যে তিন কারণে ‘মানহীন’ বই প্রকাশেও বাধা নয়

আনিসুল হকঃ
প্রশ্নটা আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে। বলেছিলাম, ‘স্যার, একজন হয়তো ভালো চিকিৎসক, হয়তো ভালো বিজ্ঞানী, হয়তো বড় কর্মকর্তা; পেশাগত জীবনে সফল, কিন্তু তিনি একটা কবিতার বই বের করলেন, যা হাতে নেওয়া মাত্রই বোঝা যায়, এই লেখাগুলো কবিতা পদবাচ্য নয়; বাংলাদেশের কোনো পত্রিকার সম্পাদকই এই কবিতা প্রকাশ করতেন না। তাহলে কি তাঁকে বলে দেওয়া উচিত নয়, আপনি দয়া করে কবিতার বই প্রকাশ করবেন না!’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, ‘না, এই ধরনের কথা বলা বা শর্ত আরোপ করা উচিত নয়।’ তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি হয়তো ভাবছ, এগুলো তো কবিতা হয়নি, এগুলো প্রকাশ করা বেশ একটা লজ্জার ব্যাপার, আমিও হয়তো তোমার সঙ্গে একমত হলাম যে কবিতাগুলো মানোত্তীর্ণ নয়; কিন্তু ওই ভদ্রলোকের কথা ভাবো, এটা তাঁর জীবনের এক পরম ভালোবাসা, সাধনা, দুর্বলতার জায়গা। এই বইটা তিনি সমস্তটা ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে আন্তরিকভাবে লিখেছেন; বইটা বের করা তাঁর জীবনের স্বপ্ন, এই স্বপ্ন চরিতার্থ কেন তুমি করতে তাঁকে বাধা দেবে?’

আমার লেখার শিরোনামে আছে, যে তিন কারণে মানহীনও বইও প্রকাশিত হতে দেওয়া উচিত! ১ নম্বর কারণটা আমি জানিয়ে দিলাম অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উক্তির মাধ্যমে। ২ নম্বর কারণটা হলো, কোনটা মানসম্পন্ন, কোনটা মানসম্পন্ন নয়, এটার কোনো সর্বজনস্বীকৃত মাপকাঠি শিল্প-সাহিত্যে নেই। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উচ্ছ্বসিত ছিলেন না। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর বুদ্ধদেব বসু গিয়েছিলেন কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাছে, গিয়ে বলেছিলেন, ‘জীবনানন্দ দাশের ওপরে স্মরণসংখ্যা পত্রিকা বের করব, লেখা দেবেন।’ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘যিনি কবি নন, তাঁর ওপরে স্মরণসংখ্যা বের করার দরকার কী!’ অর্থাৎ মান যাচাই কমিটির হাতে দেওয়া হলে জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই কোনো দিনও প্রকাশিত হতো না। আমরা কবি জীবনানন্দ দাশের অমিত প্রতিভাকে আঁতুড়ঘরেই গলা টিপে মারতাম।

৩ নম্বর কারণ হলো, যেকোনো বিষয়ে লাইসেন্স-পারমিট দেওয়া মানে দুর্নীতি। তদবির-ঘুষ-ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। আরেকটা বিষয় আছে। তা হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। আমেরিকায় বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের অধিকার আছে অশ্লীল জিনিস প্রকাশ করার, এমনকি মিথ্যা খবরও প্রকাশ করার। কেন এটা বলা হয়? কারণ, অশ্লীল বা মিথ্যা প্রকাশ করা যাবে না, এই ক্ষমতা দেওয়া হলে কর্তৃপক্ষ ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করবে। তারা অশ্লীলতার অজুহাতে, মিথ্যার অজুহাতে শ্লীল বা সত্য প্রকাশেও বাধার সৃষ্টি করবে। এই সুযোগ কাউকে দেওয়া যাবে না। নতুন কবির বা লেখকদের লেখা প্রকাশিত হতে দিতে হবে। সাধারণত যঁারা নতুন, বিদ্রোহী, নিরীক্ষাধর্মী, তঁাদের লেখার গুরুত্ব বয়স্করা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। স্যামুয়েল বেকেটের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকেরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ৪০ বার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলার বিদ্বৎসমাজ লেখক হিসেবে গ্রহণ যত না করেছিল, আঘাত দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। তাই ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর শান্তিনিকেতনে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনার জবাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে, তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল তা আমি নিঃশব্দে বহন করেছি।…আজ আপনারা আদর করে সম্মানের যে সুরাপাত্র আমার সম্মুখে ধরেছেন, তা আমি ওষ্ঠের কাছে ঠেকাব, কিন্তু এ মদিরা আমি অন্তরে গ্রহণ করতে পারব না।’ কাজেই সমকালে নিন্দিত লেখা বা প্রত্যাখ্যাত লেখা ভবিষ্যতে নন্দিত এবং আদরণীয় বলে বিবেচিত হতেই পারে।

তাহলে কি মানহীন বই প্রকাশিত হতেই থাকবে? এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে প্রকাশকদের। আমাদের বেশির ভাগ প্রকাশকের দু-তিনজন বিক্রেতা কর্মচারী ছাড়া আর কোনো কর্মী নেই। কোনো সম্পাদনা পরিষদ নেই। একটা পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে গেলে এটা মানসম্মত হলো কিনা যাচাই-বাছাই করার কোনো বিভাগ নেই। তারপর পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করার কোনো সম্পাদক নেই। উন্নত দেশের প্রকাশনালয়ে পেশাদার সম্পাদকেরা বইটা বারবার পড়ে নির্ভুল করার চেষ্টা করেন। এঁরা কতবার যে সম্পাদনা করেন, ইয়ত্তা নেই। এঁদের ফ্যাক্ট চেকার সম্পাদক আছে, এমনকি বিদেশে বইয়ের এজেন্টরা বড় বড় লেখকের কাহিনির মোড় বদলানোর পরামর্শও দিয়ে থাকেন। ফলে প্রতিটা বই হয় নির্ভুল ও সুসম্পাদিত। সারা পৃথিবীতেই পেইড পাবলিকেশন বা টাকার বিনিময়ে পুস্তক প্রকাশের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও পাণ্ডুলিপিটা ঠিকঠাকভাবে সম্পাদিত ও সংশোধিত হয়। আর ম্যারাডোনা বা পেলের বই ম্যারাডোনা বা পেলে লেখেন না। পেশাদার লেখকেরা লেখেন। পেশাদার সম্পাদকেরা সম্পাদনা করে দেন। আমাদের দেশে ‘পেশাদারি’ কথাটার কোনো জায়গাই নেই। দুর্বল লেখা সারা পৃথিবীতেই প্রকাশিত হয়। একজন করে রবীন্দ্রনাথ, মানিক, বিভূতি তো বছরে বছরে জন্মাবেন না। কিন্তু ভুলে ভরা বই বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও বের হয় বলে আমার জানা নেই।

এখন তো আরেক সমস্যা। আগে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক কবিতা ডাকযোগে পাঠাতেন কলকাতায় বুদ্ধদেব বসুর কাছে। বুদ্ধদেব বসু চিঠি লিখতেন, কবিতা মনোনীত হয়েছে, কবিরা জানতেন, তাঁরা কবিই হয়ে উঠছেন। এখন সরাসরি ফেসবুকে লিখে প্রকাশ করে ১০০টা লাইক পেয়ে আমি ভাবি যে আমি বড় কবি হয়ে গেছি। আমি বলি, পাড়ায় ভালো ক্রিকেট খেললেই কেউ জাতীয় দলে একবারে সুযোগ পায় না, হাতের কাঁচি ভালো চলে বলেই কেউ সার্জিক্যাল অপারেশন করতে পারবে না। তাকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পেতে হবে। কিন্তু লেখালেখি যে কেউ করতে পারেন। পারেন বটে, কিন্তু লেখাও শিখতে হয়। অন্য অনেক কাজের মতো লেখালেখির কাজটাও শিখে আসতে হয়, সাধনা করতে হয়। তেমনি প্রকাশনার কাজটাও শিখে আসা উচিত। বইয়ের ফন্টের সাইজ কী হবে, পাতার সেলাইয়ের পাশে কত জায়গা ফাঁকা থাকবে, বিপরীত পাশে কত, প্রতিটির নিয়ম আছে। আমরা কিছু না জেনে লেখক হয়ে বসে আছি, প্রকাশক হয়ে বসে আছি। আমি প্রকাশক ভাইদের বলব, দয়া করে পেশাদার হোন, পেশাজীবী নিয়োগ করুন।

আর শেষ কথাটা বলব সরকারকে। গত বছর করোনার কারণে বইমেলায় সব প্রকাশকের লোকসান হয়েছে। এটা পূরণের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বই সরকার কিনে দেশের সব পাঠাগার, স্কুল, কলেজে পাঠাক। তাতে একজন প্রকাশক গড়ে এক কোটি টাকার বই বিক্রি করতে পারবেন। লাখ ত্রিশেক টাকা লাভ হবে। তা দিয়ে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ-ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন তাঁরা দিতে পারবেন। শুধু দেখতে হবে, মানসম্পন্ন বই যেন প্রকৃত প্রকাশকদের কাছ থেকে কেনা হয়! এই টাকা নিয়ে যেন হরিলুট না হয়!

নতুন প্রজন্ম বই পড়তে চায়। দেশের প্রায় শতভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। অনেকেই জিপিএ-৫ পায়। কৃষকের ছেলে, শ্রমিকের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। সবার চোখে স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই মা-বাবা চান তাঁদের ছেলেমেয়ে পড়ার বইয়ের বাইরের বইও পড়ুক। তাই তাঁরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বইমেলায় আসেন। স্কুলে লাইব্রেরি ক্লাস, লাইব্রেরি শিক্ষক এবং লাইব্রেরিতে মানসম্পন্ন বই চাই-ই চাই। তাহলে বাংলাদেশ কেবল মধ্য আয়ের দেশ বা উচ্চ আয়ের দেশ হবে তা-ই নয়, বাংলাদেশ হবে জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত দেশ। হবে সম্প্রীতিময় সুসভ্য দেশ।

● আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

সূত্রঃ প্রথম আলো