বাংলার সমৃদ্ধি: বেঁচে ফেরা নাবিকদের কথায় সেদিনের ঘটনা

অনলাইন ডেস্কঃ
যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেইনে জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন বাংলাদেশের ২৮ নাবিক, এরপর মাথার উপর গোলা পড়ার আতঙ্কের এক পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে অবশেষে দেশে পৌঁছে হাঁপ ছাড়লেন তারা।

বুধবার ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তারা বলছেন, অনিশ্চিত অবস্থা থেকে এভাবে নিরাপদে ফেরার কথা ভাবেননি তারা।

সহকর্মী হাদিসুর রহমানকে হারানো আর পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে উদ্ধারের ঘটনাও পাওয়া গেছে তাদের বর্ণনায়।

গত ২ মার্চ ইউক্রেইনের ওলভিয়া বন্দরে আটকে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকাধীন জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’তে রকেট হামলা হয়। তার এক সপ্তাহ আগেই ইউক্রেইনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া।

গোলার আঘাতে জাহাজের মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (নেভিগেশন ব্রিজ) পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।

জাহাজে থাকা কর্মীরা আগুন নেভাতে পারলেও ব্রিজ এলাকায় অবস্থানকালে গোলার সরাসরি আঘাতে প্রাণ যায় থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জাহাজের মাস্টার জি এম নূর ই আলম বলেন, “সেদিন আমাদের রুটিন ব্রিফিং ছিল। বিকাল বেলায় অ্যাটাক হয়। তখন আমাদের ব্রিজে আগুন লেগে গেছিল। আগুন নেভানোর জন্য আমরা ব্যস্ত ছিলাম। আগুন নেভানো হয়।”

হামলার পর আতঙ্ক আর উদ্বেগ নিয়ে আগুন নেভাতে দেখা গেছে নাবিকদের করা বিভিন্ন ভিডিওতে। বাঁচার আকুতিও বিভিন্ন ভিডিওবার্তায় জানিয়েছিলেন তারা।

রকেট হামলার থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া সেকেন্ড অফিসার রামকৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, “আমরা তখন জাহাজে ছিলাম। অন দ্য স্পট ছিলাম না আর কি, অন্য জায়গায় ছিলাম।

“বিস্ফোরণ হওয়ার পরে আমরা সেইফ পজিশনে চলে যাই। হাদিসুর যেখানে পড়েছে, ওখানে ছিল। (আমরা) ওখানে ছিলাম না। নিচ তলার দিকে ছিলাম।”

আগুন নিভিয়ে জাহাজের ফ্রিজারে হাদিসুরের লাশ রাখেন তার সহকর্মীরা। নাবিকরা জাহাজেই অপেক্ষা করতে থাকেন উদ্ধারের।

শিপিং করপোরেশনের কর্মকর্তারা তখন জানিয়েছিলেন, মোটামুটি ৪০ দিন টিকে থাকার মতো খাবার ও পানি মজুদ আছে জাহাজে, রেশন করে চালালে আরও কিছু দিন চালানো যাবে।

আক্রান্ত হওয়ার পরদিন ৩ মার্চ বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস আর প্রবাসীদের সহায়তায় উদ্ধার করে তাদের নেওয়া হয় যুদ্ধের ময়দান ইউক্রেইনের ‘সেইফ শেল্টারে’।

উদ্ধারের দিনের ঘটনা স্মরণ করে অ্যাডিশনাল মাস্টার মনসুরুল আমিন খান বলেন, “বোমা বিস্ফোরণের পরে আতঙ্ক বেড়ে গেছে, স্বাভাবিকভাবেই। আমাদের একজন সহকর্মী নিহত হয়েছেন। আতঙ্ক তো আরও বাড়বেই।

“আমরা কিছু সময় জাহাজে ছিলাম। এরপর সরকার, বিএসসির আন্তরিক প্রচেষ্টায় যত দ্রুত সম্ভব, তারা চেষ্টা করছে। পরের দিন সকাল বেলায় আমাদেরকে সরায় ফেলছে আর কি। সেইফ একটা জোনে নিয়ে গেছে। একটা সেইফ বাংকারে ছিলাম।”

পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে উদ্ধার হলেও নিরাপদ স্থানে যেতে তাদের পাড়ি দিতে হবে আরও দীর্ঘপথ। শুরুতে তাদেরকে ইউক্রেইন সীমান্তবর্তী পোল্যান্ডে নেওয়ার কথা থাকলেও সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া হয় মলদোভায়।

ওলভিয়া থেকে মালদোভার সবচেয়ে কাছের সীমান্তের দূরত্ব সড়ক পথে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি। তীব্র গোলাবর্ষণের মধ্যে নাবিকদের পার হতে হয় এলাকা।

জাহাজের অ্যাডিশনাল মাস্টার মনসুরুল আমিন খান বলেন, “১২ ঘণ্টার মতো সময় লাগছে ইউক্রেইন বর্ডার ক্রস করতে।”

জাহাজ থেকে উদ্ধার পাওয়ার তিন দিন পর মালদোভা সীমান্ত পার হয়ে রোববার দুপুরে রোমানিয়ায় পৌঁছান বাংলার সমৃদ্ধির নাবিক ও প্রকৌশলীরা।

মলদোভা পেরিয়ে রোমানিয়ায় পৌঁছার পর হাঁপ ছেড়ে বাঁচার কথা জানিয়ে মনসুর বলেন, রোমানিয়া আসার পর সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল।

“আমরা জানি, রোমানিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটা দেশ। এখানে যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনাই নাই। রোমানিয়ায় আসার পর আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে, না, আমরা সেইফ।”

বুধবার দেশে ফেরার পর সব ধরনের আতঙ্ক কেটে স্বস্তির কথাই জানান নাবিকরা। সরকার ও পূর্ব-ইউরোপে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ দেন তারা।

দেশের ফেরার পর দুপুরে এক ফেইসবুক পোস্টে মনসুর লেখেন, “আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে সুস্থভাবে দেশে ফিরতে পেরেছি। সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই – যারা আমার বিপদের সময়ে আমার খোঁজ নিয়েছেন, আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, আমার জন্য দোয়া করেছেন।”

আর জাহাজের মাস্টার নূর ই আলম সাংবাদিকদের বলেন, “দেশে সুস্থভাবে ফিরতে পেরে অনেক আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সবার তৎপরতায় নিরাপদে এবং দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরতে পেরেছি, আমাদের পরিবার অপেক্ষায় ছিলেন, সবার চেষ্টায় ফিরতে পেরেছি এত অল্প সময়ের মধ্যে।”

বাংলার সমৃদ্ধির মাস্টারের ভাষায়, “এটা (ফিরে আসা) ছিল অকল্পনীয়। কারণ অনেক বড় বড় দেশ আছে যাদের নাগরিক এখনও দেশে ফিরতে পারেনি।”

জাহাজের প্রকৌশলী সৈয়দ আসিফুল ইসলাম বলেন, “খুব আতঙ্কে ছিলাম আর কি। সরকারকে এজন্য ধন্যবাদ।”

নিজেরা ফিরলেও সহকর্মী হাদিসুর রহমানের লাশ এখনও পড়ে আছে ইউক্রেইনে।

“ওর ডেডবডিটা এখনও ইউক্রেইনে আছে। এটা সরকারের প্রচেষ্টা চলতেছে। এটা অতি শিগগির নিয়ে আসা হবে। আমি এতটুকুই জানি,” বলেন আসিফ।

বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের নাবিক ও প্রকৌশলীদের দেশে ফেরার খবরে রকেট হামলায় নিহত থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান পরিবারের সদস্যরা বুধবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন। এসময় তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহকারী মহাসচিব গোলাম জিলানী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, বিমানবন্দর থেকে উত্তরার একটি হোটেলে বিশ্রাম ও খাওয়া-ধাওয়া সারেন নাবিকরা। সন্ধ্যায় ফেরেন যার যার বাড়িতে।

সূত্রঃ বিডিনিউজ