দুর্নীতির মামলায় আসামি খালাস ১০ শতাংশ বেড়েছে

দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ২০০৪ সালে কমিশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এর মধ্যে চতুর্থবারের মতো প্রতিষ্ঠানটিতে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন পূর্বের তুলনায় অনেক সক্রিয় ভূমিকায়।খবর রাইজিংবিডির।

শুরু থেকেই সংস্থাটিকে ঘিরে গণমানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।

দুর্নীতি অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচার সবকিছু মিলিয়ে সংস্থাটির সাফল্য তুলনামূলক অনেক কম। সর্বশেষ দুদক প্রকাশিত ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে এর সত্যতা মেলে।

শুধু দুদকের ২০১৪ ও ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের হিসাবেই আগের চেয়ে দুর্নীতির মামলায় চূড়ান্ত বিচার শেষে আসামি খালোসের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

গত সোমবার রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে পেশ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালে কমিশনের দায়ের করা মোট ৩০৬টি মামলা বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭টি মামলায় আসামিরা খালাস পান। অন্যদিকে ৯৯টি মামলায় সাজা হয় আসামিদের। হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালে প্রায় ৬৮ শতাংশ মামলার আসামিরা খালাস পেয়েছে। সাজা হয়েছে ৩২ শতাংশ মামলায়। এ ক্ষেত্রে দুদকের মামলায় সাফল্য ৩২ শতাংশ। যা পূর্ববর্তী বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৪ চেয়েও অনেক কম।

২০১৪ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ২৪৩টি দুর্নীতি মামলার মধ্যে ১০১টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। আর ১৪২ মামলার আসামিরা খালাস পেয়েছে। ওই বছর ৫৮.৪৩ শতাংশ মামলার আসামিরা খালাস পেয়েছে। আর সাজা হয়েছে ৪১.৫৬ শতাংশ মামলার আসামিদের। বিগত ২০১৪ ও ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিবেচনা করলে মামলায় আসামি খালোসের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।

২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বছরে মোট ১০ হাজার ৪১৫টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ২৪০টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। একই সময়ে বিচারিক আদালতে কমিশন আমলের ৩ হাজার ৯৭টি ও ব্যুরো আমলের ১ হাজার ৮০টিসহ মোট ৪ হাজার ১৭৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলার মধ্যে বিচারকার্য চলমান ছিল ৩ হাজার ৩৫৭টি। বাকি ৮২০টি মামলা স্থগিত ছিল। গত বছর কমিশন আমলের ১৮৮টি ও ব্যুরো আমলের ১১৮টিসহ মোট ৩০৬টি মামলার বিচারকার্য নিষ্পত্তি করা হয়। নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলোর মধ্যে ২০৭টি মামলার আসামিরা খালাস ও ৯৯টি মামলার আসামিরা সাজা পেয়েছেন। ২০১৫ সালে ৬৮ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস ও ৩২ শতাংশ মামলায় সাজা পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালে দুদকে ৭ হাজার ৪৯৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৩টি অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে ৫২৭টি এজাহার দায়ের করে কমিশন। বাকি ৩ হাজার ৫৬৬টি অভিযোগ নথিভুক্ত বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সময়ে দুদকে তদন্তাধীন ছিল ৪ হাজার ৫৫৩টি মামলা। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮১টি মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। ওই সব তদন্তের ওপর ভিত্তি করে আদালতে ৬১৪টি চার্জশিট দাখিল করে দুদক।

২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকা দুদকের মামলা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা ছিল ২০৫টি ও বিগত বছরের ৯৯৬টিসহ মোট ১ হাজার ২০১টি। একই সময়ে ৪৪৮টি মামলায় স্থগিতাদেশ ইস্যু ও ২৩০টি মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ২০১৫ সালে রিট করা হয় ৪৫টি মামলায় ও বিগত বছরের রিট আবেদন ছিল ১ হাজার ২৭৭টিসহ মোট ১ হাজার ৩২২টি। একই সময়ে ৪৩৪টি মামলায় স্থগিতাদেশ ইস্যু ও ৩০৮টি মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে ফৌজদারি আপিল মামলার সংখ্যা ছিল ২৯৬টি ও ফৌজদারি পুনর্বিবেচনা আপিল মামলা ছিল ৩০৪টি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে দুদকের মামলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫৮ জন আইনজীবী নিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫ জন আইনজীবীকে কমিশন আপিল বিভাগে ‘অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড’ হিসেবে নিযুক্ত করেছে। দুদকের মামলা পরিচালনা করতে ঢাকার ১৩টি বিশেষ জজ আদালতে ১৩ জন আইনজীবী দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিভাগে ৬০, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ৫০, খুলনা বিভাগে ২৬, বরিশাল বিভাগে ১৯ ও সিলেট বিভাগে ১৯ জন আইনজীবী নিযুক্ত রয়েছেন।

এ বিষয়ে দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে দুদক বেশির ভাগ মামলায় আসামি খালাসের পরিমাণ বেড়েছে। কী কারণে দুদক মামলায় হারছে, সেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করা হচ্ছে। আমাদের চেষ্টায় যেখানে-যেখানে ঘাটতি ছিল, সে পয়েন্টগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মামলাগুলোয় সাজার হার বেড়ে ৩৭ শতাংশ থেকে ৪৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সচেতন রয়েছি।’

দুর্নীতি দমন কমিশন, ২০০৪-এর ২৯ (১) ধারা অনুযায়ী, প্রতিবছর পূর্ববর্তী বছরের সম্পাদিত কার্যাবলি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই ধারা অনুযায়ীই প্রতিবেদনটি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়।