লেখক সম্মানী ২৫% কর্তন মেধা বিকাশের প্রতিবন্ধক

মোস্তফা হোসেইন:
একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে আলবদররা জানিয়েছিল, জাতি ধ্বংসের বড় একটি উপাদান বুদ্ধিশূন্য করে দেওয়া। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলায় ক্ষতি পুষিয়ে আনতে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করলেন। তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীদের আন্তরিক সন্মান জানানোর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর পথই তাঁর পথ। অন্যদিকে তিনি নিজে সৃজনশীল একজন লেখকও বটে। শুধু তাই নয়, তাঁর মন্ত্রীসভায় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের খ্যাতিমান একজন লেখক-পণ্ডিত হিসেবে সব মহলে শ্রদ্ধেয়। মন্ত্রী পরিষদে রয়েছেন একাধিক লেখকও। সঙ্গত কারণেই আমরা যারা লেখালেখি করি তাদের প্রত্যাশাটা তাদের কাছে একটু বেশি।

কিন্তু প্রত্যাশায় বজ্রাঘাত হলো সম্প্রতি একটি বইয়ের সম্মানী চেক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে গ্রহণকালে। শিশু একাডেমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিশু-কিশোরদের জানানোর উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ করে আমার। যথাসময় এবং যথোপযুক্ত সম্মানীও নির্ধারণ করে তারা। সঙ্গত কারণেই চেক পাওয়ার আগে খুশিই হয়েছিলাম। একজন বেকার সাংবাদিক হিসেবে ৮২ হাজার টাকা প্রাপ্তি আমার জন্য বিশাল অর্জন বলে মনে করছিলাম। কিন্তু চেক গ্রহণকালে দেখি প্রায় কুড়ি হাজার টাকা কর বাবদ এজিবি থেকেই কেটে রেখে দিয়েছে। মর্মাহত শিশু একাডেমি কর্তৃপক্ষও। কারণ তারা লেখকদের সংস্পর্শে থাকে লেখকদের অবস্থাও বুঝে। ২৫% সম্মানী কেটে রাখাকে সমর্থন করতে না পারলেও তাদের হাত-পা বাঁধা আইনের কাছে। বোধ করি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিশু একাডেমির পরিচালকও বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করবেন।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের একজন পণ্ডিত ও লেখক। সবমহলে তিনি সমাদৃত তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখনীর কারণেও। বিশ্বাস করতে চাই মেধাকে অবমূল্যায়নের এই বিষয়টিকে তিনি মোটেও সহজভাবে নেবেন না। আর তিনি জানেনও বাংলাদেশে লেখকদের আর্থিক সংকটের কথা। তিনি জানেন বাংলাদেশের বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থাগুলো কাগজ, বাধাই, ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎবিল সব দিতে পারলেও লেখকদের সম্মানী দেয় খুবই কমসংখ্যক। পত্রিকাগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি সামান্য সম্মানী দেয়। তাও লেখা প্রকাশের পর বছরকালও পেরিয়ে যায় তাদের। বাংলাদেশের প্রাচীন বড় একটি পত্রিকা অনেক বছর ধরে লেখকদের সম্মানী দেয় না। তার ফলও অবশ্য তারা ভোগ করছে সম্প্রতি। বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ হওয়া তিনটি প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় তাদের পছন্দের দু’চারজন লেখককে সামান্য অর্থ দেয়। কিন্তু তাও অনিয়মিত।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মাধ্যমে যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
গত কুড়ি বছর ধরে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে আমি মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করছি। আমার গ্রন্থ কিংবা পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায় এমন তথ্য বহু আছে যেগুলো ৪০/৪৫ বছরের মধ্যে জাতীয়ভাবে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্যও বটে। এই কুড়ি বছরে শুধু ভ্রমণ ও প্রাসঙ্গিক ব্যয় যদি একসঙ্গে করা হয় তা কোনও অবস্থায় ৩ লাখ টাকার কম হবে না। দীর্ঘসময় এবং অর্থ পুরোটাই ব্যয় করতে হয়েছে ছাপোষা এই কলম শ্রমিককেই। তার মধ্যে ১৯৯৬ সালে দৈনিক জনকণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে প্রায় দেড় মাস প্রকাশিত লেখাগুলোর তথ্যসংগ্রহে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধা সম্পাদক তোয়াব খানের আনুকূল্যে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, ঢাকার বড় একটি প্রকাশনা তখনই লেখাগুলো নিয়ে বই প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করে। এবং ১৯৯৯ সালে বই আকারে প্রকাশও করে। বইটি এক বছরের মধ্যে বিক্রি শেষ হয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে একাধিক প্রকাশক বইটি প্রকাশ করে। কিন্তু একটা টাকা সম্মানী কেউ দেয়নি। গত কুড়ি বছরে আমার ৫৭ টি বই প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বই ১৬টি। এই ১৬ টি বইয়ের একটির জন্য এক প্রকাশক মাত্র ৩ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রাচীন একটি প্রকাশনা সংস্থা আমার ৭/৮টি বই প্রকাশ করেও যখন টাকা দিচ্ছিল না তখন তাকে পাণ্ডুলিপি দেওয়া বন্ধ করে দেই। কয়েক বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের পাণ্ডুলিপি চেয়ে আসছিলেন তিনি। সঙ্গে সম্মানী দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু যখন টাকা চাইলাম, তিনি দুই হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেন। ফেরৎ দিয়ে বললাম, পুরো টাকাটাই একবারে দিয়েন। আরও ১ হাজার টাকা বাড়িয়ে তিনি বললেন, নতুন বইয়ের হিসাব পরে হবে। আগেরগুলোর হিসাব শেষ। অথচ মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাকে সুনামগঞ্জ থেকে চুয়াডাঙ্গা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে কুড়িগ্রাম ঘুরে বেড়াতে হয়। প্রতিটি বইয়ের রসদ সংগ্রহ করতে খরচ হয়ে যায় কমপক্ষে ১৪/১৫ হাজার টাকা।

পত্রিকাগুলোর মধ্যে ১০টিকেও পাওয়া যাবে না যারা লেখকদের সম্মানী দেয়। এটা দীর্ঘদিনেরই কালচার। ৯০ এর দশকে এই প্রথা ভেঙে দৈনিক আজকের কাগজ লেখা প্রকাশের পরের সপ্তাহে লেখক সম্মানী দেওয়ার ব্যবস্থা করে আলোড়ন তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই কাগজটি একদিন ঘোষণা করে আমরা আর পাঠকের টেবিলে যেতে পারছি না আগামী এত তারিখ থেকে। পত্রিকাটি লেখক সম্মানী দেওয়ার মাধ্যমে যেভাবে চমক সৃষ্টি করেছিল তেমনি বন্ধ হওয়ার আগাম ঘোষণায়ও চমকে দিয়েছিল।

হালে অনলাইন পত্রিকা বের হওয়ার হিড়িক পড়েছে। বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্যে প্রকাশিত একটি অনলাইনে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয় লেখার জন্য কোনও টাকা দেওয়া যাবে না। ছোট নিউজ পোর্টালগুলোরতো কথাই নেই। তেমনি পরিস্থিতিতে বাংলা ট্রিবিউন অবাক করে দিয়েছে হঠাৎ করে। কয়েকটি লেখা প্রকাশের পর বাংলা ট্রিবিউন থেকে ফোন করে জানানো হলো আপনার লেখার সম্মানী রেডি আছে, একদিন চা খেয়ে যান।
এমন অবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বই বের হওয়া কিংবা লেখা প্রকাশের প্রতি গরিব লেখকদের একটু আগ্রহ বেশি। আবার শিশু একাডেমির প্রসঙ্গেই আসি। সেখান থেকে বই প্রকাশ হওয়ার বিভিন্ন সুবিধা আছে। তারা বই ছাপে অনেক বেশি। সব জেলায় তাদের অফিস থাকার কারণে এবং বিক্রয় সুবিধা ও দক্ষতার কারণে সেখানকার বইগুলো দ্রুত পাঠকের কাছেও যেতে পারে। বলতে গেলে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের বড় একটি আশ্রয়স্থল এই প্রতিষ্ঠানটি। আমি স্পষ্টত দেখেছি লেখকদের সম্মানীর ওপর আঘাতটি তাদেরও মর্মাহত করেছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে তা প্রকাশ করতে পারছে না। আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়াও আইনানুগ কারণেই তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর এই অক্ষমতার বলি হতে হচ্ছে লেখকদের। এক্ষেত্রে লেখক সম্মানীর করুণ অবস্থা প্রমাণে আবার শিশু একাডেমিকেই উদাহরণ হিসেবে আনতে চাই। মাসিক শিশু পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশ করে তারা প্রশংসা অর্জন করেছে। শিশুসাহিত্যিকরা সেখানে তাই লিখতেও আগ্রহী। কয়েক বছর ধরে সেখানে লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর একজন গদ্য লেখক সর্বাধিক ৮শত টাকা ও ছড়া লেখক সর্বাধিক ৫শত টাকা পেয়ে আসছেন। এই মুহূর্তে এই টাকা থেকে ২৫% কেটে রাখা হবে কর ও ভ্যাট হিসেবে। তার মানে একজন গদ্য লেখক এখন ৮শ টাকার জায়গায় ৬শ টাকা সম্মানী পাবেন। পদ্ধতিগত কারণে সম্মানীর টাকার চেকের জন্য তাদের আগাম জানাতে হয়। চেক আনতে গেলে ঢাকা শহরেই অন্তত দেড় থেকে দুইশত টাকা খরচ হয়ে যায় রিক্সাভাড়া বাবদ। সেই হিসাব করলে একজন গদ্য লেখক সম্মানী পাবেন সাড়ে ৪শত টাকা। আর ছড়া-কবিতা লেখক পাবেন ২৫০ টাকা। এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে মেধার ওপর ২৫% কর ও ভ্যাট আরোপের কারণে।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজে লেখক হওয়ায় তার কাছে সঙ্গত কারণেই ন্যায্য মূল্যায়ন প্রত্যাশিত। তার মতো বিজ্ঞজনকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, মেধাকে অবমূল্যায়ন করলে জাতীয় ক্ষতি কতটা হতে পারে। আর যেসব কলম শ্রমিক লেখাকেই শুধু পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাদের যে মরণদশা সেটাও বোধ করি খুলে বলার দরকার নেই।
ব্যবসায়ীরা মুনাফা থেকে কর দেন, ক্রেতা পণ্যের ওপর ভ্যাট দেন, অনেক সেবা খাতেও ভ্যাট আছে কিন্তু মেধাকে যদি তেল মরিচ নুনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয় তার খেসারত দিতে হবে জাতিকে।
আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের কথা বলি, বর্তমান প্রজন্মকে সৃজনশীল হওয়ার পরামর্শ দেই- জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে, তারা কিভাবে নেব এই মেধাসম্মানী কর্তনের প্রক্রিয়াটিকে? তাও এক চতুর্থাংশ! এই যুগে একজন লেখক ৩০০-৫০০ টাকা সম্মানী পান এটাকে অসম্মানী বলাই যেখানে সঙ্গত সেখানে কয়েক বছর ধরে চলে আসা এই হার না বাড়িয়ে তার থেকে ২৫% কেটে রাখার বিধানকে কি মেধার ওপর আঘাত বলা যায় না?
আমরা লিখি সেই কারণে আমাদের সম্মানীর এক চতুর্থাংশই কর হিসেবে দিতে হবে। কিন্তু সমাজে আরও এমন মেধাশ্রমিক আছেন যাদের কোনও করই দিতে হয় না। আমরা লেখার মাধ্যমে মেধা বিনিয়োগ করি, একজন মাওলানা বাচন মাধ্যমে ওয়াজ করে অর্থ আয় করেন। তিনি কিন্তু এক টাকাও কর দেন না। এটা সঙ্গত কারণেই বৈষম্য বলে মনে করি। তাই বলে এটা বলছি না তাদের ওপরও করের বোঝা বসিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু এই মুহূর্তে লেখক, সম্পাদক, প্রুফ রিডার, শিল্পীর ওপর যে করাঘাত করা হয়েছে তা প্রত্যাহার করে বর্তমান হারে দেওয়া সম্মানীটুকুও বাড়িয়ে দিতে দাবি করাটা যৌক্তিক বলে মনে করি। আশা করি বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা করা হবে।

লেখাটি পাঠকদের স্বার্থে বাংলাট্রিবিউন থেকে নেওয়া হয়েছে।

******************************************************************************************************************

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।