শুভ প্রবারণা: রামুর বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসার আনন্দ

সুনীল বড়ুয়া:
মহামতি বুদ্ধের জীবনের প্রতিটি ঘটনা পুর্ণিমা কেন্দ্রিক। তাই বৌদ্ধদের বড় বড় সকল ধর্মীয় উৎসব হয় পুর্ণিমাকে ঘিরে। বুদ্ধের জন্ম , গৃহত্যাগ, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ ,বুদ্ধের প্রথম ধর্ম প্রচারের দিন সব ঘটনাই ঘটেছে পুর্নিমায়। সবকিছু মিলিয়ে বৌদ্ধদের কাছে পুর্ণিমার গুরুত্ব খুব বেশি। এমনই একটি পবিত্র দিন শুভ প্রবারনা পুর্ণিমা। আষাঢ়ী পুর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পুর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাব্রত পালনের শেষ দি
নটি হচ্ছে প্রবারণা পুর্ণিমা।

বলা যায় প্রবারণা মানে ভুল ত্রুটির নির্দেশ। আশার তৃপ্তি, অভিলাষ পূরণ ও ধ্যান শিক্ষা সমাপ্তি। সকল প্রকার ভেদাভেদ গ্লানি ভুলে গিয়ে কলুষমুক্ত হওয়ার জন্য ভিক্ষুসংঘ পবিত্র সীমা ঘরে সম্মিলিত হয়ে একে অপরের নিকট দোষ স্বীকার করেন। নিজের দোষ স্বীকারের মধ্যে মহত্ত্বতা আছে তা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দেখাতে সমর্থ হন। মানুষ মাত্রেই চেতন কিংবা অবচেতন মনে ভুল করতে পারে। সেই ভুলকে দৃঢ়তার সাথে স্বীকার করে সংশোধনের প্রচেষ্টায় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াইতো জীবনের স্বার্থকতা। কিন্তু ভুল স্বীকার করার মতো সৎ সাহস সবার থাকে না। আভিধানিক বিচারে প্রবারণার অর্থ হল বরণ করা আর বারণ করা। অর্থাৎ সকল প্রকার অকুশল বা পাপকর্ম বর্জন বা বারণ করে কুশল কর্ম বা পূণ্যকর্ম সম্পাদন বা বরণ করার শিক্ষা প্রবারণা দিয়ে থাকে।

প্রবারণা পুর্ণিমার পরদিন থেকে শুরু হয় মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান। এ তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিরলসভাবে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করেন। বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালনের সময় (তিন মাস) প্রত্যেক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে এক জায়গায় বা বিহারে অবস্থান করতে হয়। তিন মাসের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি কারণ ছাড়া এক রাতের জন্যও নিজ নিজ বিহারের বাইরে থাকা যায়না। যদি কোন ভিক্ষু এ নিয়ম ভঙ্গ করেন তাহলে ওই ভিক্ষু কঠিন চীবর লাভ করতে পারেন না।
তবে বিশেষ কয়েকটি কারণে অধিষ্ঠান করে সপ্তাহ ব্যাপী বিহারের বাইরে থাকতে পারেন। কিন্তু সাত দিনের আগেই নিজ বিহারে ফিরতে হবে।

তিনমাস বর্ষাবাস শেষে সারা দেশে নানা আনুষ্টানিকতায় প্রবারনা পূর্ণিমা পালন করা হলেও এ দিনটিকে ঘিরে একমাত্র কক্সবাজারের রামু উপজেলায় বাঁকখালী নদীতে আয়োজন করা হয় জাহাজ ভাসা উৎসব। সোমবার ( ১৭ অক্টোবর) রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ উৎসব। এক সময় কক্সবাজারের চৌফলদন্ডী ও খুরুশকুলের রাখাইনেরা এ উৎসবের আয়োজন করলেও এখন একমাত্র রামুতেই জাহাজভাসা উৎসব পালন করা হয়।

মহামতি বুদ্ধ রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলোৗকিক ক্ষমতা সম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এই দূর্লভ সুযোগ তারা হাত ছাড়া করবে না। সাথে সাথে নাগলোকের পাঁচশত নাগরাজ বিমানের (জাহাজের) মত পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফনা বুদ্ধপ্রমূখ পাঁচশত ভিক্ষুসংঘের মাথার উপর বিস্তার করল। এইভাবে নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতারা, ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মরা বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। সেই দিন মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা, নাগ সবাই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধবজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা গ্রহণ করে পুনরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ছিল শুভ প্রবারণা দিবস।

মূলত এই হৃদয়ছোঁয়া চিরভাস্বর স্মৃতিসম্ভারকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বিশেষ করে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা দিবসে নিকটবর্তী র্বাঁকখালী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত কাগজী জাহাজ ভাসিয়ে প্রবারণা উদযাপন্ করেন।

আষাঢ়ী পুর্ণিমার পর থেকে এ বিশেষ জাহাজ ভাসার আয়োজনকে ঘিরে প্রায় ত্রিশটি বৌদ্ধপল্লীতে চলে দীর্ঘ আনন্দ যজ্ঞ। এটা হল কল্পজাহাজ তৈরীর আনন্দ। এ উৎসবের স্থায়িত্বও দেড়-দুই মাস। দীর্ঘ দেড়-দুইমাস জাহাজ তৈরীর আনন্দ যজ্ঞের পর প্রবারনা পূর্ণিমার দিনে এ জাহাজ বাঁকখালী নদীতে ভাসানো হয়। প্রায় শত বছর ধরে মহাসমারোহে এখানে এ উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে।

রামু উপজেলাকে বৌদ্ধ পূরার্কীতি ও প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শনের শহর বলা হয় । এখানে এখনো মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে আড়াই হাজার বছরের পুরনো সম্রাট অশোকের রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার, লামার পাড়া ক্যাং, চেরাংঘাটা বড় ক্যাংসহ বেশ কিছু স্থাপত্য শিল্প। সম্প্রতি এ ঐতিহ্যে নতুন যুক্ত হয়েছে উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের পাহাড় চূড়ায় তৈরী একশ ফুট লম্বা গৌতম বুদ্ধের সিংহশয্যা মূর্তি। অপূর্ব স্থাপত্য শিল্পে ভরপুর এখানকার প্রাচীন পূরাকীর্তিগুলো স্মরণ করে দেয় অতীতের গৌরবোজ্জল অধ্যায়ের কথা।

শুধু স্থাপত্য ঐশ্বর্য্য-এর শহরই নয়, এসব পূরার্কীতিকে ঘিরে প্রায় সারা বছরই কোন না কোনো উৎসব লেগে থাকে এখানে। এ জন্য উৎসবের শহরও বলা যায় রামুকে।

শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমায় রামকোট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহারে চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ পূজা, চৈত্র সংক্রান্তিতে বুদ্ধস্নান, মেরংলোয়া সীমা বিহারে বৌদ্ধ মহাসম্মেলন, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহারে স্বর্গপুরী উৎসব,পাহাড় চূড়ার চাতোপা চৈত্যে জাদী মেলা, বিহারে বিহারে কঠিন চীবর দান, প্যাঁচঘর বা ব্যুহচক্র মেলা, অন্নদান, মধুদান, হাজার প্রদীপ প্রজ্জলন, ফানুসবাতি উড়ানোসহ বৌদ্ধদের নানা উৎসব যেন রামুকে উৎসবের মহা আনন্দে ভাসিয়ে রাখে।

এ সবের মধ্যে অন্যতম প্রবারণা পুর্ণিমায় বাঁকখালী নদীতে জাহাজভাসা উৎসব। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা জানান, তিন মাস বর্ষাবাস পালনের শেষ দিনে বাঁকখালী নদীতে জাহাজভাসা উৎসব অনুষ্টিত হয়। হাজারো নরনারীর অংশগ্রহনে এ উৎসব প্রতিবছর সাম্প্রদায়িক মিলন মেলায় পরিণত হয় । তারও আগে শুরু হয় জাহাজ তৈরীর আনন্দ যজ্ঞ। মূলত জাহাজ তৈরীর টাকা সংগ্রহকে ঘিরে চলে এ আনন্দায়োজন।

প্রতিদিন রাতের খাবার সেরে পাড়ার শিশু কিশোর ও যুবকেরা নিদিষ্ট স্থানে (যেখানে জাহাজ তৈরীর কাজ চলে)। ঢোল, কাঁসর, মন্দিরা, বাঁশিসহ নানা বাদ্য বাজিয়ে একদল চলে যায় জাহাজ তৈরীর টাকা সংগ্রহে। এ সময় নানা বাদ্যের তালে তালে সমস্বরে গাওয়া হয় বুদ্ধ-কীর্তন ‘শুকনো ডালে ফুল ফুটিল, স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এল, কে কে যাবি আয়রে; বুদ্ধের মত এমন দয়াল আর নাইরে’ অথবা অন্য কোনো গান। কীর্তনের সাথে সমান তালে চলে নাচও। এভাবে পাড়ার প্রতিটি বাড়ি বাড়ি এবং নিজের পাড়া ছাড়িয়ে অন্য পাড়ায়ও চলে যান উৎসাহী এসব শিশু-কিশোরের দল। প্রবারনা পূর্নিমার আগের দিন পর্যন্ত চলে টাকা সংগ্রহ ও জাহাজ তৈরীর এ আনন্দ যজ্ঞ।
জাহাজ তৈরীর জন্য অর্থ সংগ্রহে গেলে পাড়া-পড়শীরা পাঁচ থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেন। এ সময় কোনো বাড়িতে প্রত্যাশিত অর্থ (চাঁদা) না দিলে ওই বাড়ির ওঠানে দীর্ঘক্ষণ নাচ, গান করে এর প্রতিবাদ জানানো হয়। দাবি পূরণ হলেই সাধু.. সাধু… আওয়াজ তোলে, নেচে গেয়ে সেই বাড়ি ত্যাগ করেন। প্রতিদিন অনেক রাত পর্যন্ত চলে এ আনন্দ আয়োজন । ঘুম দূর করতে জাহাজ তৈরীর স্থানে বসানো হয় নাচ গানের আসর। থাকে লাল চা আর বেলা বিস্কিটেরও ব্যবস্থা।

হাইটুপি,পূর্ব মেরংলোয়া,দ্বীপ শ্রীকুলসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন গভীর রাত চলছে এ আনন্দ যজ্ঞ আর জাহাজ তৈরীর কাজ। বাঁশ, কাট, বেত, কাগজে রংয়ের কারুকাজ করে অভিজ্ঞ কারিগরেরা দৃষ্টিনন্দন এ কল্পজাহাজ তৈরী করছেন। বার্মিজ ভাষায় কারিগরদের ‘ছেরা’ বলা হয়। তাই প্রবারণা আসলেই খুব ব্যস্থ সময় পার করেন এসব ‘ছেরারা’ ।

হাইটুপি গ্রামের ছেরা বাই-স রাখাইন জানালেন, এ গ্রামে এ বছরও প্যাগোডা তৈরীর কাজ চলছে। বাঁশ, বেত ও কাটের কাটামোর ওপরে রঙ্গিন কাগজের কাজ করা হবে। সেখানে ফুটিয়ে তোলা হবে রেঙ্গুনী (বার্মিজ) কারুকাজ।

পূর্ব মেরংলোয়া গ্রামের ছেরা লারি মং জানান, এ পাড়ার কল্পজাহাজ এবারে বান্দরবানের পাহাড় চূড়ায় স্থাপিত মহাসুখ প্রাথর্নাপূরক বুদ্ধ ধাতু জাদির আদলে তৈরী করা হবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন গ্রামে কল্পজাহাজে ময়ূর, কবুতর, হাঁস, চূড়া,প্যাগোডাসহ, বিভিন্ন প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

এ বছর আজ ১৭ অক্টোবর বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসা উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি চলবে জাহাজ ভাসানোর আনন্দ। আর এ আনন্দে সামিল হাজারো নরনারীর পদভারে মুখর হয়ে ওঠবে বাকঁখালী নদীর দু’পাড়। মুসলিম,হিন্দ,বৌদ্ধ এবং পর্যটকদের অংশ গ্রহনে এ উৎসব যেন এক অসাম্প্রদায়িক মিলন মেলা। আর প্রবারণার পরের দিন থেকে শুরু হয় মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসব।

সাত-আটটি নৌকার ওপর বসানো হয় এক-একটি কল্পজাহাজ। দূর থেকে দেখে মনে হয় একটি কবুতর, হাঁস,ময়ুর পানিতে ভাসছে। দৃষ্টি নন্দন এসব কল্পজাহাজ খুব সহজেই দৃষ্টি কাড়ে মানুষের। প্রতিটি জাহাজেই থাকে একাধিক মাইক, ক্যাসেট প্লেয়ার, ঢোল, কাঁসর, মন্দিরাসহ নানা বাদ্যযন্ত্র । নদীতে ভাসতে ভাসতে বাদ্যের তালে তালে চলে শিশু কিশোর ও যুবকদের নাচ গান। এখানেও বেশী গাওয়া হয় বুদ্ধ কীর্তন। শুধুমাত্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা নয়, ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজনও এ আনন্দে মেতে ওঠেন।

‘আজ হতে প্রায় দুইশ বছর আগে মিয়ানমারের মুরহন ঘা নামক স্থানে একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম জাহাজ ভাসানো উৎসবের আয়োজন করেন। সেখান থেকে বাংলাদেশের রামুতে এ উৎসবের প্রচলন হয়। সেই থেকে প্রায় শত বছর ধরে এ উৎসবকে ঘিরে রামুর বৌদ্ধ পল্লীগুলোতে এ আনন্দায়োজন চলছে’ বলে জানালেন, দক্ষিন চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের ।
.