এবার সাত্ত্বিকে হবে দুর্গাপূজা

শিপন পাল:

গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ে উল্লেখ আছে সত্ত্বগুণ নির্মল এবং নির্দোষ। রাগাত্মক, তৃষ্ণা ও আসক্তি হতে রজোগুণের উৎপন্ন। আর তমোগুণের উৎপন্ন অজ্ঞানতা থেকে। এই গুণের প্রভাবে বিবেকভ্রংশ, নিরুদ্যমতা, কর্তব্যের বিস্মরণ এবং মোহ বা বুদ্ধির বিপর্যয় ঘটে। আমরা জানতে পারি, মহিষাসুর তমসাচ্ছন্ন গুণে গুণান্বিত ছিলেন। মহিষাসুর এতই বলবান ছিলেন যে তাঁকে পরাজিত করতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব তিন দেবতার শক্তি একত্রিত করতে হয়েছিল। তাঁদের সঞ্চারিত শক্তি থেকে আবির্ভূত দেবী মাতা দূর্গার সংহারে মহিষাসুর বধ হয়েছিল। তাই দেবী মাতা শুধু মহিষাসুরকে বধ করেন নাই, এরই মাধ্যমে তিঁনি বধ করেছেন ক্রোধসহ তমসাচ্ছন্ন গুণকেও। সমস্ত অভিলাষ ও আসক্তি ত্যাগে কিভাবে উজ্জ্বল ও নির্মল জ্ঞানের অধিকারী হতে হয় তা আমরা দেবী মাতার মহিষাসুর বধ থেকে জানতে পারি।

প্রতি বৎসরের মতো শুরু হয়েছে আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপুজা। কক্সবাজারে পুজার আমেজ একটু ব্যতিক্রম। পর্যটন এলাকা হওয়ায় দূর্গাপুজা নিয়ে কক্সবাজারে পর্যটকদের সমাগম লক্ষ্যনীয়। শেষ দিবসের দিনেও ঘটে লক্ষ ভক্তের সমাগম।

কিরূপে পুজা করতে হবে তা আমরা ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে শিক্ষা পেয়ে থাকি। দূর্গাপুজার ক্ষেত্রে কিছু কিছু জিনিস আমরা ব্যত্যয় ঘটায় প্রতিনিয়ত। আমাদেরকে বলা হয়েছে সাত্ত্বিকভাবে পুজা করার জন্য। যেখান থেকে আমাদের জ্ঞানরূপ প্রকাশ পাবে। যার মাধ্যমে সমস্ত অশান্তি দূরীভুত হবে। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়, পুজার মাধ্যমে আমরা জ্ঞানরূপকে যেন প্রকাশ করতে পারি বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। যাতে দেবী মাতার আশীর্বাদে মানব সম্প্রদায়ের সমস্ত অশান্তি দুর হয়।

তমোগুণ পরিহার করে পুজো করার জন্য আমাদের ধর্মীয় শাস্ত্রগুলোতে নির্দেশনা রয়েছে। তমোগুণই আমাদের জ্ঞানকে তিরোহিত করছে বার বার। আমরা বশীভুত হয়ে পড়েছি তমোগুণের কাছে। আমরা জানি, দূর্গাপুজা একটি ধর্মীয় উৎসব। স্বাভাবিকভাবেই পুজামন্ডপ একটি পবিত্র স্থান। এটি কোন নাইটক্লাব নয়। পুজামন্ডপে অশ্লীল, রিমিক্স ও নোংরা ভাষার গান কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পুজায় ধর্মীয় গান, ঢাক-ঢোল, ধর্মীয় নৃত্যের মাধ্যমে পুজা মন্ডপে সামিল হওয়া উচিৎ। গীতায় বলা হয়েছে, এগুলো তমোগুণ সম্পন্ন ব্যক্তি অর্থাৎ তামসিক ব্যক্তিরাই করে থাকে। আর এসব তমসাচ্ছন্ন ব্যক্তি পরলোকে গমন করলে তাহাকে পশুযোনিতে জন্ম নিতে হবে। এসব তমসাচ্ছন্ন লোকের সংখ্যা মুষ্টিমেয়। আমরা চায় না, মুষ্টিমেয় লোকের কারণে দূর্গাপুজায় এসব তামসিক আচরণ করে মানব জাতি পশুযোনিতে জন্ম নিতে।

আমাদের পুজোটা আসলে ব্যয়বহুল। তবে ধর্মীয় শাস্ত্রমতে এভাবে ব্যয়বহুল পুজা করার নির্দেশনা রয়েছে কিনা আমার জানা নেই। পুজোর আচার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে অনেক দূর থেকেও মাতাকে লক্ষ্য করা যেত। এখন দূর থেকে নয়, কাছ থেকেও দর্শন করা যায় না। শত শত লাইটের আলোকছটা, অতিরিক্ত ডেকোরেশন জাতীয় ব্যয় বহুল সংস্কারগুলোকে আমাদের ধর্মীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছে রাজসিক গুণ। যেগুলোর কারণে তৈরি হচ্ছে আসক্তি ও অভিলাষ। এসব রজোগুণের কারণে প্রতিবৎসর আমাদের মধ্যে লোভ সৃষ্টি হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে অশান্তি। যেগুলো ধর্ম নিয়ে নেতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। আমাদের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে স্পৃহা ও ক্ষোভ। ধর্মীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এসব রাজসিক গুণ সাত্ত্বিক পূজাকে ব্যাহত করে। পুজোয় রাজসিক এসব আচরণ ব্যতিরেকে মায়ের সন্তুষ্টির জন্য সাত্ত্বিক পুজো করা আবশ্যক।

অবশ্যয় পুজো হতে হবে মঙ্গল আরতি, ধর্মীয় গান, ঢাক-ঢোল, ধর্মীয় নৃত্যের মাধ্যমে। প্রতিমা হতে হবে সাদাসিধে। যেখানে মায়ের নির্মল চেহারা ভেসে উঠে। যার নির্মল মুখশ্রী দর্শন ও স্নিগ্ধতার পরশে সমস্ত অশান্তি, হিংসা-বিদ্বেষ দূর হবে। যার আশীর্বাদে পুজা মন্ডপ থেকে অতীত হবে অশ্লীল, রিমিক্স ও নোংরা ভাষার গান। রাজস ও তামস কর্মের প্রভাবকে দূরে ঠেলে পুজোর সমস্ত কার্যক্রম এমনভাবে সাত্ত্বিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে যাতে অন্যেরাও পুজোয় গিয়ে শ্রদ্ধাবোধ জানাতে পারে এবং ধর্মীয় কিছু শিখতে পারে।

তাই এবার পুজো হওয়া চাই ‘সাত্ত্বিকে’, ‘তামসিক’ বা ‘রাজসিক’ভাবে নয়। এরজন্য আমাদের সনাতন ধর্মীয় নিষ্ক্রিয় সংগঠনগুলোকে জাগ্রত হওয়া দরকার। সাংগঠিনকভাবে হস্তক্ষেপ করে জানিয়ে দিতে হবে তমোগুণে এবং রজোগুণে পুজো করলে আমরা ফল পাবো না। সাত্ত্বিকভাবে পুজা করেই জাতির মঙ্গল কামনা করতে হবে।

আমরা চাই না-তামসাঃ পুজা করে অধঃপতিত হয়ে নরলোকে গমন করতে, আমরা চাই না-রাজসাঃ পুজা করে নরলোকে অবস্থান করতে। আমরা চাই, সাত্ত্বিক পুজা করে উচ্চতর লোকে গমন করতে। আমাদের উচ্চতর লোকে গমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে জেলা, উপজেলা, শহর, ইউনিয়ন ভিত্তিক পুজা কমিটিগুলো। উচ্চতর লোকে গমণে কক্সবাজার জেলার সনাতনী সম্প্রদায় তাকিয়ে আছে সনাতনী ধর্ম ভিত্তিক সংগঠনগুলোর দিকে। আমাদের আচরণের কারণে সনাতন ধর্ম নিয়ে অন্য কেউ দোষত্রুটি না ধরার আগেই আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি।

হে সংহাররূপিনী, পরমজ্যোতির্ম্ময়ী, আনন্দদায়িনী, সর্ব্বকারিনী, জগতের প্রাণশক্তি, প্রকাশস্বরূপিণী একমাত্র তুমিই পারো আমাদের রজো ও তমোগুণকে বিনাশ করতে। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

লেখকঃ সংবাদকর্মী।