তালগোল পাকিয়ে বাংলাদেশের হার

ইমরুল কায়েসের ক্যারিয়ার সেরা ব্যাটিং আর সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত ইনিংসে এক সময় জয় দেখা বাংলাদেশ হেরেছে শেষটায় তালগোল পাকিয়ে।
বেন স্টোকসের প্রথম শতকে বড় সংগ্রহ গড়া ইংল্যান্ড জিতেছে ম্যাচের শেষ দিকে অভিষিক্ত জেইক বল আর আদিল রশিদের দারুণ বোলিংয়ে।রিপোর্ট বিডিনিউজের।

প্রথম ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের ২১ রানের জয়ে অভিষেকে আলো ছড়িয়েছেন বেন ডাকেটও। অধিনায়কোচিত ইনিংস খেলেছেন জস বাটলার।

এক সময়ে ছয় উইকেট হাতে থাকা বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৩৯ রান, হাতে ছিল ৫২ বল। কিন্তু ১৭ রান তুলতেই শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলে স্বাগতিকরা!

শুক্রবার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে ৮ উইকেটে ৩০৯ রান করে ইংল্যান্ড। জবাবে ৪৭ ওভার ৫ বলে ২৮৮ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ।

লক্ষ্য তাড়ায় ক্রিস ওকসের করা ম্যাচের তৃতীয় বলটি দুর্দান্ত এক ফ্লিকে গ্যালারিতে নিয়ে ফেলেন ইমরুল। শেষ বলে হাঁকান চার। প্রথম ওভারে ১১ রান নিয়ে লক্ষ্য তাড়ায় শুরুটা ভালো করে বাংলাদেশ।

শুরু থেকেই অফ স্টাম্পের বাইরে ইমরুল-তামিম ইকবালকে টানা বল করেন ইংল্যান্ডের দুই পেসার ক্রিস ওকস ও ডেভিড উইলি। ক্রস ব্যাটে চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। তামিম পারেননি কিন্তু প্রস্তুতি ম্যাচে বিসিবি একাদশের হয়ে শতক করা ইমরুল দেখান নিজের আত্মবিশ্বাস।

স্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়েই জেইক বলের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন তামিম। উইকেট মেডেন নিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ার শুরু করেন পেসার বল।

ছোট্ট এক ইনিংসে রানের গতি বাড়িয়ে দিয়ে যান সাব্বির রহমান। ১১ বলে তিন চারে ১৮ রান করা এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান ফিরেন বলের বলে উইলির অসাধারণ এক ক্যাচে পরিণত হয়ে।

মিডল অর্ডারের দুই ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিম পারেননি পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে। রান রেট তখন খুব ভালো, প্রয়োজন শুধু সঙ্গ দিয়ে যাওয়া। কিন্তু তারা দুই জনই ফিরেন আদিল রশিদের ওপর চড়াও হতে গিয়ে। দুই জনই এই লেগ স্পিনারের বলে ডিপ মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন।

২৬ বলে ২৫ রান করার পথে ইমরুলের সঙ্গে ৫০ রানের জুটি গড়েন মাহমুদউল্লাহ।
২৭তম ওভারের প্রথম বলে মুশফিক ফিরে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের স্কোর ৪ উইকেটে ১৫৩ রান। ইমরুলের সঙ্গে জুটি বাধেন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দুই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান গড়েন ১১৮ রানে দারুণ এক জুটি।

এর মধ্যেই মিস ফিল্ডিং থেকে দুই রান নিতে গিয়ে ইমরুলের বাঁ পায়ে টান লাগে। জুটির রান তখন কেবল ২০। দলকে কক্ষপথে রাখতে টান নিয়ে ব্যাট করেন বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। পৌঁছান নিজের দ্বিতীয় শতকে।

ইমরুল টান পাওয়ার পর আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হয় সাকিবকে। রান-বলের সমীকরণ মাথায় রেখে হিসেবী ঝুঁকি নিয়েছেন তিনি। খেলেছেন দারুণ সব শট। ৩৯তম ওভারের প্রথম বলে তার চারেই প্রথমবার প্রয়োজনীয় রান রেট নেমে আসে ছয়ের নিচে। মইন আলির এক ওভারে সাকিব হাঁকান একটি করে ছক্কা-চার। ওকসের এক ওভারে হাঁকান তিন চার।

৩৯ বলে অর্ধশতকে পৌঁছানো সাকিব করেন ৭৯ রান। তার ৫৫ বলের ইনিংসে ১০টি চার ও একটি ছক্কা। দলীয় ২৭১ রানে বলের বলে তার বিদায় দিয়ে ধসের শুরু হয় বাংলাদেশের ইনিংস।

পরের বলে মোসাদ্দেককে বোল্ড করে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগান বল। মাশরাফি বিন মুর্তজা হ্যাটট্রিক ঠেকালেও বেশিক্ষণ টিকেননি, রশিদকে উইকেট দিয়ে আসেন। আসা-যাওয়ার মিছিলে যোগ দেন ইমরুলও। ১০৫ বলে শতকে পৌঁছানো বাঁহাতি ব্যাটসম্যান শেষ পর্যন্ত ১১৯ বলে করেন ১১২ রান। তার ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসটি ১১টি চার ও ২টি ছক্কা সমৃদ্ধ।

রান আউট হয়ে ফিরেন শফিউল ইসলাম। শেষ ব্যাটসম্যান তাসকিন আহমেদকে ফিরিয়ে অভিষেকে পাঁচ উইকেট নেন বল। ৫১ রানে ৫ উইকেট নিয়ে তিনিই দলের সেরা বোলার। লেগ স্পিনার রশিদ ৪ উইকেট নেন ৪৯ রানে।

এর আগে জেমস ভিন্সের সঙ্গে অতিথিদের ভালো শুরু এনে দেন জেসন রয়। শুরু থেকে আঁটসাঁট বোলিং করা শফিউল ইসলামের বলে তুলে মারতে গিয়ে মাশরাফির তালুবন্দি হন ভিন্স। ভাঙে ৪১ রানের জুটি।

পঞ্চম ওভারে আক্রমণে আসা সাকিব আল হাসান প্রান্ত বদল করেই ফেরান বিপজ্জনক রয়কে। লংঅফ দিয়ে উড়িয়ে সীমানা করার চেষ্টায় সাব্বিরের ক্যাচে পরিণত হন তিনি।

সাব্বিরের দুর্দান্ত থ্রোয়ে রানের খাতা খোলার আগেই ফিরে যান জনি বেয়ারস্টো।

৬৩ রানে তিন ব্যাটসম্যানকে বিদায় করে দেওয়া বাংলাদেশ চেপে ধরে ইংল্যান্ডকে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে স্বাভাবিক ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন স্টোকস ও ডাকেট। বাংলাদেশের বাজে ফিল্ডিংয়ে তাদের জুটি আরও জমে উঠে।

ব্যক্তিগত ৬৯ রানে তাসকিন আহমেদের বলে মাহমুদউল্লাহর হাতে মিডঅনে জীবন পান স্টোকস। পরের ওভারে ৭১ রানে মাশরাফির বলে ডিপ মিডউইকেটে তার ক্যাচ ফেলেন মোশাররফ।

জীবন দুই হাতে কাজে লাগিয়েছেন স্টোকস। দারুণ সব শট খেলেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত শতকে পৌঁছে মাশরাফির বলে সাব্বিরকে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন তিনি। ১০০ বলে খেলা তার ১০১ রানের ইনিংসটি গড়া ৮টি চার ও ৪টি ছক্কায়।

স্টোকসের পুল, ফ্লিক, অন ড্রাইভগুলো ছিল দুর্দান্ত। স্পিনারদের এলোমেলো করে দিতে খেলেছেন দারুণ কিছু রিভার্স সুইপ। মাশরাফির বলেও রিভার্স সুইপ খেলতে কোনো সমস্যা হয়নি তার। স্পিনারদের আক্রমণের জন্য মিডউইকেটে সীমানা ছিল তার লক্ষ্য। স্টোকস চার ছক্কার তিনটিই হাঁকান মিডউইকেট দিয়ে।

এর আগেই অভিষেকে অর্ধশতক পাওয়া ডাকেটকে ফিরিয়ে ১৫৩ রানের জুটি ভাঙেন শফিউল। দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে নিচু ফুলটস বলে ৬০ রান করা বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করেন তিনি। মোশাররফের হাতে একবার জীবন পাওয়া ডাকেটের ৭৮ বলের ইনিংসটি সাজানো ৬টি চারে।

মাশরাফিকে হুক করতে গিয়ে তামিমকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন মইন। দ্রুত তিন উইকেটের পতনে পাওয়া স্বস্তি মিলিয়ে যেতেও বেশি সময় লাগেনি। বাটলারের শেষের ঝড়ের সামনে অসহায় ছিলেন স্বাগতিক বোলাররা। শেষ পাঁচ ওভার থেকে ৬০ রান নেয় অতিথিরা।

শেষ ওভারে বাটলারকে ফিরিয়ে নিজের দ্বিতীয় উইকেট নেন সাকিব। ৩৮ বলে খেলা বাটলারের অধিনায়কোচিত ইনিংসটি চারটি ছক্কা ও তিনটি চার সমৃদ্ধ।

বাংলাদেশের মাশরাফি, সাকিব ও শফিউল দুটি করে উইকেট নেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ইংল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৩০৯/৮ (রয় ৪১, ভিন্স ১৬, ডাকেট ৬০, বেয়ারস্টো ০, স্টোকস ১০১, বাটলার ৬৩, মইন ৬, ওকস ১৬, উইলি ০; মাশরাফি ২/৫২, সাকিব ২/৫৯, শফিউল ২/৫৯)

বাংলাদেশ: ৪৭.৫ ওভারে ২৮৮ (তামিম ১৭, ইমরুল, সাব্বির ১৮, মাহমুদউল্লাহ ২৫, মুশফিক ১২, সাকিব ৭৯, মোসাদ্দেক ০, মাশরাফি ১, মোশাররফ ৭*, শফিউল ০, তাসকিন ১; বল ৫/৫১, রশিদ ৪/৪৯)

ফল: ইংল্যান্ড ২১ রানে জয়ী

ম্যাচ সেরা: জেইক বল