একাত্তরের মার্চ: প্রতিরোধ ছড়িয়েছিল পাহাড়েও

অনলাইন ডেস্কঃ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো জাতি রুখে দাঁড়িয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধে।

সেদিন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের প্রতিরোধ দেশের অন্যান্য স্থানের মতো দুর্গম পাহাড়েও ছড়িয়ে পড়ে।

তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা রাঙামাটি, রামগড় ও বান্দরবান এই তিন মহকুমা নিয়ে গঠিত ছিল। সমগ্র জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য জীবনপণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল – পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীও তার থেকে পিছিয়ে থাকেনি।

সেদিন মুক্তিকামী সাধারণ জনতার সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনেরও অনেক কর্তাব্যক্তি একাত্ম হয়েছিলেন মুক্তির লড়াইয়ে।

সেই সময়ের ছাত্রনেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা – যারা এখনও বেঁচে আছেন – যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণ করেছেন। তারা শুনিয়েছেন কীভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন ওই জনপদের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সামিল হয়েছিল।

একাত্তরের মার্চ মাসে রাঙামাটি জেলা সদরে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল রাঙামাটি সরকারি কলেজের তৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান ও সুনীল কান্তি দে-এর নেতৃত্বে।

তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশের চলমান রাজনৈতিক ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন, রাজপথে মিছিল-শ্লোগান, আন্দোলন, প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ছিল সংগ্রাম পরিষদের উদ্দেশ্য।

২৭ মার্চ বর্তমান রাঙামাটি স্টেশন ক্লাবের মাঠে মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম) – যিনি পরে বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হয়েছিলেন – স্বতঃস্ফুর্তভাবে জাতির মুক্তি আন্দোলনে শরীক হন।

রাঙামাটিতে উক্ত ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপনে জেলা প্রশাসক এইচটি ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ, পুলিশ সুপার বজলুর রহমান এবং মহকুমা প্রশাসক আবদুল আলীসহ রাঙামাটির অগণিত স্বাধীনতা প্রেমিক মানুষ এগিয়ে এলেন অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে।

রাঙামাটি স্টেশন ক্লাবের মাঠে শুরু হয় রাইফেল ট্রেনিং এবং ছাত্রদের হাতবোমা বানানোর প্রশিক্ষণ। জেলা প্রশাসকের সম্মতিক্রমে রাঙামাটি সরকারি কলেজের বিজ্ঞানাগারে রসায়ন বিভাগের যাবতীয় রাসায়নিক [কেমিকেল] ব্যবহৃত হতো এই কাজে।

তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা রণবিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২৫ মার্চ রাতে আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অফিসে বসে আছি। আমি, মাহবুব, কামাল, সুনীল দা, শুক্কুরসহ আরো কয়েকজন বসে আলাপ-আলোচনা করছিলাম। আমাদের অফিসের একটু পরেই পাবলিক লাইব্রেরির পাশেই টিঅ্যান্ডটি ছিল। টিঅ্যান্ডটির অপারেটর এমদাদ আমাদের খবর পাঠাল, ঢাকায় আক্রমণ হয়েছে। পিলখানায় আক্রমণ হয়েছে। শোনার পর আমাদের শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আমরা বুঝতে পারছিলাম এবার আমরা চূড়ান্ত যুদ্ধের দিকে যাচ্ছি।”

তিনি স্মৃতিচারণ করছিলেন, “রাতেই এইচটি ইমাম সাহেবের একটি গাড়ি এসে আমাদেরকে বিষয়টি জানাল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম চট্টগ্রামের দিকে গিয়ে ঘাগড়া এলাকায় একটা ব্যারিকেড সৃষ্টি করি, যাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাঙামাটি প্রবেশ করতে না পারে। রাতের মধ্যেই আমরা ঘাগড়ায় পরিখা খনন করে প্রশান্ত মনে ভোরে বাসায় ফিরি।”

ওই সময়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা সৈয়দ আব্দুস সামাদ তার ‘যখন দুঃসময়, সুসময় – স্বাধীনতা সংগ্রামের পাঁচালি’ বইয়ে লিখেছেন, “আমাদের ১৮/১৯শে মার্চ সীমান্ত সুরক্ষিত করার গোপন নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে প্রয়োজনে এই পথে নিরাপদ গন্তব্যে যাওয়া যায়। আমরা যতদূর সম্ভব সেটা করেছিলাম। যথেষ্ট সংখ্যক নৌযানও ঘাটে ভিড়িয়ে রেখেছিলাম। অগ্নিপুরুষ সৈয়দ শামসুল আলম এ ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্যোগ নেন। তাঁর তৎপরতা আমাদের বিস্মিত করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের নির্দেশ মতো যার কাছে যা ছিল তাই নিয়েই তাঁরা চরম সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। আমি কখনও ধারণাও করতে পারিনি এ ধরনের সার্বিক প্রস্তুতির। এ পর্যন্ত আমরা আইন-শৃঙ্খলার অসাধারণ উন্নতি করতে পেরেছি। জেলা প্রশাসনের সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছে। বাঙালি কোথা থেকে শিখল এই নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, আত্মপ্রত্যয়? আরাকান রোড থেকে কাপ্তাই লেকে ফেরার পথে এই ধরনের অনেক প্রশ্নই জাগছিল।”

মুক্তিযুদ্ধকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এইচটি ইমাম তার ‘বাংলাদেশ সরকার-১৯৭১’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পর রাঙামাটিতে সবকিছু বুঝে গোছাতে আমাদের কয়েকদিন সময় লেগেছিল। ১০-১১ তারিখের দিকে ছাত্রমহল থেকে সঠিক সংবাদ পাওয়া শুরু করলাম। এর মধ্যে এমন কিছু খবর এল যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। একটি ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সন্ধ্যার সময় এসপি বজলুর রহমান কয়েকজন ছাত্রনেতা এবং ইপিআর ওয়ারলেস স্টেশনের অপারেটরকে আমার কাছে নিয়ে এলেন। সবাই বেশ উত্তেজিত। চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দপ্তর (সেক্টর অথবা উইং) থেকে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে সকল বর্ডার আউটপোস্টে (বিওপি) তাদের কাছে যেসমস্ত ভারী অস্ত্রশস্ত্র (হেভি মেশিনগান এবং মর্টার) আছে সেগুলো নিয়ে যেন চট্টগ্রামে জমা করেন। বিওপিগুলো থেকে সাফ জবাব: অস্ত্রসমর্পণ কোনোভাবেই নয়। কথাটা বলা সহজ, কিন্তু করা নয়। তখন মার্শাল-ল চলছে, মিলিটারি রাজত্ব। নির্দেশ অমান্য করা মানে অবধারিত কোর্ট মার্শাল। আর মানতে গেলে প্রাণ যাবে। পাঞ্জাবিদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। অস্ত্র কেড়ে নিয়ে হামলা চালাবে।”

পাহাড়ের প্রবীণ সাংবাদিক ও প্রগতিশীল সংগঠক সুনীল কান্তি দে এখনও আপ্লুত হন সেই মার্চের স্মৃতি স্মরণ করে।

তিনি বলেন, “আমাদের জীবনের অসাধারণ স্মৃতির সেই মার্চ। দখলদার পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সারাদেশের তরুণদের সাথে চিন্তায়, আদর্শে, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের একাট্টা হওয়ার এই ইতিহাস চাট্টিখানি কথা নয়। এখন ৫০ বছর পর এসে আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না সেই সময় কতটা বিচ্ছিন্ন আর যোগাযোগহীন ছিল আজকের পার্বত্য চট্টগ্রাম। শত সীমাবদ্ধতাকে জয় করেই আমরাও রুখেই দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ