মালুমঘাট ট্র্যাজেডি : এটা কি নিছক একটি দুর্ঘটনা !

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু:
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলাধীন ডুলাহাজারা ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের মালুমঘাট রিংভং ছগিরশাহকাটা হাসিনাপাড়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক পরিবারের সহোদর পাঁচ ভাইয়ের করুণ মৃত্যুর ঘটনা দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে তাদের প্রয়াত পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ক্ষৌরকর্ম সম্পন্ন করে শশ্মান থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তারা নয় ভাই-বোন। বাড়ির কাছাকাছি প্রায় এসেও গিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন ভাইদের নিয়ে আর ঘরে ফেরা হলো না মুন্নী সুশীলের। মুন্নী সুশীল প্রাণে বেঁচে যাওয়া ঘটনাস্থলের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। রাস্তা পারাপারের জন্য নয় ভাই-বোন সবাই মিলে রাস্তার পাশ ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা পিকআপ ভ্যান এসে চাপা দিয়ে যায় তাদের। ঘটনাস্থলেই চার ভাই- অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫) ও চম্পক সুশীল (৩০) মারা যান। সেদিন বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান স্মরণ সুশীল (২৫) নামে তাদের আরও এক ভাই। এই ঘটনায় অপর দুই ভাই- রক্তিম সুশীল (২৯), প্লাবন সুশীল (২২) ও এক বোন হীরা সুশীল মারাত্মকভাবে আহত হন। আহতদের মধ্যে রক্তিম সুশীলের অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। অবশেষে গত ২২ ফেব্রুয়ারি তিনিও চলে গেলেন। গত ৮ তারিখের ঘটনার মাত্র দিন দশেক আগে গত ৩০ জানুয়ারি তাদের পিতা সুরেশ চন্দ্র সুশীল প্রয়াত হন। এই করুণ মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত এবং সর্বশান্ত পরিবারটিকে গত ১১ ফেব্রুয়ারি বিকালে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলাম। তখন নিহতদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান চলছিল। ধর্মীয় রীতি অনুসারে চলা এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। পাশাপাশি লাইন করে প্রয়াত পাঁচ ভাইয়ের ছবি বসানো হয়েছে। আর প্রত্যেক ছবির সামনে সাদা কাপড় পরে বসে আছেন তাদের অকাল বিধবা স্ত্রীরা। একদিকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম নিহতদের মায়ের সাথে দেখা করব বলে। অপরদিকে, দেখা হলে এই মাকে কী বলে সান্ত্বনা দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে দেখা হলো পুত্রশোকে নিমজ্জিত মা মানু সুশীলের সাথে। মাত্র কয়েক দিন আগে নিজের জীবনের সকল সুখ-দুঃখের সাথী স্বামীকে হারানো কোনও স্ত্রী কয়েক দিন পরে এসে সন্তানের মৃত্যুশোক সইবার মতো অবস্থায় থাকেন কিনা সে কথা ভাবতেই ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে উঠছিল বার বার। তাও যদি হয় একই দিনে পাঁচ সন্তানের মৃত্যুশোক! তিনি তো এখন কেবল একটা জীবন্ত লাশ।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়ক পথে সংঘটিত দুর্ঘটনা ৪৫৫২টি। এসব দুর্ঘটনায় সড়কপথে নিহতের সংখ্যা ৫১৪৭ জন। আহতের সংখ্যা ৫৪২৪ জন। সংগঠনটি বলছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৪৯৮৩টি। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালের সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৮৯১টি বেশি। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৪৭০২টি। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালের সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৬১০টি কম। কিন্তু এবারে ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালের সড়ক দুর্ঘটনা বেশি লক্ষণীয়। যা ২০২০ সালের দুর্ঘটনার অনুপাত থেকে ২১% বেশি। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারী আকারে দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশেও এর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অফিস-আদালত, দোকানপাট ও গণপরিবহন বন্ধ থাকে। মূলত ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা যদিও কম হওয়ার কথা তারপরও ২০২০ সালের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে।

অপরদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংগঠনটির ২০২১ সালের তথ্য মতে, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে গত বছর ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও দেশে ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮০৯ জন নিহত এবং ৯ হাজার ৩৯ জন আহত হয়েছেন।

গত দুই বছরে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য নিসচা যে কারণগুলো চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- সড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাব, টাস্কফোর্সের ১১১টি সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাব, দৈনিক চুক্তিভিক্তিক গাড়ি চালনা, লাইসেন্স ছাড়া চালক নিয়োগ, পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, সড়ক ও মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার গাড়ি বৃদ্ধি, মহাসড়কে নির্মাণ ত্রুটি ইত্যাদি।

বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এছাড়া সড়কে ছোট যানবাহন বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি, রাস্তার পাশে হাট-বাজার, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় নামানো এবং দেশব্যাপী নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি-ইজিবাইক-ব্যাটাররিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশানির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে এই সমিতি মনে করছে।

দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, গত বছর যত সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে, এর মধ্যে ৫২ দশমিক ৯৬ শতাংশ গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা। অর্থ্যাৎ ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনাই গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা। তারা বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ হলো বেপরোয়া গতি।

চকরিয়ার ডুলাহাজারা মালুমঘাটে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সহোদর পাঁচ ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাটিও গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা। আটক হওয়া ওই পিকআপ ভ্যানের চালকও প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে বলেছেন যে, অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে তিনি দেখতে পাননি এবং গাড়িও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। সেসময় তার গাড়ি ঘন্টায় ৬৫-৭০ কিলোমিটার বেগে চলছিল। অপরদিকে ওই ঘটনায় অক্ষতভাবে বেঁচে যাওয়া নিহতদের বোন ও একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মুন্নী সুশীল এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি তুলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, একটি জায়গার বিরোধকে কেন্দ্র করে পিতার মৃত্যুর আগের রাতে একদল লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়িতে সহিংস হামলা করেন। এই ঘটনার পরের দিন হ্নদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাদের পিতার মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর দশ দিনের ব্যবধানে শশ্মানে শ্রাদ্ধক্রিয়ার অংশ হিসেবে ক্ষৌরকর্ম শেষ করে ঘরে ফেরার পথে ওই পিকআপ ভ্যান চালক ইচ্ছা করেই তাদেরকে চাপা দিয়েছেন। কারণ নিহতরা দুর্ঘটনার সময় মহাসড়কের উপর ছিলেন না বরং মহাসড়ক থেকে আরো কয়েক হাত দূরে ফুটপাতে ছিলেন। তার দাবি, রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন তারা দুইজন কিন্তু গাড়ি তাদেরকে চাপা দেয়নি। অন্যদিকে ফুটপাতে গিয়ে তার ভাইদের লক্ষ্য করে গাড়িচাপা দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, গাড়িটি কিছুদূর গিয়ে আবার পেছনে এসে পিষে দিয়ে যায়। সেই কারণেই হতাহতের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। তাই মুন্নী সুশীল বাড়িতে সহিংস হামলা, পিতার আকস্মিক মৃত্যু এবং ভাইদেরকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনাকে একই সুতোয় গাঁথা বলে মনে করছেন। তার আত্মীয়-স্বজনরাও একই কথা বলছেন।

এটা এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা যে ঘটনায় পুরো একটি পরিবার পুরুষশূণ্য হয়ে যায়, সকল ভাই, সকল ছেলে, সকল পিতা, সকল স্বামী শেষ হয়ে যায় সেই পরিবার সন্দেহ পোষণ করতেই পারে। অভিযোগ তুলতেই পারে। এখন কথা হলো, এটা পরিকল্পিত কোনও ঘটনা হোক বা না-ই হোক চালক আর মালিকপক্ষ তো দায় এড়াতে পারে না। চালক জানতেন কুয়াশায় আচ্ছন্ন রাস্তাঘাট ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে তিনি এই অবস্থায় এত দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাবেন কেন? এতগুলো মানুষকে পিষে মেরে চালক তার গাড়ির মালিকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি গাড়িটা নিরাপদ জায়গায় রেখে চালককে বছর খানেকের জন্য গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পরামর্শ দিলেন। তার মতে ততদিনে সব সমস্যা মিটে যাবে। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে মালিকের ছেলে এবং ভাগ্নেও ছিলেন। তাদের সকলের ভূমিকাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ এবং অমানবিক। আমাদের প্রশ্ন জাগে, চালক এবং সাথে থাকা অপর দুইজন তারা স্বাভাবিক ছিলেন কিনা? এই ঘটনা যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে না-ও হয়ে থাকে তাহলে মহাসড়ক থেকে নেমে ফুটপাতে গিয়ে তাদের গাড়িচাপা দিলেন কেন? যতদূর জানা গেছে ওই সময় ওই পিকআপ ভ্যানের সামনে কোনও পথচারীও আকস্মিকভাবে পড়ে যাননি। অন্য কোনও গাড়িকেও পথ করে দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। আর যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে যা দেখলাম সেখানে কোনও বাঁক নেই। তাহলে হ্নদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটা কি আদৌ অনিবার্য ছিল? এটা পূর্ব পরিকল্পিত কোনও ঘটনা না হলেও এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কি হত্যাকাণ্ড বলে বিবেচিত হবে না? কারও কোনও দায় থাকবে না? গাড়িচাপা দিয়ে মারলে কি সাত খুনও মাফ? ঘটনাটির সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং গভীর তদন্তের প্রয়োজন আছে। সড়কে ঘটা এমন হত্যাকাণ্ডগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে গেলে কিংবা দায়সারা ভাবে নিলে সড়কে এমন বিপর্যয় রোধ করা যাবে না, কেউ রেহাই পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

ওই ঘটনায় সর্বশান্ত পরিবারটা এখন একপ্রকার পুরুষ শূন্য হয়ে গেছে। নিহতদের সহধর্মীনিরা অকালে বিধবা হয়ে গেছেন। তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নিহতদের মা এখনো জীবিত আছেন বটে তবে একটা জীবন্ত লাশের মতো আছেন। আপাতত বেঁচে থাকা আরেক ভাই প্লাবন সুশীল ওই ঘটনার পর থেকে মানসিক ভারসাম্য হারানোর মতো হয়ে গেছেন। তাদের এক বোন হীরা সুশীলেরও এক পা কাটা গেছে। এখন তাদের কী হবে? কে নেবে তাদের দায়-দায়িত্ব? মুহূর্তের মধ্যেই শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো একটি বংশই ছারখার হয়ে গেল। এসময় তাদের পাশে থাকতে হবে মানবিক সকল মানুষকে। পাশে থাকতে হবে রাষ্ট্রকে, তাদেরকে বাঁচার শক্তি, রসদ, অবলম্বন যোগাতে হবে সরকারকে। কিন্তু আমরা এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কোনও উদ্যোগ রাষ্ট্র কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে নিতে দেখিনি। স্থানীয় প্রশাসন তথা সরকারি সহযোগিতা বলতে যা পেয়েছেন তা যৎসামান্য এবং গতানুনিকভাবে সবাই যা পেয়ে থাকেন তাই পেয়েছেন। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তে সর্বশেষ রক্তিম সুশীলও অনেকটা বিনা চিকিৎসাতেই মারা গেছেন। তার উন্নত চিকিৎসা করানো নিঃস্ব পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমরা আশা করব, মানবিক এই রাষ্ট্র আর সরকার সর্বোচ্চ দরদ নিয়ে দিশেহারা হতভাগ্য নিঃস্ব এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবে। এই ক্ষতি কোনও কিছুর বিনিময়ে পূরণ হবার নয় কিন্তু কর্তব্যের দায় এড়ানোও সম্ভম নয়।

লেখকঃ সভাপতি, কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদ, রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার।