‘নির্মল করো, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’

অনলাইন ডেস্ক :
করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে অনেকটা স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে এসেছে বাংলা নববর্ষ। নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিলো আরও একটি বছর। সূচনা হলো নতুন বাংলা সাল। শুভ নববর্ষ। বিদায় ১৪২৮, স্বাগত ১৪২৯। জীর্ণ পুরাতন সবকিছু ভেসে যাক, ‘মুছে যাক গ্লানি’ এভাবে বিদায়ী সূর্যের কাছে এ আহ্বান জানায় বাঙালি।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাজধানী ও সারাদেশ জুড়ে থাকছে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। পহেলা বৈশাখ একটি সার্বজনীন উৎসব।

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর মানুষ ঘরে আবদ্ধ ছিল। দুই বছর পর বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। এবার নতুন বছর উৎসব করোনার বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকা না পড়লেও কঠোর আইনশৃঙ্খলার বেড়াজালে বন্দি থাকবে। গোয়েন্দা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী যে কোনো সময় জঙ্গি মামলা হতে পারে। এজন্য আগ থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা নতুন বছরের শুভেচ্ছা ছাড়াও সবার মঙ্গল কামনা করেছেন।

রমনার বটমূলে দুই বছর পর আবারও তৈরি হয়েছে মঞ্চ। এ মঞ্চ থেকে পহেলা বৈশাখে গান-পাঠ-আবৃত্তিতে স্বাগত জানানো হবে নতুন বঙ্গাব্দ ১৪২৯–কে। গত অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম প্রধান সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছায়ানটের আয়োজনে বর্ষবরণের সংগীতানুষ্ঠান হয়ে আসছে। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের আয়োজনে প্রথম রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয়ের সময় সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল এরপর কেবল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বৈরী পরিবেশের কারণে অনুষ্ঠান হতে পারেনি। আর করোনার কারণে বন্ধ ছিল দুই বছর।

বর্ষবরণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আনুষ্ঠানিকতা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় এবার পাঁচটি বড় মোটিভ থাকবে। এসবের মধ্যে রয়েছে ঘোড়া, পাখি ও টেপা পুতুল। এছাড়াও তারা তৈরি করছেন হাতপাখা, চড়কিসহ আরও কিছু বৈশাখী অনুষঙ্গ। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য করা হয়েছে- ‘নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সকালে পান্তা ইলিশ খাওয়ার রীতি চালু হলেও এবার রমজানের কারণে তা সম্ভব হবে না। হবে গ্রামবাংলার বিভিন্ন জায়গায় মেলার আয়োজন করা হয়। ভালোমন্দ রান্না চলে ঘরে ঘরে। নতুন পোশাক পরে অনেকেই ঘুরতে বের হন। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেন।

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলার মধ্য দিয়ে উদযাপন করে নতুন বছর।

খাজনা পরিশোধের গরমিল থেকে রক্ষার জন্য প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কারের নির্দেশ দেন সম্রাট আকবর। প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পায়। বাঙালির সর্বজনীন লোকোৎসব পহেলা বৈশাখ। একসময় মেলা, হালখাতা আর পুণ্যাহ উৎসব ছিল পহেলা বৈশাখের প্রাণ। বৈশাখী মেলায় থাকতো গ্রামের কামার-কুমার আর তাঁতীদের হস্তশিল্পের আয়োজন। থাকতো হাতে তৈরি মাটির খেলনা, মণ্ডা-মিঠাই, চড়কি, বেলুন, ভেঁপু, বাঁশি আর ভাজাপোড়া খাবার-দাবার। মেলার প্রধান আকর্ষণ ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই প্রতিযোগিতা ছিল জনপ্রিয়। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে নৌকাবাইচ, বহুরূপীর সাজ, হাডুডু খেলার আয়োজনও থাকত। আশির দশকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন উচ্ছ্বাসে বৈশাখী উৎসব জমে ওঠে

সূত্র : জাগোনিউজ