রিপোর্টারের ডায়েরি: এক রাতের বর্ষণেই চেহারা বদল

তোফায়েল আহমদ:
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নব নিযুক্ত চেয়ারম্যান কর্ণেল (অব) ফোরকান আহমদ বুধবার সকাল দশটায় মোবাইল করে জানালেন-তিনি শহরের তিনটি এলাকা পরিদর্শন করতে চান। তিনি যেতে চান বাজার ঘাটা, বাস টার্মিনাল এবং কলাতলি এলাকায়। রাতভর বিরতিহীন ভারি বর্ষণের শহরটি তিনি সরেজমিন দেখতে চান কি অবস্থায় আছে । পরিদর্শনের সময় তিনি পেতে চান পৌর কর্তৃপক্ষের কাউকে। তখনই সমস্যা এবং সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া হয়তোবা তার জন্য সহজ হবে। কিন্তু পাচ্ছিলেন না কাউকে। এ কারণেই আমার কাছে মোবাইল।

বন্ধের দিন বিধায় সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি। আমি তৎক্ষনাৎ একজন কাউন্সিলার, পৌরসভার সচিব ও হিসাব রক্ষক সহ তিনজনের নিকট মোবাইল করলাম। তিনটি মোবাইলই বন্ধ। এরপর ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরীকে পাওয়া গেল। তিনি জানালেন-‘এই মাত্র আমি ঘর থেকে নিচে নেমেছি। পুরো বাজার এলাকা পানিতে থৈ থৈ করছে। আমি এখান থেকে প্রধান সড়কে যাবারও কোন উপায় দেখছি না।’ তাকে জানালাম কউক চেয়ারম্যানের এলাকা পরিদর্শনে বের হবার সংবাদটি।

সিদ্ধান্ত নিলাম পেশাগত কারণে শহরের কয়েকটি এলাকায় গিয়ে কিছু ছবি নেব। কিন্তু ফেসবুক অন করেই প্রথম দেখতে পেলাম শহরের টেকপাড়া-উত্তর টেকপাড়ার আমিনা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তা, অলি-গলি আর বাসা-বাড়ী। এলাকারই বাসিন্দা যুবনেতা আবদুর রহিমের ফেসবুক আইডিতে জলমগ্ন রাস্তায় সাবেক এমপি অধ্যাপিকা এথিনের ব্যক্তিগত গাড়িটির ছবিও দেয়া হয়েছে। এরপর সাবেক পৌর কমিশনার আবদুল খালেকের ফেসবুক আইডিতে এ শহরের ঐতিহ্যবাহী টেকপাড়া এলাকার দুর্গতির কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কেবল এক রাতের বর্ষণেই বদলে গেছে এ শহরের চেহারা। ‘অদক্ষরা দক্ষ হলে এমন করে ডুবে থাকতে হয়’-এরকম বিরুপ মন্তব্য জুড়ে এইচ, এম, নজরুল এবং মহসীন শেখ সংবাদকর্মীদ্বয়ের ফেসবুক আইডির ডুবে যাওয়া এলাকার ছবি রীতিমত উদ্বেগজনক।

প্রযুক্তির বদৌলতে ফেসবুকেই একে একে আসতে শুরু করেছে বিভিন্ন এলাকার জলমগ্ন ছবি। শহরের রুমালির ছড়া পিটিআই এলাকা, পেশকার পাড়া, সদর উপজেলা গেইট, বাস টার্মিনাল, কলাতলি বাইপাস সড়ক থেকে বাহারছড়া এলাকা পর্যন্ত পানি আর পানি। মনে হচ্ছিল ভিডিও কনফারেন্সেই যেন আমি ঘরে বসে সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। পুরো দিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব দুর্গতির চিত্র। বলতে গেলে শেষ বর্ষার বিদায়ী বর্ষণ এটি। তাও দেবী দুর্গার বিদায় লগ্নের ভারি বর্ষণ। মাত্র চব্বিশ ঘন্টায় ১৮০ মিলিমিটার বর্ষণের পানিতেই পুরো শহরটি ভাসিয়ে দিয়ে গেছে।

ফারাক্কার বাঁধের গেইট খুলে দিলে পদ্মা-যমুনার পানিতে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা শহর ডুবে যায়। পানিতে এরকম জলমগ্ন শহরের রাস্তাঘাট দেখলে আমরা এক সময় অবাক হতাম। কেননা আমরা এ শহরের কোন অলিগলি এরকম জলমগ্ন দেখিনি। এখন আমাদের তাই দেখতে হচ্ছে। বুধবারের একদিনেই বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত তীরের এই শহরটির চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। এর আগে বর্ষণ ছিল না-এমনতো নয়। বর্ষার সময় বর্ষণ সর্বকালেই ছিল। কিন্তু এরকম শহরের রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ী সয়লাব হত না পানিতে। কিন্তু এখন হচ্ছে। কারণ নালা-নর্দমা বেহাত হয়ে গেছে। প্রশস্ত নালা-নর্দমা করে এরকম দুর্গতির অবসান করা সম্ভব বলে বলা হয়। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে এই শহরেই এরকম পাকা নালা করে হয়েছে তার উল্টোটিও।

তাও এই দীর্ঘ পাকা নালা করা হয়েছে তের কোটি টাকা ব্যয়ে। কলাতলি থেকে পর্যটন এলাকার যে পাকা নালাটি করা হয়েছে এই অপ্রশস্ত নালার কারণেই আজ পুরো পর্যটন এলাকা এবং কলাতলি বাইপাস সড়কটি ডুবে যায় পানিতে। অর্থাৎ তের কোটি টাকাই চোখের সামনে গেল পানিতে ভেসে। তিনি আমাদের নির্বাচিত মেয়র (বর্তমানে বরখাস্ত) জামায়াতে ইসলামীর সরোয়ার কামাল সাহেব। তার সাথে বদরমোকাম মসজিদে জুম্মার নামাজের ফাঁকে কিছুদিন আগে আলাপ হয় নালাটি নিয়ে। তিনি বললেন-মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রকৌশলী দিয়ে সেই নালাটির ডিজাইন করার কারণেই আজ তের কোটি টাকা অহেতুক গেল। কেবল একজন প্রকৌশলীর কারণে জাতির এত কোটি টাকার অপচয় মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তদুপরি দেশের প্রধান পর্যটন নগরির এতবড় ক্ষতির কারণ যদি সত্যিই প্রকৌশলী হয়ে থাকেন তাহলে এই লোকটির চেহারা একবার দেখতে ইচ্ছে করে।

শত বছরের কক্সবাজার পৌরসভা। সে কতদিন আগে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা লাভ করেছে। তবুও এতদিন ধরে একাই চলেছে কঠিন পথে। ছিল না পরামর্শ দেয়ারও একজন সঙ্গী-সাথী। এখন পাশে থাকবে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। সুখে-দুঃখে শলা-পরামর্শ করা যাবে। অর্থাৎ শেয়ার করা যাবে এবার।

সব কথার শেষ কথা হচ্ছে-শেয়ার আর সমন্বয়ের কোন বিকল্প নেই। কউকের সাথে সমন্বয় করে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নেয়া হলে তের কোটি টাকার আলোচিত নালাটির মত দ্বিতীয় ঘটনাটি আর নাও ঘটতে পারে। সেই সাথে অবশ্যই পৌরসভাকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিকাদারি কাজের অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে- এ শহরের আলোচিত-সমালোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকেও। যাদের বদনামের কারণে বিরক্ত শহরবাসী।

এমন কঠিন কাজটি করা গেলে পৌরসভার ইমেজ বাড়বে। সেই সাথে বাড়বে মানুষের আস্থাও।

*****************************************************************************************************************

লেখক-তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজারে কর্মরত দৈনিক কালের কন্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও বিবিসি’র স্ট্রিঙ্গার।