সড়কে আহতরা চিৎকার করছিলেন, দ্রুত হাসপাতালে নিলে হয়তো অনেকে বাঁচতেন

প্রথম আলোঃ
সবজিবোঝাই পিকআপ নিয়ে দ্রুতগতিতে কক্সবাজারের দিকে ছুটছিলেন চালক সহিদুল ইসলাম ওরফে সাইফুল (২২)। পিকআপটির মালিকের ছেলে তারেক ও ভাগনে রবিউলও ওই সময় গাড়িতে ছিলেন। ভোর পাঁচটার দিকে পিকআপটি কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট নার্সারি গেট এলাকার বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম করছিল। তখন ঘন কুয়াশা আর চারদিকে অন্ধকার ছিল।

বাঁক অতিক্রম করতেই চালক দেখলেন, সড়কের একপাশে সাদা কাপড় মোড়ানো ৮-৯ জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। ততক্ষণে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের উপায় ছিল না। দ্রুতগতির পিকআপটি মুহূর্তেই চাপা দেয় সড়কের পাশে দাঁড়ানো লোকজনকে।

৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতাল-সংলগ্ন সড়কে পাঁচ ভাই নিহতের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন চালক সহিদুল ইসলাম। আজ সোমবার সকালে তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা।

জিজ্ঞাসাবাদে সহিদুল বলেন, দুর্ঘটনার পর ১০-২০ গজ দূরে গিয়ে তিনি গাড়িটি থামান। এ সময় সড়কের ওপর পড়ে থাকা আহত ব্যক্তিরা চিৎকার করছিলেন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে হয়তো অনেকে প্রাণে বাঁচতেন। তিনি গাড়ি থেকে নামতে চাইলেও বিপদের আশঙ্কা দেখে গাড়িতে থাকা মালিকের ছেলে তাঁকে নামতে দেননি। পরে তিনি দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে তিন-চার কিলোমিটার দূরে রংমহল এলাকার একটি জঙ্গলে যান। সেখানে পিকআপ থামিয়ে তাঁরা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর মালিক তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে বললে তিনি ঢাকায় পালিয়ে যান।

পুলিশ জানায়, ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে সহিদুলকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। সহিদুল বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের সাপেরগাড়া এলাকার আলী জাফরের ছেলে।

মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ ও পুলিশ পরিদর্শক শেফায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পিকআপচালক সহিদুলকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা সম্পর্কে চালক সহিদুল আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এসব গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না।

শেফায়েত হোসেন বলেন, পিকআপ ভ্যানটি পুলিশের হেফাজতে আছে। গাড়ির মালিকসহ অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনার পর থেকে তাঁরা আত্মগোপনে আছেন।

দুর্ঘটনাকবলিত ওই পিকআপের মালিক চকরিয়ার পূর্ব বড়ভেওলা গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল করিম। তিনি পেশায় সবজি ব্যবসায়ী। তিন বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস ও রুট পারমিট নিয়ে পিকআপটি চলাচল করছিল। চালক সহিদুলের ড্রাইভিং লাইসেন্সও ছিল না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চকরিয়ার মালুমঘাট হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক আবুল হোসেন বলেন, চালক সহিদুল জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য দিচ্ছেন। কিন্তু এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।

৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে পিকআপের চাপায় একসঙ্গে পাঁচ ভাই নিহত হন। তাঁরা হলেন ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট হাসিনাপাড়ার সুরেশ চন্দ্র সুশীলের পাঁচ ছেলে অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫), চম্পক সুশীল (৩০) ও স্মরণ সুশীল (২৯)। এ ঘটনায় আরও তিন ভাইবোন আহত হন। গত ৩০ জানুয়ারি সুরেশ চন্দ্র সুশীলের মৃত্যু হয়। ১০ দিন পর মন্দিরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁর ৯ ছেলেমেয়ে হেঁটে বাড়িতে ফিরছিলেন। এ সময় পিকআপচাপায় ঘটনাস্থলে চারজন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেকজনসহ পাঁচ ভাইয়ের মৃত্যু হয়।