আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক: কে হাসবেন শেষ হাসি?

আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের প্রথমদিন শেষ হলেও কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক—এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে তীব্র কৌতূহল। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই থাকছেন, না ওবায়দুল কাদের আসছেন? দলের এ পদে কে হাসবেন শেষ হাসি—এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ ও জল্পনা-কল্পনা। তবে মাঠে আলোচনা যাই থাকুক, কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, সম্মেলনের দিন শনিবার থেকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পাল্লা ভারী। তবে পরিষ্কার কিছু বলতে পারছেন না কেন্দ্রীয় কোনও নেতা। সম্পাদকমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্য জানান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও ওবায়দুল কাদেরের মধ্যে দু’জনেরই সম্ভাবনা রয়েছে। আবার নতুন কোনও মুখও আসতে পারে শেখ হাসিনার রানিংমেট হয়ে।খবর বাংলা ট্রিবিউনের।

শনিবার প্রথম অধিবেশন সকালে ও বিকেলে দু’বারের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যে নতুন সাধারণ সম্পাদকের বিষয়ে যেমন আলোচনায় নতুন মোড় নিয়েছে, তেমনি ধোঁয়াশাও তৈরি করেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও কাউন্সিলর ডেলিগেটদের মধ্যে। অনেককেই বলতে শোনা গেছে, আশরাফ ও কাদের কেউ নন, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এ পদে আসছেন তৃতীয় কোনও নেতা। সেখানে কারও কারও মুখে শোনা গেছে, তাজউদ্দিন আহমেদের ছেলে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজের নামও। নেতাকর্মীরা অপেক্ষা করে আছেন দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনের দিকে। রবিবার আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে নেতৃত্ব কে আসছেন, তা জানতেই তাদের অপেক্ষা। আর তা জানা যাবে রবিবার। সকাল সাড়ে ৯টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউন্সিলরদের মতামত গ্রহণ করবেন। পরে তাদের প্রস্তাব ও সমর্থন নিয়ে যোগ্য সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করবেন তিনি। অবশ্য কাউন্সিলররা মনে করেন, শেখ হাসিনা তার রানিংমেট নির্বাচনে মোটেও ভুল করবেন না।

শনিবার সকালে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট পেশ করতে উঠে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমি দু’বার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দলে কোনও ‘ইজম’ তৈরি করিনি। দল ঐক্যবদ্ধ ছিল।’’ এ সময় সেখানে উপস্থিত কাউন্সিলররা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এই বক্তব্যকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে মঞ্চে তুলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আবারও বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘জয়, আগামী দিনের বাংলাদেশে তোমাকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। ধারাবাহিকতায় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। আমরা এক সময় চলে যাব। তুমি এবং তোমার বন্ধুরাই আগামী দিনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেবে।’ এরপরই জয়কে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন বিভাঘের জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। এর ফলে প্রবীণদের ভেতরে আরেকবার হতাশা দেখা দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করেন, জয় এবার দলের নেতা হবেন, তবে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নয়, অন্য কোনও পদে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘দলের আগামীর সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও রয়েছে। রাত পোহালেই জানা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘নেতা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কখনও ভুল করেনি, এবারও ভুল করবে না। ’

প্রথম অধিবেশন শেষে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করা হলে সভাপতিমণ্ডলী ও সম্পাদকমণ্ডলীর বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সাধারণ সম্পাদকের দৌড়ে ওবায়দুল কাদের বেশ আলোচনায় থাকলেও শনিবার প্রথম অধিবেশন শেষে পাল্লা ভারী হতে শুরু করেছে সৈয়দ আশরাফের।’ অন্য একটি সূত্র জানায়, নতুন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম থাকবেন না, ওবায়দুল কাদেরও হবেন না। একেবারেই নতুন কেউ এ পদে আসবেন। তবে কে সেই ভাগ্যবান, তা কেউ বলতে পারছেন না।

জানতে চাইলে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘কে হচ্ছেন পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক, তা নিয়ে লাখো আওয়ামী লীগ ভক্তের মতো আমাদেরও কৌতূহল রয়েছে। আমরা এখনও পরিষ্কার হতে পারিনি কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক। এ পদে যিনিই আসুন, যোগ্য কেউই আসবেন।’

এদিকে শনিবার গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, দু’জনই ‘নতুন রক্ত’ দলে সঞ্চালনের পক্ষে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তবে শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সেই ভাগ্যবান কাকে বেছে নিয়েছেন, তা রবিবার দুপুরের পরই স্পষ্ট হবে। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আরও একবার সাধারণ সম্পাদক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাও শেখ হাসিনার পরামর্শে হবে।

পঞ্চগড় জেলার উপজেলা দেবীগঞ্জের আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মিরাজ উদ্দিন, তিনি কাউন্সিলর হয়ে ঢাকায় এাসেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ নয়, সম্মেলনের মূল আর্কষণ কাল (রবিবার)। আজ শুনেছি, আর কাল জানব আওয়ামী লীগের আগামী দিনের নেতৃত্বে কে আসছেন। সম্মেলনে প্রথমদিন তো সবার মিলনমেলা ঘটে। আর শেষ দিন সবার মধ্যে আগ্রহ থাকে—কে নেতা হচ্ছেন, তা নিয়ে। আমরাও সেই অপেক্ষায় বসে আছি।’

মৌলভীবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক নেহার আহমদ বলেন, ‘প্রতি তিন বছর পর সম্মেলন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিলনমেলা ঘটে। তখন খুব আনন্দ লাগে। সব কেন্দ্রীয় নেতাকে একসঙ্গে দেখতে পাই। তবে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন থাকে মূল আর্কষণ। কারণ তখন আওয়ামী লীগের আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। এ নিয়ে সবার মধ্যে একটা উত্তেজনা বিরাজ করে।’

এছাড়া পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার কয়েকজন কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আজ তো আমাদের কোনও কাজ ছিল না। শুধু দেখছি। কাল আমরাই ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করব। তখনই আমাদের মূল কাজ। আর কাল জানতে পারব কে কে নেতা হচ্ছেন আওয়ামী লীগের আগামী তিন বছরের জন্য।

এদিকে আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শনিবার দুপুরে শেষ হয়েছে। বিকালে শুরু হয় কাউন্সিল অধিবেশন। বিকাল ৫টার পর কাউন্সিল অধিবেশন রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। রবিবারের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রবিবারের সম্মেলনে কেবল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। বাকি পদগুলো নির্বাচনের জন্য কাউন্সিলররা সভাপতির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। তবে, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের কেউ নতুন নেতৃত্বে এলে, তাদের নামও সম্মেলন থেকে ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানা গেছে।

এদিকে তৃণমূলের নেতাদের চাপ ও সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ইঙ্গিতে মোটামুটি নিশ্চিত যে, শেখ হাসিনা আবারও দলের সভাপতি নির্বাচিত হচ্ছেন। তবে, কে হবেন দলের সাধারণ সম্পাদক, তা স্পষ্ট হওয়া যাচ্ছে না। বিগত দুই/তিনটি সম্মেলনের ঘটনার মতো এবারও আগে-ভাগে অনেকে ধারণা করেছিলেন সভাপতির মতো এ পদটিতেও কোনও পরিবর্তন আসছে না। তবে সম্মেলনের তিনদিন আগ থেকে হিসাবে কিছুটা গরমিল দেখা দেয়। সাধারণ সম্পাদকের জন্য আলোচিত ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদেরকে দেওয়া দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ’একটি বার্তা’ আগের হিসাবকে পাল্টে দেয়। সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পর কাদের তার ঘনিষ্ঠজনসহ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।