চলে গেলেন একাত্তরের নির্ভীক কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমদ

অনলাইন ডেস্ক :
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে প্রবাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইয়ে যোগ দেওয়া কূটনীতিকদের একজন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমদ আর নেই।

সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার উত্তরার বাসা শিউলিতলায় তার মৃত্যু হয় বলে তার স্ত্রী বিলকিস মহিউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান।

৮০ বছর বয়সী এই অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা এবং ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। তিন সপ্তাহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর চারদিন আগে মহিউদ্দিন আহমদকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানান তার ভাই জিয়াউদ্দিন আহমদ।

বিলকিস মহিউদ্দিন সোমবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি আর নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।”

মহিউদ্দিন আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোককার্তায় তিনি বলেছেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।”

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে লন্ডনে তৎকালীন পাকিস্তান হাই কমিশনে কর্মরত ছিলেন মহিউদ্দিন। ১ অগাস্ট ট্রাফালগার স্কয়ারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এক সমাবেশে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করার ঘোষণা দেন।

ইউরোপের দেশগুলোতে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের কাজে যোগ দেন। সেই উত্তাল সময়ে ২৩ অগাস্ট তার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়।

কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে মহিউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, স্বাধীন দেশের স্বপ্নে সেদিন তাদের যুদ্ধটা ছিল ‘কূটনৈতিক ফ্রন্টে’। আর তাতে সফলও হয়েছিলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন হয়েই দেশে ফিরেছিলেন। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি তাকে স্বাগত জানাতে মহিউদ্দিন আহমদও হিথ্রোতে উপস্থিত ছিলেন।

পরে তিনি বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি, জাতির পিতা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “ভয় নেই, আমি এসে গেছি।”

পেশাদার কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমদের চাকরিজীবন কেটেছে নানা উত্থান পতনে। এইচএম এরশাদ সরকারের সময়ে তাকে পাঠানো হয়েছিল অন্য মন্ত্রণালয়ে। বঙ্গবন্ধুর ছবি রাখার ‘অপরাধে’ বিএনপি সরকার করেছিল চাকরিচ্যুত। পরে শেখ হাসিনা সরকারে এসে মহিউদ্দিন আহমদকে চাকরিতে ফেরান, সচিব হিসাবে পদোন্নতি দেন।

অবসরে যাওয়ার পর নিয়মিত কলাম লিখেছেন মহিউদ্দিন আহমদ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মতামত পাতায় তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও তিনি যোগ দিয়েছেন।

২০১৪ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী এবং বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমদ
মহিউদ্দিন আহমদের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৯ জুন, ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায় নূরপুর গ্রামে। পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় বাবা আব্দুর রশিদ মাস্টারের প্রতিষ্ঠিত জিএম হাট স্কুলে।

সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ভর্তি হন ফেনী কলেজে। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন।

১৯৬৪ সালে অনার্স পাসের পর মহিউদ্দিন আহমদ বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরের বছর মাস্টার্স করে দেশে ফেরেন।

ফেনী কলেজের অর্থনীতির প্রভাষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেও বছরখানেক পর করাচিতে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে যোগ দেন মহিউদ্দিন আহমদ। এরপর ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরে শুরু হয় তার কূটনৈতিক জীবন।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল, মহিউদ্দিন আহমদ তখন লন্ডনে পাকিস্তান হাই কমিশনের দ্বিতীয় সচিব। এপ্রিলে মুজিবনগর সরকারের ‘অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ’বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে তার দেখা হয় লন্ডনে বিবিসি কার্যালয়ে।

তখনই পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করার ইচ্ছার কথা জানান মহিউদ্দিন। তবে বিচারপতি চৌধুরী তাকে আরও অপেক্ষা করতে বলেন।

শেষ পর্যন্ত অগাস্টের ১ তারিখ ট্রাফালগার স্কয়ারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিশাল এক সমাবেশে উপস্থিত থেকে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করার ঘোষণা দেন মহিউদ্দিন আহমদ।

সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমাকে দেখে প্রত্যাশিতভাবে একটা শোরগোল পড়ে গেল আর কি। সেটা আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলির একটি।”

আরও এক বছর লন্ডনে থাকার পর মহিউদ্দিন আহমদের পোস্টিং হয় দিল্লি হাই কমিশনে। সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর যান জেনিভায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে মহিউদ্দিন আহমদের পেশাজীবনেও নেমে আসে দুর্ভোগ।

সেই সাক্ষাৎকারে মহিউদ্দিন বলেছিলেন, “আমি গেলাম মার্চে বোধহয়। নতুন সরকার যারা আসল ক্ষমতায়, আমাকে পছন্দ করল না তারা। ১৪ মাসের মাথায় আমাকে ডেকে নিয়ে আসল ঢাকায়।”

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিচালক হিসাবে তিন বছর দায়িত্ব পালনের যান মহিউদ্দিন আহমদকে প্রথমে ইন্দোনেশিয়ায়, পরে জেদ্দা মিশনে পাঠানো হয়। ১৯৮৫ সালের মে মাসে ঢাকায় ফেরার পর ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন দায়িত্বে তিনি ছিলেন।

এরশাদের সময়ে মহিউদ্দিন আহমদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে পাঠানো হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ে। সেখানে আড়াই বছর দায়িত্ব পালনের পর পাঠানো শিল্প মন্ত্রণালয়ে।

ছয় মাসের মত তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। এরশাদের পতন হলে আবার তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরার সুযোগ হয়। পাঠানো হয় নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মিশনের উপ স্থায়ী প্রতিনিধি হিসাবে।

সাক্ষাৎকারে মহিউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধুর ছবি রাখার কারণে ১০ মাসের মাথায় আমাকে ফেরত আনা হল ঢাকাতে। সেটাকে আমি টেনেটুনে ১৪ মাস পর্যন্ত রাখতে পারলাম।

”ঢাকায় আসলাম বোধহয় সেপ্টেম্বর মাসে। ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে রিটায়ার্ড করিয়ে দিল খালেদা জিয়া সরকার। চাকরিচ্যুত, একেবারে অপসারণ।”

চাকরিচ্যুতির পর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন মহিউদ্দিন আহমদ। সেই মামলা চলার মধ্যে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে।

সরকার সে সময় তাকে চুক্তিতে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়ার কথা বললেও ’অন্যায়ভাবে’ কেড়ে নেওয়া চাকরি ফেরত দেওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন তিনি।

সে সময়ের কথা স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে মহিউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, “আমাকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। আমি সেটা ফেরত পেতে চাই। তারপরে আপনি যা-ই করেন।

”সচিব হিসাবে পদোন্নতি দিয়ে ফরেন সার্ভিস একাডেমির অধ্যক্ষ বানিয়ে দিল। সচিব হিসাবে সব সুযোগ সুবিধা পেয়েছি।”

এরপর ২০০১ সালের জানুয়ারিতে সচিব হিসেবেই সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান মহিউদ্দিন আহমদ। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনীতি, পররাষ্ট্র নীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দারিদ্র্য, উন্নয়ন প্রভৃতি নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখেছেন বাংলা ও ইংরেজিতে।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “মহিউদ্দিন ভাই ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা।… তার মৃত্যুতে দেশ এক অমূল্য ব্যক্তিকে হারাল।”

মহিউদ্দিন আহমদ স্ত্রী ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে তার জানাজা হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় ফরেইন সার্ভিস একাডেমিতেও আরেক দফা জানাজা হবে। তার কফিন নেওয়া হবে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

স্ত্রী বিলকিস মহিউদ্দিন জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানাজা ও গার্ড অনার দেওয়ার পর তার স্বামীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ফেনীর গ্রামের বাড়িতে। আসরের পর সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

সূত্র : বিডিনিউজ