের গতি বৃদ্ধি পাবে এবং ঘটনার প্রকৃত হোতাদের চিহ্নিত করা সহজ হবে।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, টেকনাফের আনসার ক্যাম্প ও মিয়ানমারের বিজিপি স্থাপনার ঘটনাটির একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে হয়। এ দুটি জঙ্গি হামলা একই সূত্রে গাঁথা। যা আন্তর্জাতিক জঙ্গি হামলারই অংশ বলে মনে হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও জোরদার করা ছাড়া এ ধরনের আরো হামলা আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সীমান্তে এদের সক্রিয়তার ব্যাপারে টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্ণেল আবুজার আল জাহিদ আমাদের রামু ডটকমকে বলেন, এক ইঞ্চি ভূখন্ড ও সীমান্তে বিদেশি কিংবা দেশীয় সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করতে দেবে না সরকার। আমরা প্রস্তুত রয়েছি, আবদুল হাকিম ডাকাতকে আটকের অভিযান অব্যাহত আছে।