শ্রদ্ধাঞ্জলি : সম্প্রীতির দীপশিখা

আশরাফুল ইসলাম ড. উত্তম কুমার বড়ুয়াঃ
‘সবার উপরে মানুষ’- এই চিরসত্য পরিচয়কে ছাপিয়ে বিভেদের দেয়াল যখন আমাদের ক্রমেই গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন অন্তত কিছু ‘অতি মানুষ’কে আঁকড়ে ধরে আমরা পরিত্রাণ পেতে চাই। সম্বল করতে চাই তাদের মহান আদর্শকে। মানবতাবাদী মহান বৌদ্ধ ভিক্ষু শুদ্ধানন্দ মহাথের নিঃসন্দেহে তেমনি এক নাম। ৮৭ বছরের পার্থিব জীবনের ইতি টেনে গত ২০২০ সালের ৩ মার্চ অনন্তলোকে পাড়ি জমান তিনি। ধর্মীয় আচার মেনে ২০২২ সালের ৪ মার্চ তিন দিনের মহাআয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় মহামহিম এই সাধকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।

   শুদ্ধানন্দ মহাথের (১৯৩৩-২০২০)

সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের যাদের আদর্শকে জীবনের ব্রত করেছিলেন, তাদেরই একজন ছিলেন কালজয়ী দার্শনিক ও মহান বৌদ্ধগুরু শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্ম নেওয়া দশম-একাদশ শতকে বাংলার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত মহাপ্রাণ অতীশ দীপঙ্কর তার অনুসারীদের জন্য যে জীবনাদর্শ রেখে গিয়েছিলেন; শুদ্ধানন্দ মহাথেরর মতো বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তাতে নবপ্রাণ দান করেন। বলা যায়, বিংশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের উত্তর পদুয়ায় জন্ম নেওয়া একজন শুদ্ধানন্দ সেই আদর্শিক পরম্পরারই এক সার্থক পুরুষ।

বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ২৮তম সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের জীবনসায়াহ্নে এসে প্রত্যক্ষ করেছেন দেশে-বিদেশে ধর্মের নামে কূপমণ্ডূকতার কুৎসিত আস্ম্ফালন, উগ্রবাদীদের ক্রমাগত উত্থান। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে লড়াকু এই যোদ্ধা এমন একটি পরম্পরাকে লালন করেছেন, যা এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে এক উদারনৈতিক জীবনদর্শনের দীক্ষা দেয়। কিন্তু জীবদ্দশায় সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর একাধিক আগ্রাসনও প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য তার হয়েছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায় অধ্যুষিত কক্সবাজারের রামুসহ অন্যান্য স্থানে এই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান-বসতবাড়ির ওপর বর্বরোচিত হামলার পরও মাতৃভূমিকে ভালোবেসে তিনি ঘৃণার বদলে ভালোবাসার বাণী প্রচার করে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছিলেন। পুরোদস্তুর একজন ধর্মীয় নেতা হয়েও সম্প্রীতির বাণীকে সম্বল করে তার নেতৃত্বের গুণ বাংলাদেশের বাইরে বহির্বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

আমরা দেখব, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের সরব প্রতিবাদের নীতি গ্রহণ করেন শুদ্ধানন্দ মহাথের। তার গৃহীত পদক্ষেপের ফলেই বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারের বর্বরতার বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়াতে দেখেছি আমরা।

অকুতোভয় এই মহান বৌদ্ধ ভিক্ষু জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ১৯৭১ সালে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জানমাল রক্ষা করেছিলেন। যুদ্ধকালীন বাসাব ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার ছিল হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের নিরাপদ ঠিকানা। ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রামের রাউজানে জ্ঞানজ্যোতি ভিক্ষুকে গলা কেটে হত্যা ও গোপালচন্দ্র মুহুরীকে মাথার খুলি উড়িয়ে দিলে উদ্ভূত উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শান্তির বাণী নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন শুদ্ধানন্দ মহাথের। রামুর ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মন্দিরগুলো যেভাবে এক রাতে উগ্রপন্থিরা তাণ্ডবলীলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়, তখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ত্রাণকর্তা বারতা এসেছিল। শুদ্ধানন্দ মহাথেরর আরেকটি বড় কীর্তি হচ্ছে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর অনাথ শিশুদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক মানবিক আশ্রম। বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির যে বিরল দৃষ্টান্ত তিনি গড়ে যেতে পেরেছেন, তা অনুসরণযোগ্য। পবিত্র রমজানে প্রতি বছর মুসলিম ভাইদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থাই শুধু নয়; জায়গার অভাবে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে না পারা সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য বৌদ্ধ মন্দির মাঠে পূজা করতে দিয়েও উদারতা দেখাতে পেরেছিলেন তিনি। অগণিত আউলিয়া ও সাধু-সন্তর এই পুণ্যভূমি যে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির পরম্পরা যুগে যুগে বিরাজমান; তিনি ছিলেন তাদের যোগ্য উত্তরাধিকার।

বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মে যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, মৃত্যুর পর শেষযাত্রায় তার এমন অনুপুঙ্খ প্রতিফলন বাংলাদেশের সম্প্রীতির স্বরূপকেই আরও আলোকময় করে তুলেছে। স্খলিত সমাজ আর মানব সভ্যতার অশান্ত কোলাহলে শান্তির যে দীপশিখা জ্বেলে তিনি চিরপ্রস্থান করলেন; ভক্ত-অনুরাগীরা সেই আদর্শের শিখায় নিজেদের প্রজ্বলিত করলেই তার আত্মা শান্তি লাভ করবে- এটাই আমাদের বিশ্বাস। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।

আশরাফুল ইসলাম ও ড. উত্তম কুমার বড়ূয়া: ইতিহাস গবেষক ও সাংবাদিক এবং বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সহ-সভাপতি