স্বাস্থ্য ক্ষয়ে যাচ্ছে চানিতির মাথার খুলি

দিনটি ছিল এ বছরের ১৯ জুন। সেদিন খাগড়াছড়ির পুরাতন যৌথখামার ত্রিপুরা পাড়ায় ঘুরতে যান মলয়ছড়ি স্কুলের শিক্ষক পিপলু রাখাইন।

সেখানে তাকে দেখে হামাগুড়ি দিতে দিতে এগিয়ে আসে একটি মেয়ে। কাছে এসে ওই শিক্ষককে প্রণাম করে। মেয়েটির উদ্দেশ্য শিক্ষকের কাছ থেকে একদিনের ওষুধের খরচ নেওয়া।

মেয়েটির নাম চানিতি ত্রিপুরা (১৬)। যন্ত্রণায় প্রতিদিন কাটে তার। মাথার উপরে একটি বড় ধরনের ঘা।

চানিতির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে পিপলু জানতে পারেন, তার মাথায় দুই বছর আগে একটি টিউমার দেখা দেয়। তাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। একবছর সে ভালো ছিল। পরের বছর মাথার ঠিক একই জায়গায় আরো একটি টিউমার দেখা দেয়। সেখানে আবারো অস্ত্রোপচার করা হয়।

দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের পর ড্রেসিংসহ অন্যান্য চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেনি চানিতির পরিবার। ফলে থেমে যায় চিকিৎসা। তিন মাসের মাথায় মাথার ওখানে বড় আকারের ঘা হয়। আবার চিকিৎসকদের কাছে যায়। চিকিৎসকরা তাকে আবার ওষুধ দেয়। ওই সময়ে প্রতিদিন খরচ হয় ২০০ টাকা।

ইতিমধ্যে ওষুধের খরচ জোগাতে গরু পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। পরিবারের আর সাধ্য নেই চিকিৎসা করার।

এদিকে, এ অবস্থা শুনে চানিতির চিকিৎসায় সহযোগিতা চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন পিপলু রাখাইন। ওই স্ট্যাটাসের পর অনেকেই এগিয়ে আসেন। চানিতির চিকিৎসায় আর্থিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তারা।

পিপলু রাখাইন জানান, চানিতি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মলয়ছড়ি উপজেলার পুরাতন যৌথখামার ত্রিপুরা পাড়ার চাইলাপ্রু ত্রিপুরার মেয়ে। সে অসুস্থ। ধীরে ধীরে তার মাথার খুলি ক্ষয় হচ্ছে। বর্তমানে সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডা. শফিকুল ইসলামের অধীনে চিকিৎসাধীন।

২১ সেপ্টেম্বর চানিতিকে রাজধানীর ক্যানসার হাসপাতালে আনা হয়। সেখান থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তার আগে চানিতিকে তিনমাস চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

পিপলু রাখাইন আরো জানান, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকরা চানিতির রোগটি ‘Non Healing Scalp ulcer and Skull Erosion’ বলে জানিয়েছে। যে কারণে Trichoepithelioma নামের টিউমার হয়েছে মেয়েটির।

গত রোববার ঢাকা মেডিক্যালে চানিতির মাথায় ড্রেসিং করা হয়। চানিতির সঙ্গে তার মা-বাবা ও দুলাভাই হাসপাতালে রয়েছেন।

খাগড়াছড়ি থেকে পিপলু রাখাইন এদিন তাকে দেখতে আসেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, তার ঘা আগে যেমন ছিল এখন তেমন নেই। ধীরে ধীরে লালচে হচ্ছে। এটাকে ভাল লক্ষণ মনে করছেন চিকিৎসকরা। আরো উন্নতি হলে আবার অস্ত্রোপচার করা হবে।

তিনি বলেন, চানিতিকে যখন ঢাকা পাঠাবো তখনও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই। যা দেখে জাহিদুল ইসলাম সেতুসহ কয়েকজন সাড়া দেন। পরে তাদের সহযোগিতায় ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকায় আসার পর তারাই খোঁজখবর রাখছেন।

চানিতির ওষুধ খরচ, তার মা-বাবা ও দুলাভাইয়ের ঢাকায় থাকা-সবমিলে প্রতিদিন এক হাজার ৮০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তিন লাখ টাকা সহযোগিতা এসেছে। তা দিয়েই চলছে চিকিৎসা।

ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে কথা হয় চানিতির সঙ্গে। সে জানায়, আগের তুলনায় তার কিছুটা ভালো লাগে। তবে দেহের একপাশ নড়াচড়া করতে পারে না।

চানিতির বাবা চাইলাপ্রু ত্রিপুরা বলেন, ‘চার মেয়ের মধ্যে চানিতি ছোট। অন্য তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। চানিতির চিকিৎসার জন্য যারা সহযোগিতা করছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

চানিতিকে সহযোগিতা করছেন স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম সেতু। তিনি বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য। আমরা সবাই যদি এগিয়ে আসি- তাহলে চানিতির মত অসহায় মানুষগুলো নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাবে।’

**********************************************************************************************************
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here