মিটারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল প্রতারণা,দন্ডনীয় অপরাধ

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট :
দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় গত ২৫ অক্টোবর প্রথম পৃষ্টার প্রধান শিরোনাম ছিল ”ডিজিটাল মিটার গ্রাহকের গলার ফাঁস”। একই পত্রিকায় ২৭ অক্টোবর দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ছিল “রামুতে বিদ্যুৎ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে হয়রানি ও অর্থ আত্নসাতের অভিযোগঃ ক্ষুব্দ সাধারণ গ্রাহকরা”। পত্রিকা লিখেছে, ডিজিটাল মিটার এখন গ্রাহকের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। রিডিং না দেখেই মনগড়া তৈরী করা হচ্ছে বিদ্যুৎ বিল। যার ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও শুধু মিটার থাকার কারণেই গুনতে হচ্ছে বিল হিসেবে মোটা অংকের টাকা। ডিজিটাল মিটার ব্যবহারে গ্রাহকদের বাধ্য করা হলেও তা গ্রাহকের কোন কাজে আসছে না। ডিজিটাল মিটার এখন গ্রাহকদের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে।

অনেকেই বিল দেখে চমকে উঠছেন। এ ছাড়াও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী দামী বাল্ব ব্যবহার করে কোন উপকার পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।
একই ধরনের ভৌতিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় কিছু দিন পর পর ছাপা হতে দেখা যায়। কিন্ত কোন প্রতিকার হচ্ছে না কেন? সংশ্লিষ্ট অপরাধীর বিচার না হলে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে না?

বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী জনগণ কারো দয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না। তারা টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয় করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। বিদ্যুৎ প্রাহক ক্রেতা,আর বিদ্যুৎ বিভাগ বিক্রেতা। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যকার চুক্তি হল যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে মর্মে মিটার রিডিং এ দেখা যাবে ততটুকুর জন্য বিল করা হবে এবং গ্রাহক ততটুকু বিল পরিশোধ করতে আইনতঃ বাধ্য। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বিল পরিশোধ না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে মিটার রিডিং এর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল তৈরী করা এবং গ্রাহককে পরিশোধ করতে বাধ্য করা দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ,প্রতারণা ও ঠকবাজীর অপরাধ।

যারা বিল তৈরীর কাজে নিয়োজিত তারা মিটার রিডিং দেখে যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে ততটুকুর জন্য বিল করতেই আইনতঃ ক্ষমতাবান ও বাধ্য। এ কাজে নিয়োজিত বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা/কর্মচারীরা জনগণের টাকা থেকে বেতন নিয়ে থাকেন সেই দায়িত্ব সৎভাবে পালন করার জন্য। মিটার রিডিং দেখার সময় ও বিল তৈরী করার সময় গ্রাহকের উপস্থিত থাকার প্রয়োজন বা বিধান নেই। গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে বিশ্বাস করেন এ কাজে নিয়োজিত বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা যথাসময়ে, যথানিয়মে প্রতিটি মিটার রিডিং দেখেই বিল তৈরী করেন। মিটার রিডিং দেখে বা না দেখে মিটার রিডিং এর অতিরিক্ত অর্থাৎ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় নাই সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে মর্মে মিথ্যা বিল তৈরী করে অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতে নিরীহ গ্রাহকদের বাধ্য করা অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ,প্রতারণা ও ঠকবাজীর অপরাধ।

প্যানেল কোড অনুযায়ী অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের ৪০৬ ধারার শাস্তি ৩ বছর কারাদন্ড এবং প্রতারণা ও ঠকবাজীর ৪২০ ধারার শাস্তি ৭ বছর কারাদন্ড। অপরাধকারী যদি পাবলিক সার্ভেন্ট হন তবে দুর্নীতি দমন আইনের সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী উল্লেখিত অপরাধ দুদক আইনে বিচারযোগ্য। লোকবল সংকটের অজুহাত দেখিয়ে মাসের পর মাস,বছরের পর বছর একই ধরনের স্বীকৃত ধারাবাহিক অপরাধ আইনত গ্রহনযোগ্য নয় ও চলতে দেওয়া যায় না।
মিটার রিডিং এর চেয়ে কম বিদ্যুৎ বিল করলেও গ্রাহকদের কোন লাভ হয় না। বরং তাতেও ক্ষতি হয়। কারণ বিল কম করলেও মিটারে রিডিং থেকে যায়। পরে একবারে বিল করতে গিয়ে বেশি রিডিং এর জন্য তুলনামুলক বেশি হারে বিল করা হয় এবং তা গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয়।

একজন বাড়ীর মালিক অভিযোগ করে বলেন, তার ভাড়াটিয়া সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের অবৈধভাবে বশে নিয়ে মিটার রিডিং এর চেয়ে কম বিল করার ব্যবস্থা করেছে এবং ভাড়াটিয়া তার ব্যবহার করা বিদ্যুতের চেয়ে কম টাকা পরিশোধ করেছে। কিন্তু ভাড়াটিয়া অন্যত্র চলে যাওয়ার পর দেখা গেছে বেশি বিল করা হচ্ছে, কারণ মিটারে আগে ব্যবহার করা রিডিং জমা আছে। সুতরাং মিটার রিডিং এর চেয়ে বেশি বা কম বিল করা প্রত্যাশিত ও বিধিসম্মত নয়।

কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব মোস্তফিজুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে একজন খুব ভদ্র,দায়িত্বশীল ও ভাল কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃত। জনগণ মনে করেন উনি নিজেও দুর্নীতিগ্রস্থ সিস্টেমের কাছে অসহায়। কোন গ্রাহক যে কোন কিছু নিয়ে অভিযোগ করলে উনি অনতিবিলম্বে তা প্রতিকার করার চেষ্টা করেন। মিটার রিডিং এর অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে অভিযোগ নিয়ে অফিসে গেলে তা পরবর্তী মাসের বিলে সমন্বয় করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয় এবং তা করাও হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরে আবার একই সমস্যা। প্রতারিত গ্রাহকদের একই বিষয় নিয়ে কয় বার অভিযোগ করতে নিজের জন্য সম্মানজনক মনে হবে? নিজেকে ছোট মনে হবে না? কিছু দিন পর পর একই অভিযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে আসা যাওয়ার রিক্সা ভাড়ার টাকা এবং লাইনে দাড়িয়ে গ্রাহকদের মূল্যবান কর্মসময় অপচয়ের মূল্য কে দেবে? সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী/কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আদালতে বা দুদক অফিসে মামলা করলে এ ধরনের লাগাতার হয়রানি ও দুর্নীতি কমতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

********************************************************************************************************************

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

——————————————————————————————————————————–

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।আমাদের রামু -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য আমাদের রামু কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।