মুহম্মদ নূরুল হুদা: কবিতাপ্রাণ মানুষ

তাহমিনা কেরাইশী:
এমনি একজন কবিতাপ্রাণ মানুষ যাকে নিয়ে লেখার উপাত্ত কম নেই। যার লেখনীর ভাঁজে ভাঁজে ছন্দের মুক্তদানার বিচ্ছুরণ স্বপ্নময়তা আনে। তিনি আমাদের কাছে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তাঁর জাদুর বাঁশিতে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো থাকি। তাঁর সারগর্ভ বক্তৃতা ভাষণ বা কবিতা শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনি। তিনি যেমন বিশিষ্ট কবি তেমনি একজন শিক্ষক, সংগঠক, নজরুল গবেষক তিনিই একজন কবি তিনিই কবিতা। তিনি আমাদের হিতাকাঙ্ক্ষাী বন্ধুও বটে। নতুবা কেন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবেন! এত ব্যস্ত একজন মানুষ তাঁর নিজের সময় থেকে ভাগ করে আমাদের সময় দেন; আমাদের তাঁর আলোয় আলোকিত করতে। শিক্ষক মানুষ তো আমরা তাঁকে যেমন শ্রদ্ধা করি পছন্দ করি। ভয়ও পাই কিন্তু ভীষণ। এই তো কিছুদিন আগে আবার নতুন করে চালু করলেন ছন্দের ক্লাস। দুটি দিন পুরোপুরিভাবে তার স্টুডেন্ট হয়ে গেছিলাম। শেষ দিন সার্টিফিকেটও বিতরণ হলো। রাইটার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। তিনি সত্যিকার অর্থেই চান সবাই যেন বুঝে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। নিজেকে সঁপেছেন কবিতার করকমলে। যদিও কেউ কাউকে কবি বানাতে পারেন না বা কবিতা লেখা শিখাতে পারেন না। যিনি গুরু তিনি তাঁর কাব্যশৈলী ভাষা পরিভাষা ভালো-মন্দ ঠিক-বেঠিক দীক্ষায় আলোকিত করতে পারেন। কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা ভাই আমাদের এমনই একজন শিক্ষাগুরু। বড় বড় লেখকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাইনি কিন্তু হুদা ভাই প্রবলভাবে আমাদের ভালো চান বড় ভাইয়ের মতো সহমর্মী, সহযাত্রী। তিনি এবং কবি আসাদ চৌধুরী ভাইয়ের মধ্যে এই বিষয়টি গাঢ়ভাবেই আছে।
মুহম্মদ নূরুল হুদা ভাইয়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম হলদিয়া কবিতা উৎসবে। দুই দিনের সে বিশাল আয়োজন। সারা বিশ্বের কবিরা ছিলেন। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিশিষ্ট কবি প্রায় সবাই ছিলেন। পরের দিন কলকাতায় বাংলা আকাদেমিতে আয়োজন কবিতা পড়ার। মঞ্চের আয়োজনে ছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় কবি শ্যামল কান্তি দাশ দাদা। পড়া হলো কবিতা, পরিয়ে দিলেন গলায় উত্তরীয়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, পবিত্র সরকার বাংলাদেশ-ভারতের বিশিষ্ট কবিরা তার মধ্যে আমার মতো একজনও ছিল।

নূরুল হুদা ভাইয়ের সাথে অনেক অনুষ্ঠানে গেছি টাঙ্গাইলে কবি মাহমুদ কামাল ভাইয়ের অনুষ্ঠান এবং ময়মনসিংহে কবি ফরিদ আহমেদ দুলাল ভাইয়ের অনুষ্ঠানে, ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। মনে আছে সেই দরিয়ানগরের অনুষ্ঠানের কথা। দেশি-বিদেশি কবি প্রায় ২০০ জনের মতো ছিলাম ২০১০ সনের কথা। তিন দিন ‘কবিতা বাংলার’ কবিতা উৎসব ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন এত বড় আয়োজন এত মানুষ নিয়ে চলা তাতে নূরুল হুদা ভাই সার্থক। দরিয়ানগরের মানুষ দরিয়ার মতোই বিশাল মনের অধিকারী।
সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার মমতাজের জন্য তাজমহল তৈরি করে গেছেন। তাদের প্রেম যুগ যুগ মানুষের মনের শেঁউতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করবে। আর অনেকে বলে সম্রাট শাহজাহান তাঁর নিজেকে প্রতিষ্ঠা নিজেকে স্থায়িত্ব দেবার প্রচেষ্টা। সে যাই হোক পৃথিবীর সপ্ত-আশ্চর্যের এক অপূর্ব নিদর্শন তিনি রেখে গেছেন। যেদিক দিয়েই বিচার করি সেদিকেই ভালোবাসার পাল্লাই ভারী হয়। প্রেমের জয় ভালোবাসার জয়।

তেমনি আমাদের দরিয়ানগরের কবি তথা সারা বিশ্বের কবি আমাদের মুহম্মদ নূরুল হুদা ভাই কবি এবং কবিতাকে আপন জেনে নিষ্ঠার সাথে তৈরি করে চলেছেন দরিয়ার শাম্পান। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলতে পারবেন এই দরিয়া দিয়েই। সেই বিশাল শাম্পানে আমরাও সহযাত্রী। কবিতার সাগরে ভাসবো শম্পানে শাম্পানে।
২০১০ সনে দরিয়ানগরের ঝাউবন ছায়ায় আমাদের কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ভাই যে বর্ণমালা উচ্চারণ করেছিলেন সেই কথাগুলো আমার আবার বলতে ইচ্ছে করছে- ‘এই দরিয়ানগরের ঝাউছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হবে পৃথিবীর ব্যতিক্রমী কবিতা বিশ্ববিদ্যালয়। …দরিয়ানগর কেবল পর্যটন নগরী নয়, এই দরিয়ানগর অচিরেই উন্নীত হবে বিশ্ব কবিতীর্থ। সেই কবিতীর্থে বিশ্বমানবের বিকল্পহীন প্রার্থনা শান্তি।
‘শান্তি চাই, শান্তি’।…
আরো বলেছেন-
‘মানুষ, তুমি চিরকাল ধ্যানসুন্দর
কল্যাণসুন্দর, শান্তিসুন্দর
জগৎজনতার শান্তিতীর্থে বঙ্গোপসাগরের
এই শান্তিসৈকত। এই দরিয়ানগর।’

কত যে ভালোবাসা দেশ মাটি মা ও জগৎ সংসার। কবি কবিতা তাঁর কাব্যঘর। এমনই একজন মানুষ যার মানসলোকে ভাবনা স্বদেশ সম্পর্কে। তাই তিনি বলেছেন তার কবিতায়-
‘যতদূর বাংলাভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ
দরিয়ানগরে জন্ম, পৃথিবীর সর্বপ্রান্ত আমার স্বদেশ’