স্বপ্নের পদ্মা সেতু: বরগুনার পর্যটন শিল্প ও রাখাইনদের তৈরি বস্ত্রের প্রসার বাড়বে

অনলাইন ডেস্ক :
স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বরগুনা জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে পর্যটন শিল্প এবং রাখাইন নারী তাঁতীদের উৎপাদিত বস্ত্রের বাজারের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

এতোদিন যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘ সূত্রিতার কারনে পিছিয়ে ছিলো পর্যটনখাত। এখন নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলকে পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করতে চলছে নানা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ।
বরগুনার রাখাইন অধ্যুষিত পর্যটন স্পট তালতলী পাড়া, ছাতন পাড়া, মনুখে পাড়া, আগাঠাকুর পাড়া, নিশানবাড়ীয়া ইউনিয়নের সওদাগর পাড়া, তালুকদার পাড়া ও সোনাকাটা ইউনিয়নের কবিরাজ পাড়া, নামিসে পাড়া, লাউপাড়া ও অংকুজান পাড়াসহ রাখাইন পাড়াগুলোতে ১২ থেকে ১৪টি করে শতাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে। বরগুনার রাখাইন নারী তাঁতীদের উৎপাদিত চাদর, শার্টের পিস, ব্যাগ, শাড়ি, লুঙ্গী, গামছা প্রভৃতি বস্ত্রের কদর দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের সর্বত্রই রয়েছে।

মিয়ানমার থেকে আমদানি করা বিভিন্ন রঙ, বে-রঙয়ের সুতা দিয়ে হস্তচালিত তাঁতে তৈরী রাখাইনদের কারুকাজ খচিত বস্ত্রের চাহিদা সারা বছর না থাকলেও শীত মওসুম ও ঈদে ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। পদ্মা সেতুর কল্যানে মৌসুমী এ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখন থেকে সারা বছরই চালু থাকবে বলে আশা করছেন রাখাইন নারী তাঁতীরা। তালতলী উপজেলার আগাঠাকুর পাড়ার উসিট মং জানান, এক সময়ে তাঁত বস্ত্রের উপরই নির্ভরশীল ছিল রাখাইন পরিবারগুলো। তারা বাণিজ্যিক পরিসরে এ কাজ শুরু করলে দেশব্যাপী তার কদর বাড়ে ঠিকই তবে যথার্থ পদ্ধতিতে বিপনন বা রপ্তানী না করতে পারায় এবং সীমিত সংখ্যক ক্রেতা ও চাহিদার কারনে এ শিল্প বেশীদূর যেতে পারেনি। বর্তমানে উপকূলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনসমাগম বেড়েছে, বেড়েছে বিকিকিনিও। পদ্মা সেতুর আশির্বাদে যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সাথেসাথে তাদের পন্যের পসার ঘটবে বলে রাখাইনরা আলাপ কালে আশা প্রকাশ করেছেন।

বঙ্গোপসাগরের গর্জন, পাশেই বন বনানীর শ্যামলিমা, পৃথিবীখ্যাত মায়াবী চিত্রল হরিণের দুরন্তপনা, নৃ-গোষ্ঠীর বৈচির্ত্যপূর্ণ জীবনচিত্রে ভরপুর রাখাইন পল্লী, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযুদ্ধ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। একই স্থানে প্রকৃতির এমন বাহারি সৌন্দর্যের সমাহার খুব কম জায়গায়ই মেলে। বরগুনার ও নিকটবর্তী ¯পটসমূহ- চর বিজয়, বঙ্গবন্ধু দ্বীপ, আশারচর, সোনাকাটা, টেংরাগিরি ইকোপার্ক, শুভসন্ধ্যা সৈকত, সুরণঞ্জনা ইকোপার্ক, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, লালদিয়ারচর, লাঠিমারা, হরিণঘাটা সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পদ্মার চর, সোনাতলা, মোহনা, টুলুর চর, ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহী মসজিদ, বিএফডিসি, গাজীকালু ও চ¤পাবতীর মাজার, জাহাজভাঙ্গা শিল্পাঞ্চল, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ প্রায় দুই ডজন পর্যটন ¯পট খুলে দেবে দেশের পর্যটন শিল্পের অমিয় সম্ভাবনার দ্বার।

পর্যটনের বিকাশে উদ্যোগে সরকার বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলাসহ পটুয়াখালীর কলাপাড়া, গলাচিপা ও রাঙ্গাবালীতে বিশেষ পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পরিকল্পনা কমিশন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ-পর্যটনভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন নামে প্রকল্প অনুমোদনও দিয়েছে।
বরগুনার স্কাউট লিডার আ. মান্নান জানান, ১৯৯৫ সালে এখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্পে (কমডেকা) অংশগ্রহণকারী ২৩টি দেশের প্রায় আড়াই হাজার স্কাউটস সদস্য এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলো। পদ্মা সেতু চালু হলে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবাদে কমডেকার চেয়েও বড় ক্যাম্পের আয়োজন হতে পারে।

বরগুনার বন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, এখানকার সাথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ চরে আধুনিক পর্যটন হোটেল তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশের অন্যান্য পর্যটন জেলার মতো বরগুনাও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বরগুনার জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, একসঙ্গে অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে বরগুনা একটি অসাধারণ জায়গা। তবে পদ্মাসেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়ার পরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে অন্যান্য জায়গার তুলনায় বরগুনা কোনো অংশেই কম হবে না। এমন কি এই জেলাকে ঘিরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠতে পারে একটি এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন।

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিুবুর রহমান জানিয়েছেন, পর্যটন ¯পট ও কেন্দ্রগুলোর তালিকা পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব এলাকার অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য নানা মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চলছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে জেলা পর্যটন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।

সূত্র : বাসস