রামু সহিংসতার ৪ বছরেও বিচার হয়নি : প্রতিকার

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর :
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রামু সহিংসতার চার বছর পূর্ণ হল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন আসামীর বিচারে শাস্তি হয় নাই কেন? চার বছরে কয়টা মামলার বিচার সমাপ্ত হয়েছে? না হলে, কেন বিচার সমাপ্ত হল না? এ প্রশ্নগুলির উত্তর কে দেবে? বিগত তিন বছর ধরে ২৯ সেপ্টেম্বর আসলে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়,টিভিতে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। এই বারও তা হয়েছে। স্থানীয় প্রায় সবগুলো পত্রিকায় এ নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় পত্রিকাগুলোও এ নিয়ে সংবাদ ছেপেছে। আমাদের সময়ে ’৪ বছরেও আইনের আওতায় আসেনি জড়িতরা’ শিরোনামে লিখেছেন সরওয়ার আজম মানিক। তিনি চ্যানেল আই টিভিতেও একটি সুন্দর সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন প্রচার করেছেন। কক্সবাজারের সিনিয়ার আইনজীবী ও সিনিয়ার সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ ’কক্সবাজারে বৌদ্ধপল্লীতে হামলার চার বছর,সাক্ষীর অভাবে দুটি মামলার বিচার বন্ধ,১৬টির খবর নেই’ শিরোনামে একটি তথ্যনির্ভর সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন কালের কন্ঠে প্রকাশ করেছেন।

আমি দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার একজন নিয়মিত কলাম লেখক হলেও পেশায় আমি একজন আইনজীবী। ২৮ বছর আগে কক্সবাজার জেলার পাবলিক প্রসিকিউটারের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। তাই এই সংক্রান্তে আমার অভিজ্ঞতা ও মতামত নিয়ে কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। অবশ্য যে কেউ আমার মতের সাথে দ্বিমত পোষন করতে পারেন।

আমার মতে, রামু সহিংসতা সম্পর্কে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি গত ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে,যা ’রামু সহিংসতার চার বছরঃ একটি অপ্রিয় সত্যপাঠ’ শিরোনামে লিখেছেন প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু। আমার মত যে কোন সাধারণ পাঠকের কাছে লেখাটা সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে।ঢাকার কোন পত্রিকায় লেখাটা প্রকাশিত হলে এবং তা কেউ মহামান্য হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সরকারের উপর সুমোটো রূলও ইস্যু হতে পারে।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা একযোগে হামলা চালায় রামুর ঐতিহ্যবাহী ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধপাড়ায়। পরের দিন উখিয়া ও টেকনাফও হামলা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় আরো সাতটি বৌদ্ধ বিহার। এ সব ঘটনায় মোট ১৯টি মামলা হয়েছে। গত চার বছরে কেবল একটি মামলার আপসসুত্রে মিমাংসা হয়ে ৩৮ জন আসামী খালাস পেয়েছে। বাকী ১৮টি মামলা এখনও নিস্পত্তি হয় নাই। গত বছর শেষের দিকে দুটি মামলার সাক্ষ্য গ্রহন শুরু হলেও সাক্ষীরা দল বেধে আদালতে এসে কোন আসামীর নাম উল্লেখ না করেই আপসমূলক সাক্ষ্য প্রদান করতে থাকলে বিষয়টি সরকারের উপর মহলের নজরে আসায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করার পর রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির মুখে আদালত বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে চারটি বিচারাধীন মামলা আবার অধিকতর তদন্তের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
আইনত আপসযোগ্য নয় এমন ধারার মামলায় কিভাবে কোন আইনে আপসসুত্রে মিমাংসা করে আসামীদের খালাস দেওয়া হয়েছে? আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে কেন সাক্ষীরা (ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকসহ ) আসামীর নাম বলছেন না? কেন আপস করছেন? ভয়ভীতি ও নিরাপত্তার কারণে,নাকি আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে আসামীদের নাম বলছেন না? প্রকৃত অপরাধীদের নাম কোন মামলার এজাহারে,অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তারা বিচারের আওতায় না আসায় বা কম অপরাধী বা নির্দোষ মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে উৎসাহবোধ না করায় চরম হতাশা থেকে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আসামীদের নাম বলছেন না?

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর বিলম্বিত ও সাহসী এই লেখায় এবং বৌদ্ধ নেতাদের সাক্ষাৎকারে হাতাশার কারণ উপলব্ধি করার সুত্র পাওয়া যায়। প্রকৃত সত্য কি তা জনগণ না জানলেও মামলাগুলো নিয়ে রাজনীতি ও ব্যাপক বাণিজ্য হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারায় মামলা রুজু হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করার নির্দেশ আছে। ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৩৯সি ধারায় একজন ম্যাজিষ্ট্রেট মামলা বিচারের জন্য গ্রহন করার দিন থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে এবং দায়রা জজ আদালত বিচারের জন্য মামলা গ্রহন করার পর থেকে ৩৬০ দিনের মধ্যে মামলার বিচার সমাপ্ত করার নির্দেশনা আছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না করলে বিচার বিলম্বিত হয়। তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও আসামী পলাতক থাকলেও বিচার বিলম্বিত হয়। তবে আসামী পলাতক থাকলে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ও মালক্রোকী পরোয়ানা জারী দেখিয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রচারের মাধ্যমে অনুপস্থিত বা পলাতক আসামীদেরও বিচার শুরু করা যায়।

সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক ও সৎ হলে ৬ মাসের মধ্যেই মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত করা যায়। মামলা রুজুর এক বছরের মধ্যেই মামলার বিচার নিস্পত্তি হওয়ার নজির বাংলাদেশে বেশ আছে যা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়। মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহনের জন্য দিন নির্ধারণ করলেও সাক্ষীরা স্বেচ্ছায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে না আসলে বা পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে আনার ব্যবস্থা গ্রহন না করলে বা সাক্ষী আদালতে হাজির হলেও বিভিন্ন অজুহাতে তাদের হাজিরা দাখিল না করলে সাক্ষীরা হতাশ হয়ে চলে যান। আর আদালতমূখী হতে চান না। এটাও মামলার বিচার সমাপ্তির বিলম্বের কারণ হতে পারে। উল্লেখিত ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের অমনযোগিতা,আন্তরিকতাহীনতা,অজ্ঞতা,অদক্ষতা ও অত্যাধিক বাণিজ্যিক মানসিকতাও বিলম্বের কারণ হতে পারে। তবে তা দেখার জন্য বা তত্ত্বাবধান করার জন্য আইনত দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কি করেছেন তা জানা যায় নাই। এই দেশে গত চার বছর ধরে সব সময় সরকার ছিল ও কর্মকর্তারাও ছিলেন।

পরস্পরকে দোষারোপ করে পত্রিকায় কলাম লেখে,সাক্ষ্যৎকারের মাধ্যমে বৌদ্ধনেতারা দাবী করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা যাবে না। তোফায়েল আহমদের লেখা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনার পরের বছর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি হামলায় ২০৫জনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। এরপর মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে চট্টগ্রামের দায়রা জজ আবদুল কুদ্দুস মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ২৯৮জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

উল্লেখ প্রয়োজন উভয় তদন্ত কমিটিই সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহন করেই প্রতিবেদন তৈরী করেছিল। এই দুটি প্রতিবেদনে যেসব হোতার নাম রয়েছে তারা এখনও গ্রেপ্তার হয় নাই বা তাদের অনেকের নাম কোন অভিযোগপত্রেও নাই। এতেই বৌদ্ধসম্প্রদায়ের লোকদের হতাশা ব্যক্ত করার যুক্তিসঙ্গত কারণ সৃষ্টি হয়েছে। বৌদ্ধ নেতারা সাক্ষাৎকারে বা পত্রিকার মাধ্যমে এই দুটি প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযুক্ত আসামীদের বিচার করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করার দাবী করা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে এই ধরনের বিধান আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দুইটি প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম, প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর কলামে উল্লেখিত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে কগনিজেন্স গ্রহন করতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নালিশী দরখাস্ত সংক্ষুব্ধ যে কোন ব্যক্তি নালিশী মামলা বা সি,আর মামলা দায়ের করতে পারেন এবং ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব বাদীর হলফী জবানবন্দি গ্রহন করে সকল আসামীদের প্রতি সমন ইস্যু করতে পারেন।

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় যেমন তমাদি আইন প্রযোজ্য হয় নাই এই মামলায়ও সময় বাধা হবে না বলে মনে হয়। ইতিমধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে দায়েরকৃত মামলা ও নালিশী দরখাস্তের ভিত্তিতে দায়েরকৃত মামলা একই সাথে বিচার করার বিধানও ফৌজদারী কার্যবিধির ২০৫ডি ধারায় ও অন্যান্য উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে আছে।

কেউ দাবী করার আগে মাত্র এক বছর সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ বিহারগুলো ও বৌদ্ধপল্লীর বসতঘরগুলো পুননির্মাণ করে নজিরবিহীন নজির স্থাপন করেছে। কিন্ত ঘটনার ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিরা, প্রত্যক্ষদর্শীরা আদালতে এসে সাক্ষ্য না দিলে দোষীদের শাস্তি দেওয়া বা ন্যায় বিচার করা সম্ভব নয় । রাষ্ট্র বলতে আমরা সবাইকে বুঝি। রাষ্ট্রের প্রতি সবার দায়িত্বও আছে। প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমরা বিচার না চাইলে, আদালতে নালিশ দায়ের না করলে, সাক্ষ্য না দিলে রাষ্ট্র কিভাবে সংক্ষুব্ধদের ন্যায় বিচার দেবেন?

জনগণের টেক্সের টাকা থেকে বেতনভাতা গ্রহনকারী রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীরা কি সত্যিই দায়িত্বশীল,আন্তরিক,দক্ষ,দুর্নীতিমুক্ত ও সৎ ?

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

**********************************************************************************************************

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।