ব্লু ইকোনমি গবেষণায় ইইউ’র সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি

মিয়ানমার ও ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রসীমা মামলা মীমাংসা হওয়ায় বেড়েছে বাংলাদেশের জলভাগের আয়তন।কিন্তু, বঙ্গোপসাগরের এই বিপুল এলাকায় এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে পারেনি বাংলাদেশ। একইসঙ্গে এই জলরাশির মধ্যে থাকা সমুদ্রসম্পদ সুষ্ঠুভাবে আহরণেও এখনও সক্ষমতা অর্জিত হয়নি। ফলে সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে (ব্লু ইকোনমি) এখনও অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। এই অনভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে ও সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতি চাঙা করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।

গত আগস্টে করা এই চুক্তিটির কথা বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম এ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। তিনি জানান, এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বিস্তৃত সমুদ্রসম্পদের সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম এ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমুদ্রসম্পদ আহরণে দক্ষতা আছে এবং বাংলাদেশ সেটি ব্যবহার করতে চায়। এ কারণে গত আগস্টে ইইউ-র সঙ্গে চুক্তিটি করা হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় আগামী দুই বছর সমুদ্র অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করবে ইইউ। এরপরে এ সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা যায় সেবিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশমালা তুলে ধরা হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতি বছর ৯৫ বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ সম্পদ সমুদ্র থেকে আহরণ করে থাকে এবং এ সম্পদ তারা কীভাবে আহরণ করে এবং সেই জ্ঞান কীভাবে বাংলাদেশ ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়ে তারা সুপারিশ করবে।

এ গবেষণায় ইতোমধ্যেই একজন ফরাসি এবং একজন বাংলাদেশি গবেষক কাজ শুরু করেছে এবং সরকার তাদের সব রকম সহযোগিতা করছে বলেও তিনি জানান।

সমুদ্রসম্পদ ও সমুদ্রসীমার ব্যবহার নিয়ে ভারত ও চীনের সঙ্গে পৃথক চুক্তি

এদিকে সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সমুদ্রসীমার ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়াও ভারত ও চীনের সঙ্গে পৃথক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে গত বছর জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সময়ে দিল্লির সঙ্গে এবং চলতি অক্টোবরেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সফরের সময়ে চীনের সঙ্গে সমুদ্র সম্পদবিষয়ক সহযোগিতার জন্য পৃথক সমঝোতা স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উভয় দেশের সঙ্গে করা প্রতিটি চুক্তির বিষয়বস্তু আলাদা। তাই এক দেশের সঙ্গে আমরা যে সহযোগিতা করছি অন্য দেশের সঙ্গে তা মিলবে না। তিনি আরও জানান, সমুদ্রসম্পদ ও সমুদ্রসীমা একটি বিশাল ব্যাপার। এরমধ্যে অনেকরকম বিষয় আছে। তাই প্রত্যেক দেশের সঙ্গে করা সহযোগিতামূলক চুক্তিগুলোও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের।

তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তির যে বিষয়বস্তু সেটি চীন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নাই এবং চীন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তিতে যা বলা আছে সেটি ভারতের চুক্তিতে নাই।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের কয়েকজন জেলে ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে ভুল করে ভারতের সমুদ্র সীমানায় ঢুকে পড়ে এবং তখন দিল্লির সঙ্গে আমাদের চুক্তিকে ব্যবহার করে যৌথ উদ্ধার বাহিনী গঠন করে তাদের উদ্ধার করা হয়।

মেরিটাইম জোনস আইন সংশোধন হচ্ছে

এদিকে, সমুদ্রসীমাভিত্তিক মেরিটাইম জোনস আইনকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য আইনটি ব্যাপক আকারে সংশোধন করে খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যমান মেরিটাইম জোনস আইনটি ১৯৭৪ সালে প্রণীত। ফলে এই পুরনো আইন দিয়ে বিশাল আয়তনের সমুদ্রসীমা শাসন করা সম্ভব নয়। বিষয়টি অনুধাবন করে বিদ্যমান আইনটি সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর খসড়া প্রস্তুত করেছে এবং এখন এটি আইন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, ১৯৭৪ সালে যে আইনটি করা হয়েছিল সেটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যবহার উপযোগী নয় তাই এর ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এটি নতুন আইন হিসেবে আসবে নাকি ১৯৭৪ সালের আইনের সংশোধনী হিসেবে সংসদে পেশ করা হবে তা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, এটি কেবিনেট সিদ্ধান্ত নেবে।

আইনে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ১৯৭৪ সালের আইনে বলা হয়েছে কেউ যদি সমুদ্র দূষণ করে তবে তার ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা এক বছরের জেল বা উভয় দণ্ডও হতে পারে। কিন্তু, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ৫ হাজার টাকা জরিমানা অতি নগণ্য। তাই শাস্তি কঠোর করার স্বার্থে এই জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।