জয়ন্ত জিল্লু’র গুচ্ছ কবিতা

স্বীকারোক্তি

তেপান্ন পৃষ্ঠার গল্পকে সেদিন আমি উপন্যাস বলেছি, কবির কথাকে বলেছি কবিতা। আজ দেহের নদীকে বলেছি চোখ। ছিয়াশি সালের শিশুটিকে এখন জিল্লুই ভাবি। বাল্যবিবাহের শিকার শিরিন আক্তারকে বলি মা। যা কিছু দিয়ে হাঁটি তাকে গতকালও তো পা বলেছি। দেহের কালো রঙের পাহাড়কে বলেছি চুল। নিতান্ত বেঁচে থাকাকেই জীবন বলেছি, বাকিটুকু হয়তো মৃত্যু। যা খেয়ে এসেছি তাকে খাদ্য বলেছি, ছেড়ে দেওয়াটাকে বলেছি ত্যাগ। এভাবে কতোকিছুকে কতো নামে ডেকেছি জীবনভর।

কিন্তু মানুষ, দ্যাখো, তোমাকে আজতক আমি মানুষ বলতে পারিনি।

কিছু একটা তুলে রেখো

আচারের নাম করে তুলে রেখো বেদনা। বৃষ্টির নাম করে তুলে রেখো মেঘ, পোয়াতি আকাশ। আজকের চুলের বেণীতে তুলে রেখো গতকাল। ইস্ত্রি করা লাল শাড়ির নামে তুলে রেখো রক্তক্ষরণ। আয়নায় দাঁড়াবার নামে তুলে রেখো চোখের কালি। গোলাপের নাম করে তুলে রেখো ঠোঁট। প্রার্থনার নাম করে তুলে রেখো কান্না। সেইসব সেখানে হয়তো কোনোদিন সুখ হয়ে যাবে।

তুমি কেবল কিছু একটা তুলে রেখো।

তুমি দৈনিক হলে তোমাকে পড়ে নিত গোটা দুনিয়া

তোমার দেহ জাতীয় দৈনিক হতে পারত। চোখ হতে পারত ঐ দৈনিকের শিরোনাম। না, তুমি দৈনিক হওনি। তোমার দেহ কাব্য হয়েছে, ওষ্ঠ হয়েছে কিতাব পড়ালেখার বই। তোমার চুল হয়েছে তাবিজের মৌল উপাদান, বুকে ইতিহাসের পাঠ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি। তোমার মুখ জোতির্বিদ্যার চূড়ান্ত অধ্যায়,হাতের ইশারা কামুক। না, তুমি দৈনিক হওনি।

তুমি দৈনিক হলে আজ তোমাকে পড়ে নিত গোটা দুনিয়া।

*************************************************************************************************

মানুষ

আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বলেছি—দেখ, নিজেকেই একবার দেখ, দেখ কতোটুকু মানুষ হয়েছিস তুই। তারপর আমি নিজেকেই দেখতে লাগলাম। খুব স্বপ্নের চোখ দেখলাম, ভুল না হয় মতো দেখলাম মুখ, আঙুলের চিরুনি দিয়ে দেখলাম চুল, পরখ করে পা দেখলাম, শার্টের হাতা খুলে হাত, বুকের মাপে হৃদয় দেখলাম, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ঠোঁট; বোতাম খুলে লোম দেখলাম, খুব সতর্কতায় দেখলাম কান। আর এভাবে দেখতে দেখতে নিজেকে বলে ফেললাম মানুষ।
সেই শুরু। সেই থেকে আয়নায় দাঁড়ালেই ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে আসে।

মাটির উপরে জুতা সত্য হয়েছে, হয়নি মানুষ

সব জীবনকে সবসময় বেঁচে থাকতে নেই। আমাদের কেনো থাকবে? আমরা কেনো নিজেদের মানুষ মানুষ বলে চিৎকার করবো? যেখানে সময় মায়ের জরায়ুতে বন্দুকের নল রেখে ট্রিগারে আঙুল ঢুকায় সেখানে কীভাবে জন্ম নিবে মানুষ?

কতো সুন্দর দেখো!
মাটির উপরে জুতা সত্য হয়েছে, হয়নি মানুষ।

*************************************************************************************************

দুধের ছানা থেকে তুলে আনি নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়

দুধের ছানা থেকে তুলে আনি নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়— যাপিত সময়ের বিষ। এখানে মানুষ বিষে মরে না; ধর্ষণেও হয় না কোনো নারী গর্ভবতী। সেদিন স্নিগ্ধা আমাকে দাদা বলে ডেকেছিলো, সুখী বড়ুয়া বানিয়েছিলো প্রেমিক। নিশ্চুপ আমি সিরামিক কাপের ভেতর চাষ করেছি দুঃখের এলাচ। স্নিগ্ধা বাঁচতে পারতো, কিন্তু পারেনি। সুখী, সুখী হতে পারতো; কিন্তু হয়নি। বলেছিলাম, পায়জামার নিউরে বেঁধে রাখো নারী হওয়ার যন্ত্রণা, পুরুষের টিস্যুতে জমা করো রক্তক্ষরণ। স্নিগ্ধা খুব হেসেছিলো। সুখী বলেছিলো, গতরাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। আজকের সকালে বাস্তবে তারা কেউ নেই। লাল কালির উনিশ ফন্টের কর্পোরেট শিরোনাম রয়েছে শুধু।
অথচ, বিশ্বাস করুন, আমি তাদের হ্যাঁ বলবো বলে আজ দাওয়াত দিয়েছিলাম।

*************************************************************************************************

মানুষ শব্দটাই অশ্লীল

মানুষ শব্দটাই অশ্লীল! এই যেমন মানুষ বলতেই কেমন করে ভয় দেখাতে উঠে এলো চোখ। তারপর কিল-ঘুষি দেখালো হাত। মাড়িয়ে দিবে, বলে গেলো পা। মুখ বলে গেলো, অনেক করে গালি দিবে। এই যেমন মানুষ বলতেই পেলাম, মেরে ফেলার হুমকি। মাকে ধরে, দিয়ে গেলো গালি। অবশেষে মানুষ বলতেই দেখলাম, টপলেস কিছু মানবী আমাকে অন্ধ হতে বলে চলে গেলো।
হয়ে যেও দোঁআশ মাটি

গ্রামের ওলান ভরে আছে সম্ভাবনার দুধ, অথচ ফিজিক্সে ফেল করা ছেলেটি আত্মহত্যা করলো। বয়ঃসন্ধি শপথের পাঠ ভুলে মেঘ হয়ে গেলো পারভিন। এখন বৃষ্টির দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর লাইন। সেই গ্রামে ঘুমোনোর দ্বিতীয় রাত্রিতে স্মৃতি এলো কুয়াশা হয়ে বরফ ঠান্ডা ঘুমের মতো। মনে হয় গত দশবছরের হিস্যা চেয়ে কোনো ভুল করেনি উনুনের ছাই, সকালের চুলা। তারপর চোখ খুলতেই পাইজাম ধানের নাড়া মাড়িয়ে চোখের সামনে হেঁটে গেলো পূর্বপুরুষের ট্রেন—প্রভাতী সোলতান এক্সপ্রেস। নাস্তার টেবিলে নিশ্চুপ জিলাপির দেহ, শোকের মাতম উঠছে ভাঁপা পিঠার ঘ্রাণে। গত হয়েছেন আমার জ্যাঠাআব্বু! চেয়ারে নাপা সাঁটিয়ে রন্ধা টেনে মসৃণ হলো কবরের তক্তা। তারপর ঘুম পাড়িয়ে দিলাম ঘুমন্ত মানুষটিকে! ভালো থেকো জ্যাঠাআব্বু যতোটুকু তুমি পারো; না হলে হয়ে যেও দোঁআশ মাটি।

*************************************************************************************************

জবানবন্দি

একদিন হাত খসে গেলো
পা খসে গেলো
মুখ খসে গেলো
খুব স্বপ্নের চোখ খসে গেলো
সবকিছু বাকি রেখে ঠোঁট খসে গেলো
বিগত দিনের দেনা শোধরাবে বলে কান খসে গেলো

অথচ, দ্যাখো, তুমি আছো বলে এখনো বুক খসে যায়নি।

*************************************************************************************************

বিপদ

মুখকে মুখ বলতে নেই, চোখকে চোখ। হাতকে যে হাত বলবে তাতেও বিপদ আছে। যেমন ঠোঁটকে একবার ঠোঁট বলে দেখো, সে একটি চুমু চাইবে। পা-কে একবার পা বলে দেখো, দ্যাখো সে কোথায় গিয়ে তোমায় রেখে আসে। দুনিয়াতে এখন কাউকেও কিছু বলতে নেই। কুকুরকে কুকুর বলতে নেই, মানুষকে মানুষ। কবিকে যে কবি বলবো তাতেও বিপদ আছে।

আর, তোমাকে তুমি বলে ডাকলেই গুছিয়ে নাও পরের সংসার।

*************************************************************************************************

পৃথিবীর মানচিত্র আছে, মানুষের ক্ষুধা

পৃথিবীর মানচিত্র আছে। পরিচয় দেওয়ার মতো আছে দুই-আড়াইশো পতাকা। খুব সকালে মুখ ধোয়ার মতো আছে জল, সামুদ্রিক সিঁড়ি। গোস্বা করার মতো আছে ঘুমোট ভারি মেঘ। মন খারাপে আছে পেপারব্যাক শূন্যতার নীল। পৃথিবীর মানচিত্র আছে। বইয়ের মতো বাঁধাই হলে আছে প্রচ্ছদে মাটি। স্বপ্ন দেখতে আছে হরেক মৌসুম। সাহস দেখাতে আছে সাহসি বুক—অট্টালিকা। ঘুম পালিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো আছে সবুজ, সবুজের ক্ষেত। সুরের তালিম দিতে আছে নদী, আছে বৃক্ষের কেঁপে কেঁপে ওঠা মুখ। শাসন করতে আছে কঠোর মন, সুনামির মতো সীলমোহর।

পৃথিবীর মানচিত্র আছে, আর মানুষের কেবল ক্ষুধা।

*************************************************************************************************

জয়ন্ত জিল্লু: কবি ও কথা সাহিত্যিক।