হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া : কোনো শহর নিরাপদ নেই

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুদ্ধ বন্ধে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিষ্ফল আলোচনার পর ইউক্রেনে গতকাল শুক্রবার হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। রুশ সেনাদের বিশাল বহর ভাগ হয়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ঘিরে অবস্থান নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। প্রথমবারের মতো নতুন তিনটি শহরেও রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা হয়েছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া এমন দেশ নয় যে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করবে। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করেই রাশিয়া ঘুরে দাঁড়াবে। এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে পশ্চিমারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রুশ হামলা জোরদার হওয়ার বিষয়টি ইউক্রেন কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক গতকাল এক টুইটে বলেছেন, বড় শহরগুলো আবারও ধ্বংসাত্মক হামলার মুখে পড়েছে।

কিয়েভের আশপাশে লড়াই

মার্কিন একটি প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমের আন্তোনভ বিমানবন্দরের কাছে অবস্থানরত রুশ সেনাবহর কয়েক ভাগে ভাগ কয়ে আশপাশের ছোট শহরগুলো ঘিরে অবস্থান নিয়েছে। ৬৪ কিলোমিটার সড়কজুড়ে থাকা এই বহরে সাঁজোয়া যান, ট্যাংক ও কামান রয়েছে। কিয়েভের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে তাদের অবস্থান দেখা গেছে। বহরের আরেক অংশ কিয়েভের উত্তর দিকে রুবিয়াঙ্কা শহরের কাছে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া উত্তর–পূর্ব দিক দিয়ে রুশ সেনাদের আরেকটি বহরও কিয়েভের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, কিয়েভকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলতে চাইছেন রুশ সেনারা।

রুশ বাহিনীকে প্রতিরোধে ইউক্রেনের সেনারাও চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো বলেছেন, রাজধানীর বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ চলে গেছে। রুশ সেনাদের প্রতিরোধে এখন প্রতিটি বাড়ি একেকটি দুর্গে পরিণত হয়েছে।

আক্রান্ত নতুন তিন শহর

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের পাশাপাশি দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ, উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মারিউপোলসহ কয়েকটি শহর সপ্তাহখানেক ধরে ঘিরে রেখেছে রুশ বাহিনী। গতকাল নতুন করে উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের লুৎস্ক, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক এবং মধ্য-পূর্বাঞ্চলের নিপরো শহরে প্রথমবারের মতো হামলা হয়েছে।

লুৎস্কে একটি বিমানঘাঁটি ও বিমানের ইঞ্জিন তৈরির কারখানায় হামলা হয়। সেখানে দুই ইউক্রেনীয় সেনা নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন বলে আঞ্চলিক প্রশাসন জানিয়েছে। ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্কে সামরিক স্থাপনায় হামলার কথা জানিয়েছে রাশিয়া।

গতকাল সকালে কয়েক দফা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে নিপার নদী তীরবর্তী শহর নিপরো। সেখানে একটি জুতার কারখানা, একটি আবাসিক ভবন ও কিন্ডারগার্টেনে বিমান থেকে বোমা হামলা হয়েছে। হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। শিল্পনগরী নিপরোয় রকেট কারখানাও রয়েছে। ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে সফলতা পাওয়া রুশ বাহিনীর সামনে এগোনোর জন্য এই শহর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নিপরোর বাসিন্দা নেদেঝদা জানান, স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে পাশের একটি স্থাপনায় বিস্ফোরণে তাঁর ভবনও কেঁপে ওঠে। নাতিকে নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্রসহ দ্রুত শহরের মেট্রোরেলস্টেশনের আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান তিনি।

নেদেঝদা বলেন, ‘আমি অন্তত তিনটি বিস্ফোরণ টের পেয়েছি। বাইরে সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দ হচ্ছিল। সাইরেন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মেট্রোতেই ছিলাম। সেখানে অনেক মানুষ ছিল। নারী, পুরুষ, ছোট্ট কুকুর, প্রবীণ ও তরুণ—সবাই আমরা প্রথমবারের মতো সেখানে গেলাম। এটা সত্যি ভয়ংকর।’

বিরতিহীন বোমা হামলা

ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে বিমান থেকে বিরতিহীনভাবে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। অবরুদ্ধ শহরটিতে এক সপ্তাহ কাটিয়েছেন বিবিসির সাংবাদিক কুয়েনটিন সমারভিলে ও ক্যামেরাম্যান ড্যারেন কনওয়ে। তাঁরা জানান, প্রতি রাতে শহরে রুশ বিমান থেকে বোমা ফেলার পাশাপাশি গোলা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এতে অনেকের প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর শহরের প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে থাকা ইউক্রেনের সেনারা প্রায়ই রুশ ট্যাংকবহরের হামলার শিকার হচ্ছেন।

খারকিভের মেয়র ইহোর তেরেখোভ বলেছেন, শহরে বিরতিহীন বোমা হামলায় অন্যান্য স্থাপনার পাশাপাশি অন্তত ৪৮টি স্কুল ধ্বংস হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ শহরেও বৃহস্পতিবার রাতে বিমান হামলা হয়েছে। হামলায় শহরের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

রুশ বাহিনী গতকাল মারিউপোলের নিকটবর্তী ভলনোভাখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ইউক্রেনে আল–জাজিরার সাংবাদিক বার্নার্ড স্মিথ বলেছেন, দোনেৎস্ক ও মারিউপোলের মধ্যে অবস্থান ভলনোভাখার। এখন দোনেৎস্কের রুশপন্থী বিদ্রোহীরা সরাসরি মারিউপোলে গিয়ে হামলা চালাতে পারবে।

এই অঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের ১৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধাকে পাঠানোর কথা বলেছে রাশিয়া। এদিকে ইউক্রেন বাহিনী গতকাল রাশিয়ার একজন সেনা কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে। মেজর জেনারেল আন্দ্রেই কোলেসনিকভ রাশিয়ার ২৯তম আর্মির কমান্ডার ছিলেন। এর আগেও রাশিয়ার দুই কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছিল ইউক্রেন। তবে এ বিষয়ে মস্কোর বক্তব্য জানা যায়নি।
বিজ্ঞাপন

‘কোনো শহর নিরাপদ নেই’

ইউক্রেনের পার্লামেন্ট সদস্য ইন্না সোভসুন গতকাল টুইটে লিখেছেন, ইউক্রেনে আর কোনো নিরাপদ শহর নেই। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘দুই সপ্তাহ ধরে আমরা শুধু দিনের বেলায় বড়জোর তিন ঘণ্টা ঘুমাই। সন্তানদের জীবন নিয়ে আমরা আতঙ্কিত, কিন্তু তেমন কিছু করতে পারছি না। আমরা আত্মসমর্পণ করতে পারি না। আমরা তাদের হাতে দেশ তুলে দিতে পারি না। আমাদের আসলে লড়াই করা ছাড়া উপায় নেই।’

যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা হামলা বন্ধের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন ইউক্রেনের পার্লামেন্টের এই সদস্য। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বের কাছে করজোড়ে বলছি, দয়া করে হস্তক্ষেপ করুন। দয়া করে তাদের ঠেকান। সবাইকে হত্যা এবং পুরো দেশকে ধ্বংস করতে দেবেন না।’
মানবিক সংকট

রুশ হামলায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মারিউপোল শহরে কয়েক লাখ মানুষ আটকা পড়েছে। পানি ও বিদ্যুৎহীন শহরটিতে দেখা দিয়েছে খাবারের সংকট। নিহতদের গণকবর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, মারিউপোল ছাড়াও এই অঞ্চলের মেলিতোপোল শহর এবং খারকিভের বাসিন্দাদের ত্রাণসহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম খুবই জরুরি।

গতকালও কিয়েভ ও মারিউপোলসহ কয়েকটি শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল ইউক্রেন। তবে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।

যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ২৫ লাখে পৌঁছেছে বলে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি জানিয়েছেন।

সূত্রঃ প্রথম আলো