নিরাপত্তাহীন সড়ক

রুবেল বড়ুয়া:
প্রণয় খুব দুরন্ত বালক। সদ্য অষ্টম শ্রেণিতে পা রেখেছে। বাবা দিনমজুর বিধায় সাইকেল কেনার সামর্থ্য নাই। মা থেকে কোন অজুহাত দেখিয়ে ১০ টাকা আদায় করল। উদ্দেশ্য সাইকেল ভাড়া নিয়ে সাইকেল চালাবে। দশ টাকা দিয়ে আধা ঘণ্টার ভাড়া চালিত সাইকেল নিয়ে বের হল রাস্তায়। কে জানত এটা তার শেষ সাইকেল চালানো! ঘাতক পিকআপ ( ডাম্পার) তার মুণ্ডকমস্তক চাকার তলায় পিষ্টে সকল স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৩৭ তম ব্যাচের মেধাবী ছাত্র ছিল আসিফ ওরফে শোভন(২৮)। চাকরি করত বেসরকারি একটি ব্যাংকে। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি বিয়ের পিড়িতে বসত শোভন। এজন্য প্রস্তুতিও ছিল ব্যাপক। প্রতিদিনের মত মোটর সাইকেল নিয়ে নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ঘাতক চালকের অসাবধানতার কারণে আর কর্মস্থলে যাওয়া হল না। চাকার পিষ্টে সকল স্বপ্ন মিশে গেল।

এ রকম অসংখ্য প্রণয়, শোভনের চিত্র দেখি খবরের কাগজে। পাতা খুললেই শুধু সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু আর মৃত্যুর খবর।
একটি সড়ক দূর্ঘটনার মৃত্যুর কারণে ঐ পরিবারকে কতটা অসহায়ত্ব জীবনযাপন করতে হয়, সে ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া কেউ জানে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ করে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেও বড় দুর্ঘটনাগুলো তদন্ত করে থাকে। তাদের গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটছে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২ হাজার ৩৯৪ জনের। আর যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এই সংখ্যা ৮ হাজার। বিআরটিএ ২০১৬ সালের পুরো হিসাব এখনো করেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সড়ক দূর্ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চালকের বেপরোয়া গতিতে চালানোর কারণে এসব দূর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশেরর মত জনবহুল দেশে আয়তন ছোট হওয়ায় মহাসড়কগুলো অপ্রসস্তের কারণে এসব দূর্ঘটনা ঘটে।

অপরদিকে চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ওভার টেক করা, দক্ষ চালকের অভাবে,চালকের হেলফার দ্বারা গাড়ি চালানা, রাস্তা আকাঁবাকাঁ মোড় বিবিধ কারণবশত এসব দূর্ঘটনার সম্মুখীন বার বার হতে হয়।সড়ক দুর্ঘটনা সব দেশেই ঘটে। এটা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কমানো অবশ্যই সম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন। কীভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাবে, সে ব্যাপারেও প্রচুর বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সুপারিশ রয়েছে। সুতরাং কী করতে হবে তা আমাদের অজানা নেই। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয় না। এ ব্যাপারে কারও কোনো দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি আছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। সমস্যাটা গুরুতর। এটা লাঘব করার উদ্যোগ নিতেই হবে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে আন্তরিকভাবে তৎপর হতে হবে। বিশেষত যানবাহনের চালকদের বেপরোয়া ও প্রশিক্ষণহীন অংশের রাশ টেনে ধরতে হবে।