বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলা

জয় বড়ুয়া:
ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে খোকাদের শেখ বাড়ি। খোকার প্রথম ছাত্র জীবন শুরু হয় গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া স্কুলে। বাড়ি থেকে স্কুল মাইল খানেক দূরে। নৌকায় চড়ে খোকা স্কুলে যায়। প্রথমে খাল তারপর বাইগার নদী। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় নৌকা গেল ডুবে, বই, খাতা, জামা সব ভিজে গেল আর ঐদিন স্কুলে যাওয়া হল না। বাসায় যখন তাকে নিয়ে আনা হল, মা দেখে অস্থির। ভাগ্যিস স্রোত কমছিল, নাহলে আজ কি হত! মা তখন বলে স্বুল বদলাও। পরে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয় গোপালগঞ্জ সীতানাথ একাডেমিতে। খোকা স্কুলে পড়ার জন্য বাবার সাথে গোপালগঞ্জ থাকে। একদিন বাবা খোকাকে বলে আমরা আজ বাড়ি যাব। খোকা জানতে চাইলে বাবা খোকাকে বলে রেনুর সাথে তোমার বিয়ে হবে। বাসায় এসে বিয়ের আয়োজন করল বাবা। খোকা আর রেনুর বিয়ে হলো।

বিয়ের পর রেনু আর খোকা এক সাথে পুতুল খেলার সময় পুতুলের বিয়ে দিত। একদিন কি একটা কারণে খোকা রেনুকে আলতো করে ধাক্কা দিতেই সে গাল ফুলিয়ে কান্না শুরু করে দিল, সে গাল ফুলিয়ে কান্না করতে করতে বলে দুলা আমারে মেরেছে, দুলা আমারে মেরেছে। মা মা, দেখো’- বলে সে সোজা চলে গেল তার শাশুড়ি সায়রা বেগমের কাছে। ‘কী হয়েছে রে, মা। কান্দিস ক্যান? জানতে চাইলে সে বলে ‘দুলা আমারে মেরেছে।’ মা তখন বলে- ‘খোকার তো সাহস কম নয়। আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলে। তখন খোকা বলে আমি ওকে মারি নাই। মা খোকার পিঠে হাত রেখে সেই হাতেই একটা চড় মারেন। মা তখন রেনুকে বলে এইবার খুশিতো। রেনু জামা সামলাতে সামলাতে বলে ‘হু’। মা হাসেন। দু’টো ক্ষুদ্র হৃদয়ের এই সব সামান্য কা-কীর্তি তাঁর মাতৃ হৃদয়ে এক অপার্থিব মায়ার সঞ্চার করে। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করেন। আল্লাহ এদের বাঁচায়ে রাখুক।

বাবার চাকরি বদলি হওয়ার সাথে সাথে খোকার স্কুলও বদলি হয়। বাবা চাকুরি করতেন আদালতের সেরেস্তাদারের। বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে বড় হয়ে আইনজীবী হবে। খোকার বয়স তথন ১৪ বছর। ভর্তি হয় মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুলে। কিছুদিন যেতে না যেতেই খোকার চোখের সমস্যা দেখা দিল। খোকার চোখের জ্যোতি দিন দিন কমতে লাগল। ডাক্তার চিকিৎসা করে দেখলেন খোকার বেরিবেরি রোগ হয়েছে। ভিটামিন বি এর অভাবে এই রোগ হয়ে থাকে। লেখা পড়া আর হলো না, বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। ডাক্তার বলেছে শরীরের যত্ন নিতে হবে। রেনুর বয়স তখন ৭ বছর। রেনু তখন বোঝেনা দুলা মানে কি। তবে সে একটা কথা বুঝতে পেরেছিল দুলার শরীরটা ভালো না, এখন তার যত্নের প্রয়োজন। সে দুলার কাছে যায়। নিজের জামার খূঁট কামড়ে বলে, ‘দুলা, তোমার কী হয়েছে?’

খোকা রেনুকে বলে আমার তো কিছু হয় নাই।
রেনু বলে, সবাই যে কয় তোমার যে অসুখ হয়েছে।
খোকা রেনুকে বলে আমার লাল চালের ভাত খাওয়ার অসুখ হয়েছে।
তখন রেনুর কি হাসি… হি হি হি।

রেনু খোকাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি আর পড়তে যাবা না?
না, আপাতত বড়িতেই থাকব। হামিদ মাষ্টারের কাছে পড়ব।
হমিদ মাষ্টার ছিলেন আকর্ষণীয় এক ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। স্বদেশি আন্দোলন করতে গিয়ে জেল খেটেছেন। খোকার চোখের সমস্যার কারণে সে বেশি পড়তে পারত না। কাজেই যতটা না পড়ত, তার চেয়ে বেশি শুনত গল্প। হামিদ মাষ্টার তাকে শুনাতেন মাষ্টারদা সূর্য সেনের গল্প, তিতুমীর আর ক্ষুদিরামের গল্প। খোকা জিজ্ঞেস করে, স্যার, জেলে তো যায় চোর-ডাকুরা। আমরা যখন পুতুল খেলি তখন চোর জেলে যায়। স্যার আপনি কখনো জেলে গিয়েছিলেন? ওখানে মানুষের খারাপ লাগে না?

হামিদ মাষ্টার শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেন, শোন, দেশের জন্য যদি কেউ পুলিশের হাতকড়া পরে, বুঝবা দেশমাতা তাঁর গলায় ফুলের মালা পরাবেন। দেশের জন্য জেলে যাওয়া গৌররের ব্যাপার। হামিদ মাষ্টার খোকাকে ডাকতেন পুরো নাম ধরে। এই যে সূর্য সেনের ফাঁসি হয়ে গেল, সূর্যসেন কি চোর ছিলেন? তিনি ছিলেন বিপ্লবী। সূর্যসেনের সেই স্বপ্নের কথা শেখ মুজিবকে শুনালেন। সূর্যসেন বলেছিল আমার সোনালী স্বপ্ন স্বাধীন ভারতবর্ষ। প্রিয় বন্ধুরা, সামনে এগিয়ে চলো। পিছনে ফিরবে না! এই যে দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার আলোকরশ্মি। জয় আমাদের হবেই। খোকার ছানি পড়া চোখ চকচক করে ওঠে, সে মেরুদন্ড সোজা করে নড়েচড়ে বসে। তার চোয়াল শক্ত হয়।

অবশেষে কলকাতা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার চোখের ছানি অপারেশন করেন। খোকা আবার পরিষ্কার ভাবে দেখতে পায়। তবে চশমা জিনিসটা তার জীবনের চিরসঙ্গী হয়ে যায়।

৩ বছর পর খোকা আবার ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলো গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে। ক্লাসে বয়স বেশি হওয়ার কারণে ক্লাসের সবাই তাঁকে ভাইয়া বলেই ডাকে। তাতে তার নেতাগিরি করতে সুবিধাই হয়।

ইতিহাসের এক মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনে জন্ম নেয়া এ নবজাতক বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর জ্ঞান, মেধা, সচেতনতা, দুর্দান্ত সাহস, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং আপোষহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পুরো বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। আমরা তাঁকে বাঙালি জাতির জনক হিসেবে যেমন জানি তেমনি ওনার ছোটবেলাও ছিল এক উজ্বল নক্ষত্র।

তিনি বাঙ্গালির অর্থনৈতিক মুক্তি ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এতই দৃঢ়চিত্ত এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে, পাকিস্তানি ২৩ বছরের শাসনামলে প্রায় ১৩ বছর ৯ মাস কারাভোগ করেছেন কিন্তু বাঙলির অধিকারের প্রশ্নে কখনো আপোষ করেননি। মন্ত্রীত্বের লোভ এবং ফাঁসির রুজ্জু কোনটিই তাঁকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করেও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ গ্রহণ করেননি বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফার সাথে আপোষ করে মৃত্যু ভয়কে জয় করে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন তিনি।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের পূর্বে শেখ মুজিব ১৯৭১ সলের ২৬ মার্চ বাংলাদেশর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর আহ্বানে তাঁর নামেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো এবং যে কারণেই দেশের মানুষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকসু থেকে তাঁকে বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক হিসেবে অভিষিক্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা এই দু’টি শব্দ বাঙালি জাতির কাছে পরস্পর সমার্থক শব্দ। বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা, স্বাধীনতা মানেই বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির আবহমান কালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে জন্ম নেয়া একজন মহা পুরুষ। তিনি তাঁর কৃতকর্ম ও আদর্শের জন্য বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে অধিকার করে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।