সমস্যায় জর্জরিত কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, ব্যাহত সেবা

হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী :
পর্যটন জেলা কক্সবাজার সদরে সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা বিরাজ করছে। তিন বছর ধরে চক্ষু বিভাগে ডাক্তার নেই। অপারেশন থিয়েটারে তালা ঝুলছে। ভেতরে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার অপারেশন যন্ত্র।

৬২ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও আছে মাত্র ৩২ জন। আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেই। সিসিইউ থাকলেও বেড মাত্র ৬টা। রোগীদের ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত বাথরুম নেই। স্যুয়ারেজ লাইনের নোংরা পরিবেশে হাসপাতালে থাকা কষ্টকর। এরপরও দিনে প্রায় ১ হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য যায়। তার মধ্যে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ রোগী ভর্তি করা হয়। জোড়াতালি দিয়ে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

আবার অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ (অজ্ঞানের ডাক্তার) না থাকায় নির্ধারিত অপারেশনের সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। নোংরা ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে পুরো হাসপাতালে দুর্গন্ধ বিরাজ করছে।

সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার সদরে প্রথমে ৫০ বেডের হাসপাতাল চালু করা হয়। এরপর তা বাড়িয়ে ১শ’ বেড করা হয়েছে। ওই ১শ’ বেডের জন্য ৬২ জন ডাক্তারের পদ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে আবার ২৫০ বেডে উন্নীত করা হয়। সেখানে সার্জারি, মেডিসিন, অর্থপেডিক্স, গাইনি, চক্ষুসহ বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। কিন্তু বেড বাড়লেও বাড়েনি ডাক্তার, নার্সসহ অন্য পদের জনবল। এসব সমস্যার মধ্যেও বিভিন্ন বিভাগের ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ রোগী ভর্তি থাকে। আরও কয়েকশ’ রোগী হাসপাতালের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নেয়। অনেক গরিব রোগী ভর্তির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। বেডের অভাবে ফ্লোরে, বারান্দায়, বেডের নিচে ফ্লোরেও রোগী ভর্তি করা হয়।

সূত্র মতে, মুমূর্ষু রোগীদের জরুরী অপারেশন করার জন্য প্রয়োজনীয় ডাক্তার টেকনিশিয়ান নেই। অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ দরকার কমপক্ষে ৭ জন। অথচ আছে ২ জন। নার্সের পদ ৯৭ জনের। আছে ৪০ জন। তার মধ্যে নানা কারণে অনেকেই ছুটিতে থাকে। নার্স সংকট বিরাজ করে সব সময়। কম চিকিৎসক ও জনবল দিয়ে বিভিন্ন বিভাগে পর্যায়ক্রমে ছোটখাটো কিছু অপারেশন করা হয়। অনেক সময় একটি অপারেশন করতে দিন শেষ হয়ে যায়। তখন নির্ধারিত অন্য অপারেশন বাতিল করা হয়। অপারেশনের পর মুমূর্ষু রোগীদের রাখার জন্য আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেই।

চক্ষু বিভাগে বিদেশি সহায়তায় এক কোটি টাকায় অত্যাধুনিক অপারেশন যন্ত্র কেনা হয়েছে। কিন্তু ডাক্তারের অভাবে অপারেশন হচ্ছে না। অপারেশন যন্ত্রে মরিচা পড়ছে। আর কয়েকদিন পর তা ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়বে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নেই। এভাবে বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।

হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা কক্সবাজারে বেড়াতে এসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। তারা বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে বেড়ানো শেষ হলে ঢাকায় গিয়ে ভুলে যান। হাসপাতালে আরও বহু ঘটনা ঘটে। সব লেখা যাবে না লিখলে আপনার অবস্থা সাগর-রুনির মতো হবে। দরকার নেই। এ হাসপাতালের আর উন্নতি হবে না। এভাবে চলবে। এ নিয়ে বহুবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। কোন কাজ হয়নি।

এ সম্পর্কে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপ-পরিচালক) এস.এম. আবু সাঈদকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

তবে হাসপাতালের উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অঞ্জলী রায় বলেন, ২৫০ শর্যার এই হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্স সংকট রয়েছে। ফলে রোগীরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন না।

কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ পু চ নু আমাদের রামু কে বলেন, ডাক্তার ও নার্স-সংকট শুধু কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নয়। সারা দেশের চিত্র একই রকম। সরকার ৯ হাজার ৬০০ নার্সকে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। তখন সমস্যা অনেকটা কমে আসবে। রোগীরা আরও ভালো সেবা পাবেন, নার্সদেরও দুর্ভোগ কমবে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে। এই পর্যটন জেলার একাধিক স্পটে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পর্যটক বেড়াতে আসেন। প্রায় সময় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাদের চিকিৎসা নিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়। অনেকেই সদর হাসপাতালে নোংরা পরিবেশে চিকিৎসা নিতে চায় না। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা পাওয়াও কষ্টকর।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here