পাহাড়সম জনপ্রিয়তা বীর বাহাদুরের

হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী :
সকাল ৯টায় নাইক্ষ্যংছড়িতে এক অনুষ্ঠানে যোগদান করার কথা রয়েছে প্রধান অতিথির। এর আগেরদিন থানার ওসি সেই অতিথিকে মুঠোফোনে জানালেন “স্যার আপনাকে আমি রিসিভ করব”। জবাবে অতিথি জানালেন দরকার নেই, আপনি এতো সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না। তা আবার বাস্তবে প্রমানিতও হয়েছে। রিসিভ করাতো দূরের কথা উল্টো ঠিক সময়ে এসে অথিতি গাড়ির হরণ বাজিয়ে থানার ওসিকে ঘুম থেকে জাগালেন।

প্রিয় পাঠক বলছিলাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপির কথা। শত ব্যস্থতা এবং বৈরী আবহাওয়াতেও সময় মত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রায় সময় সবাকে চমক দেখান দায়িত্ববান এই নেতা। শুধু তাই নয় তিনি হচ্ছেন একজন আধুনিক মনের মানুষ। সবার হৃদয়ে জনবন্ধুর স্থান পেয়েছেন। নিজের কাজে ও দক্ষতায় প্রমাণ রেখে বীর বাহাদুর উশৈসিং পাহাড়সম জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। সমস্যা শুনলেই পাগলের মত ছুটে যান সমাধানের জন্য। কেবলমাত্র বান্দরবান জেলা নয় তিন পার্বত্য জেলার গন্ডি পেরিয়ে এখন তিনি পুরো চট্টগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

পায়ে চলার ফুটপাত থেকে শুরু করে নতুন নতুন রাস্তা, আধুনিক সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আধুনিক সেতু ও ব্রীজ নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, গির্জা, মন্দির নির্মাণ, ফায়াস সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় বিদ্যুতায়ন, সকলের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলাসহ এক কথায় সব কিছুতেই তাঁর সৃজনশীল চিন্তা ও কর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

সূত্র মতে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হাত ধরে রাজনীতিতে আসা অত্যন্ত সাধারণ ঘরের ছেলে বীর বাহাদুর উশৈসিং ১৯৮৯ সালে স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯১ সালে ৩০০ নম্বর সংসদীয় আসন বান্দরবান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি ১৯৯১ সাল থেকে অদ্যাবধি পাঁচ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার আস্তা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়ের ত্যাগী এই নেতাকে দায়িত্বদেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর। পাশাপাশি এবার সহ তিনবার বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।

আওয়ামীলীগ সূত্র জানায়, ২০০১ পরবর্তী দেশের নাজুক অবস্থায় বীর বাহাদুর দলকে সু-সংগঠিত করেন। তিনবার দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে ১১ বছর ধরে তিনি চট্টগ্রামের ১৩টি সাংগঠনিক জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় চষে বেড়ান। দলের কঠিন সময়ে তিনি নির্যাতিত নেতাকর্মীদের সু-সংগঠিত করেন। চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলায় বছরের পর বছর সম্মেলন না হলেও বীর বাহাদুরের সাংগঠনিক দক্ষতায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যার ফলে দল হয় চাঙ্গা। তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলায় তার সাংগঠনিক তৎপরতার কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পাশাপাশি সিটি করর্পোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে একের পর এক সফলতা আসে, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। তাই দূর্দিনে পাশে পাওয়া বীর বাহাদুরকে আগামী ২২/২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে মূল্যায়ন করে দলের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদকের পদে আদিষ্ট করা হচ্ছে বলে আভাস রাজনৈতিক মহলে।

এ ব্যাপারে বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইসলাম বেবী বলেন-নেত্রীর কাছে আমাদের কিছু চাইতে হয়না, তিনি নিজ থেকে আমাদের দেন, আশাকরি তিনি আমাদের জন প্রত্যাশা পূরণ করবেন।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন-আহবায়ক তছলিম ইকবাল চৌধুরী বলেন- জনবন্ধু বীর বাহাদুর উশৈসিং সকলের হৃদয়ের মনিকোঠায় পৌঁছে গেছেন। উনার সুদক্ষ নেতৃত্বে আজ তৃণমূল পর্যায়েও আওয়ামীলীগের কদর বহুগুণে বেড়েছে। পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রাম বিভাগীয়বাসীর দাবি অনুসারে ত্যাগী এই নেতাকে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে নেত্রী যথাযথ মূল্যায়ন করবে এমন প্রত্যাশা করছি।

সূত্র মতে- বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সন্মেলনকে সামনে রেখে “উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার” এই শ্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে। খুব বেশি হেরফের হচ্ছে না আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেন, ‘কমিটির আকার বাড়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে কিছু নতুন মুখ আসতে পারে।

দলটির নীতি-নির্ধারকরা জানান, ‘বর্তমান কমিটিতে কয়েকটি শূন্য পদ সৃষ্টি হয়েছে। এ পদে কাউকে টানা হতে পারে, আবার কিছু নতুন পদ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে কিছু নতুন মুখ আসতে পারে। এছাড়া বর্তমানে কমিটিতে রয়েছেন, এমন নেতাদের বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। হয়ত কেউ প্রমোশন পাবেন আবার কারও ডিমোশন হবে।’ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, ‘সম্মেলনের ভেতর দিয়ে নতুন কমিটি হবে ঠিকই, কিন্তু পুরনো নেতারাই বেশির ভাগ থাকবেন।

জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর উশৈসিং মুঠোফোনে বলেন, “মাননীয় সভানেত্রী যখন যে দায়িত্ব প্রদান করবেন, আমি সেই দায়িত্ব পালন করে যাবো”।

তবে স্থানীয়রা মনে করেন, বান্দরবান ৩০০ নং আসন থেকে টানা ৫বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য বীর বাহাদুর শুধু দলের মধ্যে নয়, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বেশ পরিচিত। তাই দলের সংগঠনিক পরিধি বাড়ানোর কাজে বীর বাহাদুরকে যথাযথ স্থানে দায়িত্ব প্রদান করে দলকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিবেন নেত্রী।

এক নজরে বীর বাহাদুরের বর্ণাঢ্য জীবন :
বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি। পিতা লাল মোহন বাহাদুর, মাতা মা চ য়ই। তিনি ১৯৬০ সালের ১০ জানুয়ারি বান্দরবান জেলা সদরের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাইমারি শিক্ষা গ্রহণ শেষে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। বান্দরবান সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর শুরু হয় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন। তিনি প্রথমে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ভর্তি হন এবং পরে বান্দরবান সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন । ১৯৮৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.এ. পাশ করেন।

বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি ২০০২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সংসদীয় দলের হুইপ নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময়ে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগে সংগঠনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করেন।

তিনি ১৯৭৯ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির পূর্বে এ সংক্রান্ত সংলাপ কমিটির অন্যতম সদস্য এবং তৎকালীন সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে, ১৯৯৮ সালে উপমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রথম বারের মত এবং ২০০৮ সালে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দ্বিতীয় বারের মত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙ্গামাটি-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি তথা ভৌত অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনায় সুযোগ পান।
এছাড়া বীর বাহাদুর নবম জাতীয় সংসদের সংসদ কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ঐ সংসদের একজন প্যানেল স্পীকার ছিলেন যার ফলে ২০১৩ সালের ২২ জুলাই তিনি খন্ডকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ছাত্র জীবন থেকেই খেলাধূলা ও সংস্কৃতি চর্চায় গভীর মনোযোগী ছিলেন। তার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ ফুটবল রেফারী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দক্ষতার সাথে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল কোয়ালিফাই রাউন্ডে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়া গমন করেন এবং বাংলাদেশ ফুটবল দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া অষ্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিক ২০০০-এ বাংলাদেশ দলের চীফ অব দ্য মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি স্বরূপ ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বীর বাহাদুর ঊশৈসিং ফ্রান্স গমন করেন।

বাংলাদেশ বিমানের লন্ডন-নিউইয়র্ক ফ্লাইট উদ্বোধনের জন্য এবং জাতিসংঘের সাধারণ সভায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আমেরিকা এবং ২০০৬ সালে চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন গমন করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মায়ানমার ও কম্বোডিয়া সফর করেন।

বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয়ভাবে পুরস্কার প্রাপ্ত একজন ব্যক্তিত্ব। একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবেও তার খ্যাতি সমধিক। তিনি ২০১০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে মনোনীত হন এবং বর্তমানে এ পদে আসীন আছেন।

বীর বাহাদুর উশৈসিং ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম, ২০০৮ সালে নবম এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে ০৫ জানুয়ারী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান সংসদীয় আসন (৩০০ নং আসন) থেকে টানা পঞ্চম বারের মত জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অধিকার বীর বাহাদুর উশৈসিং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বীর বাহাদুর উশৈসিং ১৯৯১ সালে মে হ্লা প্র’র সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের গর্বিত জনক। তার বড় ছেলে উসিং হাই (রবিন) বার-এট-ল এ অধ্যায়নরত ও ছোট ছেলে থোয়াইং শৈ ওয়াং (রোমিও) এ লেভেলের ছাত্র এবং একমাত্র কন্যা ম্যা ম্যা খিং (ভ্যানাস) ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের ৭ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।