মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ-এর কবিতাগুচ্ছ

যমজআঁধার

তোমার কোমল হাত ছুঁয়ে গেছে ভোরের বাতাস, দুপুরের রোদ―সন্তর্পণে একা, তোমার অলকদাম ছড়িয়েছে বৈধব্য বিষাদ গান, বেহালা বিজনসুর;
বিপন্নবৈষ্ণব এক গেরুয়া আঁচল তার খুঁজে ফিরে মৃত্তিকার মুখ―সায়াহ্নে নদীর তীর দূর অরণ্যের বাঁয়ে দুই চোখ তার।

কী মধুর সুরে যাদুর ছোঁয়ায় এঁকে গেছো তুমি দিন ও রাতের মুখ, কেউ কি দেখেছে এই রুপোর চাঁদোয়া―বনপোড়া হরিণীর আদিমঅভিসার!

আমিও মানুষ―ইচ্ছের ফানুসে উড়ে আর পুড়ে আঁধারের সবটুকু গিলে গিলে খাই; রেখে যাই জোছনার শিস আর সুর―ভুলে যাই যতো পথ―পিদিমপ্রহর।

রাতের বেদনা ভুলে নীরবে দাঁড়িয়ে ভাবো রোদপোড়া কাকতাড়–য়া একা; ঈষাণে মেঘের নদী, তোমার ডানায় জমে ঘোর আষাঢ়ের যমজআঁধার।

আমি কেন রাত ভালোবাসি
রাত তুমি দীর্ঘ হও―যতো পারো, দীর্ঘ হও
তোমার মায়ার মাঝে এই আমি বাঁচি
পাতারা বোঝে না প্রেম―অঙ্গারে আগুন নাচে,
আলো কাছাকাছি।
তোমার আঁধার আমি চুমুকে চুমুকে গিলি,
বেদনারা প্রিয়তর মিঠেল পানের খিলি;
বিরহ সফেদ চুন তোমার অধরে
কবির গজল তুমি এই পারাপারে।

রাত তুমি কাছে এসো,
কোল পেতে বসো―
তোমার শরীর জুড়ে মোয়ার মিছিল তারা নাভিমূল,
পূর্ণিমা আকাশচাঁদ চিরায়ত ফাঁদ; ফোটা যোনিফুল।
তুমি এক কুচকুচে জিপসি বালিকা―
প্রেমিক কবির দেবী, অলেখা কবিতা;
রাত তুমি দীর্ঘ হও, দীর্ঘ হও
আকাশ লিখুক আজ জোছনাসংহিতা।

রাত তুমি দীর্ঘ হও―যতো পারো, দীর্ঘ হও
তোমার কাজল নীল ছায়া হয়ে আছি,
মায়ার সুতোয় বেঁধে ঘন ঘন চুমো খাই―
স্বপ্ন নিয়ে বাঁচি।

*************************************************************************************************

কবর ও কাসিদা
জুমার খুতবা পাঠে বার বার কবরের কথা বলেন খতিবি হুজুর―কবরখানা দোজখআগুন―আঁধারের সুদীর্ঘ বয়ান;

যখন বাবার কবরের কাছে যাই―মনে হয় তিনি শুয়ে আছেন; তাঁহার শাদা দাড়ি শাদা টুপি উড়ছে বাতাসে রোদপোড়া বৃক্ষের ছায়ায়;
যখন মায়ের কাছে যাই―আমার মায়ের মুখ আনত বিশ্বাসে; কী নিবিড় নির্ভরতা! সেজদায় সমর্পিত পরম মুগ্ধতা।

মা বলেন―বাবা সব শুনছেন―হয়তো স্বপ্নের ঘোরে আমাদের দেখভাল করেন প্রত্যহ; আমার মা―আমাদের সকাল বিকেল রাতের আশ্রয়; তাঁর মোনাজাত দীর্ঘতর হয় কিশোরীর এলোচুলের মতন প্রতি রাত।

কাসিদা বাবার মতো দূরগামী, মায়ের মতো মৃদুভাষী―কবিতা তো আত্মার সরোদ;

থোকা থোকা সবুজহলুদ ঘাস ছাড়া কবরে আর কিছু নেই; কিছুই থাকে না; কবর কখনও কারও আকুতি শোনে না।
কাসিদা প্রত্যহ শোনে আত্মার সেতার―মেঘের বিলাপ;
কবি, পৃথিবীর সমানপ্রবীণ―কখনও তো কবরের পরোয়া করে না।

*************************************************************************************************

মেঘবোন

মধ্যাহ্নের মেঘবোন আকাশকে ছুঁয়ে দিলে সবুজ গ্রামের সারি
নীলাভ নদীর ঢেউ সামিয়ানা কাঁপে;
সমুদ্রসারস উড়ে নিজেকে হারায়―গাঙকবুতর ভুলে ভাসমান বয়া;

জল নয়, ছায়া নয়―বিবাগী বাউল তুমি শুধু ভেসে চলা;
যদিও মুহুরি নদী তোমার মতন ছোটে মোহনা মায়ায় বিদিত সাকিন তার;
মৈনাক আকুল হয়ে বাড়ায় দুহাত তোমার প্রণয় যাচে ঘন বরষার ভোরে।

এই সব জেনে শুনে নীলিমা ছেড়েছে ঘর―নিতম্বে পলাশ ফোটে;

আঁধার মাড়িয়ে এই রয়েছি দাঁড়িয়ে―ইটভাটার চিমনি;
ধোঁয়ার শরীর আর আগুনকু-লি ভুলে মঙ্গলমায়ায়, নীল মেঘফুলে।

*************************************************************************************************

শকুন
দুপুরের রোদ কাঁপে কাকের ডানায় আনবিক আঁধারের ভুল সহোদর,
সারাটি জনম ভর আগুনবারুদ গোলা; প্রতিটি জরায়ু ভ্রূণে মিসাইলবোমা ―যুদ্ধের উত্তরাধিকার।
পৃথিবীর চোখেমুখে বিবমিষা ঘুম; গোলাভরা ট্যাংক অজগরের মতো ছোটে,
স্কুলে মসজিদে খুনের আগুন, বাদামি আন্ধারে আজ কাঁদছে আকাশ;
চারদিকে কাক আর ক্ষুধার্ত শকুন বিপন্ন পৃথিবী জুড়ে ভাগাড় বিশাল।

কমলা রঙের রোদ তবুুুও হৃদয়ে জাগে শহরের পোড়া মুখ গোঙায় শিশুর আর্তস্বরে, হাজার মায়ের খুনে প্লাবনপ্রবাহ নামে।

সময়ের ঘরে ঘরে নেমেছে শকুন;
সমুখে নেপথ্যে তারা ডানা মেলে নাচে
নামছে মিছিল ফের মৃত্যু-মড়কের।

*************************************************************************************************

জল ও কাজল

ইলিশ চন্দন বাবুই দূর অভিবাসী―মরুর মায়ায় ছোটে মেঘনাওনদী
শাদাকালো পাখি দলিত দোয়েল তাকায় পেছনে ফিরে,
আমার গানের পাখি ভোলে ডাকাডাকি―
গোধূলির ঘরে বাজে মহুয়ার পালা;
শিস তার আজ বিষ-ফিসফিস বুকের বিবরে বাজে অচিন আয়াত,
বিরান বারান্দা জুড়ে ক্ষরণের ঘুণ―
গুলতির চোট এক গলায় গেঁথেছে দুপুরের গানে ভাঙে রোদের রেহেল।

ঘরোয়া গানের পাখি―পেয়ারার পেট বেয়ে নেমে এলে হলুদ বিকেল স্মৃতির ছিলিম ভরে ধূসর পানসি এক সমুখে দাঁড়ায়; আঁধারের যোনি ছিঁড়ে নদী তিরতির; ―জল ও কাজল পোড়ে ভাটির ডাঙায়।

*************************************************************************************************

অবনি

দুপায়ে রাঙিয়ে ধুলো বাজাই আঁধার―
দুহাতে মেখেছি মেঘ ভেঙেচুরে রোদের আরশ;
মৃত্তিকা মুখের মায়া যতো না এগিয়ে যাই―সুর ছবি গন্ধ নাচে হাজার কিসিম,
আমাকে না হয় তুমি বলো এই বার―গোলোক বিদীর্ণ করে কোন দিকে যাবো?

নদীরা নয়নে ভাসে জলের আঁচলে ডোবে মোহনার মুখ,
রাতের নূপুরে জমে কাফনকুয়াশা বেহালার ভোরে ভাঙে অরণির বুক;
মাছ ও মাছির মতো জল ও জালের ঘরে আদিম অশনিরাত
কাম ও ঘামের ভেলা বিজন প্রদোষে জ¦লে পোড়ে মোনাজাত।

অবনি নাচিয়া যায়―
চলিষ্ণু মাটির ঢেলা,
ভালোবাসা বুকে
সমুজ্জ¦ল ভুলে;
দুচোখ যমজ খেয়া―বিপন্ন ছায়ায় দোলে মহুয়া মুহুরি মেঘ নীল উপকূলে।

*************************************************************************************************

চশমা

চশমাটি খুঁজি―যাতে পড়া যায় জোছনা ও চাঁদ, জননীর মুখ, তোমার কাজল টিপ।
কতো দিন মা-কেও দেখিনি―দুই চোখ মরে গেছে এই অদেখায় ঘাসফুল মরে যায় দেয়াল চাপায় আঁধারের ঘায়; সকালে বেরিয়ে যাই―দুপুর বিকেল যায়। দুই চোখে সব ভাসে―গাড়ি, বাড়ি, লাল শাড়ি, রোদের চশমা, ভিখিরির মুখ।
পথ চাই―পাথেয় কোথায়!
ডাহুক কোথায়, বাউল কোথায়, কোথায় আমার মায়া―দুপুরের ডুগডুগি?
রোজ রোজ চশমা বদল করি, হাওয়াও বদলাই, দাওয়াই বদলাই―তোমাকে দেখি না। দুই চোখ মরে গেছে এই অদেখায়। ঘরনি ও ঘর ভুলে বার বার গোলাপের কাছে যাই।
কোলাহল নয়―কবিতাকে খুঁজি।
মুখরমুখোশ নয়―জিয়লজোনাক খুঁজি―তোমাকেই খুঁজি। টিয়ে আর পেয়ারা রঙের চশমাটি খুঁজি।

*************************************************************************************************

ছায়াচক্রে

পরাভূত ছায়াচক্রে ঘুরপাক খায়
বুবুর কানের দুল
শতায়ু কাছিম
সবুজ কমলালেবু;
প্রলম্বিত ক্রূর ছায়া পোড়ায় সুরের নদী, সহজিয়া নারী, আলোর ভোমর।
এইখানে জল আছে জোছনার যাদু আছে বারো মাস শিস দেয় ভোরের দোয়েল, মুক্তিকামী ধানপাতা ডানা মেলে ওড়ে, রোদের আরশি দেখে জলের উনুন।

মাটি আর মুরুলির চারপাশে তবু আনাগোনা করে ঈশ্বরের শব―ঘন ঘোরছায়া;
আদিম ছায়ারা ফের হাজার কিসিম―
চাপাতির ছায়াতলে টুকরো টুকরো ভোর, চায়না কুড়োল ছায়া সবুজ টিয়ের ডানা,
কাটা রাইফেল ছায়া ঠিক গোরের আঁধার।

এই সব ছায়াচক্রে শীত ঘুমে কাঁপে রোদের বাতাশা চাঁদ―পেয়ারা, বাতাবি লেবু, শীতার্ত মালেক মাঝি।
অযুত রাতের পরে প্রভাতের ঘায়ে একদিন খুলে যায় আগুনগিরির মুখ―
আলোকডানায় ডিগবাজি খেলে মাটির ময়না পাখি।

*************************************************************************************************

ফেরারি

আপনারা কেউ কবিতাকে দেখেছেন? নীল শাড়ি, খোলাচুল, লাল টিপ, সমস্ত শরীরে তার কাঠগোলাপের ঘ্রাণ―সাত সাগরের নুন চোখেমুখে মেখে আজ সে ফেরারি।
কেউ কি আবার বেআব্রু করেছে তাকে―খোলা চুলে ছুঁড়ে দিয়ে থুতুর নরক? নীল শাড়ি লাল টিপ দেখে; ঘরোয়া ফুলের গন্ধ শুঁকে কেউ কি টেনেছে খুব কাছে? ওর প্রতীক্ষায় থাকে―নিযুত নক্ষত্র নীল মেঘের মুকুট―অন্ধকার ছায়াপথে কৃষ্ণপক্ষরাতে।

যদিও পোশাক বদলায়, শাড়ির বদলে পরে পাঞ্জাবি কামিজ, কখনো কামিজ খুলে টিশার্ট বা জিন্স; আলবত সে তো আমার দয়িতা―জীবনজমিনজল;

আমাদের সংসারে দুই ছেলেমেয়ে―আনন্দ ও আলো; আনন্দ সর্বদা ডান পাশে থাকে আলো বাম পাশে ।

আমি ওর আপাদমস্তক চিনি―ত্বকের তারকা কফিকালো তিল পাকা পুতিজাম―
কোথায় কখন জেগে ওঠে ওরা সবটুকু জানি; শত সঙ্গমের ভ্রূণ জরায়ু জঠরে রেখে আজ সে ফেরারি।

*************************************************************************************************

সরলঅঙ্ক

গুণে বাঁচি,
যোগে নাচি―
ভাগ বুঝি কম আর বিয়োগ বিরহগামী―
সরলঅঙ্কের শূন্যচক্রে বন্দি গৃহস্বামী।

*************************************************************************************************

এই বরষায়

অন্ধকার আলোয়ান খুলে এখানে দাঁড়িয়ে আছে―
আমাদের চেনা শহরে দুপুরে ঘামে;
চিতা হরিণের মতো কয়েক হাজার সূর্য বুকে নিয়ে আমি ঠিক তোমার পেছনে; তোমাদের কেউ আমাকে দেখে না, না আঁধার, না আমার শহর, না তুমি।

এই মায়াপথে বেদনার হিমঘরে বসতি আমার―অরিত্রে রেখেছি হাত
রতিঅরতির ধ্রুব পারাপারে,
―তোমার অবসরের গান আমার সাকিন;

নিজেরে লুকাবে কত! উফ্, এইবার প্রাণ খুলে গান গাও; কবিতার কাছে যাও― অযুত সূর্যের মোলাকাত হবে এই মেঘে এই রোদে অন্ধকারে ঘোর বরষায়।

*************************************************************************************************

সোনামুখ

কারো কারো মুখ হুলিয়ার মতো―পড়তে দেয় না,
লিখতে দেয় না―করতে দেয় না কিছু;
এ কেমন মুখ কোনো কথা নেই―
এ কেমন চোখ দেখেও দেখে না―অকারণে নেয় পিছু।

এই সোনামুখ কেন ভালোবাসি এ কোন মায়াবী চোখ,
ক্রূর নীরবতা পলে পলে আঁকে শত মরণের শোক।

*************************************************************************************************

ক্ষরণের চারাগুলো

এখনও বৃৃষ্টি এলে খুব একা হয়ে যাই―বেদনার হাত ধরে ধানক্ষেতে হাঁটি; মেঘের মৈনাকে ছেয়ে যায় ধানপাতা, সবুজ পাহাড়, কোহালিয়া নদী―ক্ষরণের চারাগুলো স্মৃতির বাদলে বাড়ে, অন্ধকারে সুনিবিড় ধানবন হয়ে হাসে; আলপথ ঘেঁষে তালগাছ হয়ে আকাশকে ছোঁয়।

চোখের পেয়ালা ভরে বৃষ্টি জ¦লে―
করতোয়া ব্যাকুল জানালা খুলে সবুজ মাঠের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নিজেকে হারায়; কামিনীকাননের ছাদে গিয়ে ভিজে যমজ কদম হাতে আকাশকে দেখে ―চুল ভিজে, কপাল ভিজে, ঘাড় ভিজে, ভিজে ভিজে নিজে নিজে একা হয়ে যায়।

আচানক বৃষ্টি এলে স্মরণের পাতা খোলে কাকের পালক ঘুটঘুটে অন্ধকার; মেঘের দুহাত ধরে তুমুল ভিজতে চাই―খোলা আকাশের নিচে―বুকের ভেতর বাজে ঘন বরষার গান।
দূরের গাঁয়ের দুরন্ত রাখালবালক নিজেরে হারায়।

*************************************************************************************************

রূপান্তর

চিতল মাছের মতো টুকরো কাঠের ফালি―তোমার আনন্দ বেদনার সহচর

চন্দন কাঁকুইখানি সযতনে রাখো পশমি ব্যাগের জেবে; ঝকঝকে চকচকে চুলকে নাচায় রোজ চোখের পলকে; রেশমি কেশের নিচে কাছিমের পিঠে খেলে জোছনাদুপুর―জান বেকরার;
সায়াহ্নের শাদা বক চন্দনের খুশবুতে নদী ভুলে যায়!

স্বপ্নের ভেতরে ডুবে সোনার কাঁকুই―গান হয়ে ফোটে, পাখি হয়ে ওড়ে সহসা ছিঁড়বে ওই ব্যাগের বোতাম; উড়ালবেলার রোদে চুল ছেড়ে মগজে পৌঁছুবে ―বরষার বাতায়নে জেগে ভাঁজে ভাঁজে দুনিয়া রাঙাবে।

*************************************************************************************************

সবুজ লাটিম

অন্ধকার করতলে সবুজ পেয়ারা―ঘুরতে ঘুরতে ছুটতে ছুটতে ঝিম ধরে এক পায়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোনে সুতোসুঁইসংসার; মেঘের আঁচল খোঁজে আকাশের ঘুড়ি;

শঙ্খের শরীরে হাসে অসুখীঅক্ষর―সামান্যসাকিন;

ঘুঘুর বিলাপ শুনে বোশেখদুপুর নিজেরে তাকায়―নিয়ত ঘুরতে থাকো; ঘোরের ভেতর সেতার বাজাও, দোতারা বাজাও, চন্দনবোতাম খোলো অকপটে, ফের ঝিম ধরে যাও; অচেনা আঁধার অনন্তের গান; সহসা দুচোখে ঘুম।

হিমায়িত শীত ঘুমে লোবানের গন্ধ অপরাহ্ণের গ্রীবায়;

আঁধারের আচকান খুলে শোনে না সে আর নক্ষত্রের গান; পথের উষ্ণতা সবুজ আকাক্সক্ষা উড়ে গেলে অরণ্যের নিবিড় দরমেয়ানে রোদের শূন্যতা কাঁপে ―আলোর লাটিম ঘুমে―অন্ধকারে―কালো কুয়াশায়।

*************************************************************************************************

ছায়ারা শরীর পাবে যাবে ফুল চাষে

ছায়ারা প্রাণের আয়ু পাশে থাকে, শরীরের চেয়ে বহু ভালো;
ছায়ারা ছায়ার মতো পাশে থাকে অকপটে প্রাণে ঢালে আলো।
ছায়ারা মায়ার মতো ডানা মেলে বেঁচে থাক―কবির মিনতি;
সূর্য যাবে নিভে? বায়ু যাবে থেমে? মানুষের কী এমন ক্ষতি?
ছায়ারা শরীর পেলে পাশে পাশে থেকে যাবে ছায়ার মতন!
অন্ধকারে আলো হবে শীতার্তে রোদের উম যখন তখন।
তাদেরও ডানা হবে নদীতে দিঘিতে তারা কাটবে সাঁতার
শরীর ও প্রাণ পাবে―চিরকাল বন্ধু হবে তোমার আমার।

ছায়ারা কবির মতো মায়াঘাটে বসে থাকে অশরীরী নায়―
অন্ধকার বরষায় ফুল পাখি মেঘ আর অশ্রু হয়ে যায়।
ছোটো-বড়ো কোনো ছায়া শরীরের নয়―বুঝেছি ঘনআঁধারে,
হাতটি বাড়িয়ে ছায়াটি খুঁজেছি কতো আশে পাশে সকাতরে;
অথচ সে মুখ খুলে কথা বলে―‘আমি আছি তোমাদের পাশে’
নতুন বসন্ত এলে ছায়ারা শরীর পাবে যাবে ফুল চাষে।

*************************************************************************************************

মুখগুলো মৃত

ঘোর অন্ধকারে মৃত মানুষগুলো জেগে আছে―
সকালে দুপুরে রাতে মৃত মুখগুলো হেঁটে যায়, কখনো গাড়িতে চড়ে, ওড়ে অ্যারোপ্লেনে; নৌকো আর জাহাজেও চড়ে―যায় অফিস পাড়ায়;
দেবদারু গাছ, উড়ন্ত কাকের সারি মুখগুলো দেখে করুণায় হাসে।

অ্যাকোরিয়ামে রঙিন মাছ সহসা কানকো মেলে বলে ওঠে―আমাদের বেঁধে রেখেছো, তোমরা তো মরে গেছো কতো শতাব্দী আগে; তোমরা তো পঁচে গেছো প্রেম আর দয়া পৃথিবীতে থেকে বিদায় নেবার সাথে সাথে―মুখ ফুটে বলে ওঠে বিমর্ষ বনসাই।

মৃত মুখগুলো হেঁটে যায়―স্বপ্নখ-ের এক ফালি চাঁদ এখনো যে ঝুলে আছে! সবুজ অরণ্য অভিমুখে কয়েকটি কাক উড়ে যায়―সমুদ্রে চিমনি পোড়ে ―চারপাশে মানুষের মুখগুলো মৃত।

*************************************************************************************************

চিমনির মুখ

রাতচরা জোনি পোকা জ¦লে আঁধারের পদতলে, আঙুলে থুতনি চেপে হাত মুঠো করে নাকমুখ চেপে ধরে আনমনা আসমান;
রবি ও রুমির মুখোমুখি বসে নেরুদা ও মারকেজের কথা ভাবি―তারপর রাত ভর মোনাজাত, কাসিদা-কিরাত; শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা। আমি ঘেমে যাই―নেয়ে নেয়ে অবসন্ন হয়ে ওঠি, মাথার ওপর বাড়ে সিলিং ফ্যানের গতি― র্যাঁবোর ওপর মুখ গুঁজে বেখেয়ালে তন্দ্রাঘোরে ঢলে পড়ি।
লায়লার তরজমা আর তাহকিক ভুলে যাই; কোথায় সে? মোরগের লালঝুটি ঠিকই সূর্যের মতো জ¦লে―শবনম নামে; অন্ধ এক ভোর আজানের বেশ আগেভাগে আমাকে আঁধারে তাড়া করেছিল।
কার্তিক এসেছে ওই ধান বনে, মনে মনে দরজায় জানালায় অলিন্দে উঠোনে ―শুকনো পাতারা ওড়ে, নিভে যেতে চায় দ্রুত তিনটা বিশের মেঘ, কোহালিয়া চর।
দক্ষিণে বাড়তে থাকে আঁধারে পাতানো ছায়া; চিমনির মুখগুলো কখনো নেভে না।

*************************************************************************************************

নূপুর

বেদনার মতো বেজে যাই রোজ সকাল দুপুর
রিনিঝিনি রুপোর নূপুর
মন ভরে স্নান ঘরে প্রত্যহ তোমাকে দেখি,
তোমার স্বেদের কণা রাত দিন সারা গায়ে মাখি;
তুমি তা জানো না আর
দেখেও দেখো না―হে অবোধ হিরামন পাখি!

আমাকে বেঁধেছো তুমি
পরম আদরে রাঙা দুটো পায়ে―এই বেশ আছি,
দরজাটা বাঁধো সোনা,
জোছনাজোয়ান রাত―রুমালে বেঁধেছি চোখ
খেলি কানামাছি।

*************************************************************************************************

সাঁকো

যখন জলের কাছে যাই―জলের আঁতশি কাচে-বুদবুদে ঘোরে এক মুখ তবে কি আমিও জল? না কি এই টলটলে হাওরে জলজ সহোদর?
আমার ভেতরে তুমি মাঘের হিমের গায়ে আমরা লুকিয়ে থাকি, ভোরের কুয়াশা ঘিরে মদির উষ্ণতা! দুনিয়ার দীর্ঘতর ঘুম তোমার আমার।
আগুনের কাছে গেলে থাকো তুমি পাশে―লকলকে শিখা তুমি ডাকো আয় আয় ―আলোয় আড়ালে নাচে অতল আঁধার;
ডেকে ডেকে এই তুমি কোন দিকে নেবে
একাকী আমাকে রেখে আবার পালাবে!
যখন ঘুমুতে যাই রাতের কোমল বুক মায়ের আদরে ডাকে―এই বুকে রূপ নাচে ছায়া কাঁপে আড়ালে-অন্তরালে;
প্রত্যহ তোমাকে আমি কতো নামে ডাকি! তোমার ডানায় হাসে এক অরূপ আলোর সাঁকো।