কক্সবাজার ডিসি কলেজ এবং কিছু মধুময় স্মৃতি

মোঃ শাজাহান আলীঃ
কক্সবাজার ডিসি কলেজের প্রথম ব্যাচের এইচএসসি পরিক্ষার ফলাফল দেখে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। পিছনে ফেলে আসা নানা স্মৃতি উকি দিল মনের অজান্তে। এইতো সেই রোদ্রোজ্জ্বল দিন যে দিনে বল্লাপাড়ার এক তেঁতুল তলায় তার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। শুরুর দিনগুলো ছিল শত প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতায় ভরপুর। আর সেই প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই কক্সবাজার ডিসি কলেজের পথচলা। কক্সবাজার ডিসি কলেজ নামের সেই আলোকবর্তিকা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার মনের ভেতর যে আত্মবিশ্বাস প্রতিস্থাপন হয় তা আমার জীবনের পরম পাওয়া।

কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ১০ এর অধিক মেঘা প্রকল্প সহ ছোট-বড় শতাধিক প্রকল্পের কাজ চলমান। অদূর ভবিষ্যতে কক্সবাজার বাংলাদেশের উন্নয়নের হাবে পরিনত হতে যাচ্ছে। কৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক দিক বিবেচনায় কক্সবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোর তুলনায় পর্যটন নগরী কক্সবাজার শিক্ষার হারের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। তাই শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন প্রজন্মকে আগামীর উপযোগী করে গড়ে তুলতে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই ছিল কক্সবাজার ডিসি কলেজের উদ্দেশ্য। সম্পূর্ণ অলাভজনক এবং সকল ধরনের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উর্ধ্বে একটি বিশেষায়িত কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। এই তাগিদ ও দায়িত্ববোধ থেকে কক্সবাজার ডিসি কলেজের যাত্রা শুরু। এই কলেজের স্বপ্নদ্রোষ্ঠা, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রাক্তন জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার জনাব মো: কামাল হোসেন। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ এই কলেজের পথচলার একজন সারথি হতে পেরে। কলেজটির প্রথম ভারপ্রাপ্ত অধ্যাক্ষ হিসেবে কাজ করার এই দুর্লভ সুযোগটি আমার জীবনের একটি বড় অর্জন।

গত ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ খ্রিঃ তারিখ কক্সবাজার ডিসি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন কক্সবাজার জেলার কৃতি সন্তান প্রাক্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব জনাব মোহাম্মদ শফিউল আলম। লক্ষণীয় বিষয় সেই ভিত্তিপ্রস্তরের গৌরবোজ্জ্বল অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জনাব মোঃ কামাল হোসেনের উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছিলেন। আমরা চেয়েছিলাম ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানটি সুবিধাজনক কোন সময়ে পরিবর্তন করতে। কিন্তু তিনি রাজী হননি। তিনি কোনভাবেই পূর্বনির্ধারিত ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানটি বিলম্বিত করেননি। বরং তিনি কলেজটির পথচলাকে সেইদিন প্রাধ্যন্য দিয়েছিলেন। তাইতো সেই দিনটিতে স্যারকে ছাড়াই আমাদের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে হয়েছিল। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের সেই শুরু থেকে অদ্যাবধি এই কলেজটি স্থাপনে কক্সবাজারের সর্বস্তরের মানুষের অকুন্ঠ সমর্থন আমাদের অনুপ্রেরণা যোগিয়েছিল। তাইতো সকল প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই কক্সবাজার ডিসি কলেজের দীপ্তপথে পদচারনা শুরু।

                                      শ্রেণিতে পাঠদান করছেন কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন।

২০১৯ সালের ২০ শে এপ্রিল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেই একই বছরের জুন-জুলাই সেশনে ক্লাস শুরুর দুঃসাহসিক স্বপ্ন আমরা দেখলাম। তাই কয়েকটি উদ্যোগ তাৎক্ষনিক নিতে হয়েছিল। সময়ের সংক্ষিপ্ততা বিবেচনা করলে স্বপ্নাতীত। কলেজ ক্যাম্পাসে পরিত্যক্ত দুটি ভবন অপসারণ করতে হবে এবং ক্লাসরুমের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত করতে হবে, পাঠদানের অনুমতি ও ইআইআইএন নম্বর গ্রহণ করতে হবে এবং শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। প্রত্যেকটি কাজই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কোনটা থেকে কোনটা শুরু করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। সেই দিনও কেউ এই কলেজের নাম জানতো না। তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে কিভাবে পৌছানো যাবে এই চিন্তা সারাক্ষণ আমাদের মাথায় ঘুরপাক খেতো। অথচ সৃষ্টিকর্তার অপার আর্শীবাদ আমরা প্রত্যেকটা কাজ সময়ের সাথে সাথে সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম।

কক্সবাজার ডিসি কলেজের এই জায়গাটিতে তিনটি পরিত্যক্ত ভবন ছিল। একটি তিনতলা আর দুটি দুইতলা। সকল নিয়মকানুন মেনেই আমরা ভবনগুলি অপসারণ করতে সক্ষম হই। জেলা কনডেমনেশন কমিটির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্তের মাধ্যমে পরিত্যক্ত ঘোষণার প্রস্তাব গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে নিয়ম মাফিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে আমি আর কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত যোগদান করি। এই ধরণের ভবন অপসারণের প্রস্তাব প্রেরণের পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার বা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর ছিল না। বলতে গেলে জেলা কনডেমনেশন কমিটির আয়োজন, কার্যবিবরণী প্রস্তুত, মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ এবং অনুষ্ঠিত সভায় যোগদান এটাই আমাদের প্রথম অভিজ্ঞাতা। মজার বিষয় ছিল পুরো প্রক্রিয়াটি যথাযথ না হওয়ায় ভবন অপসারণের প্রস্তাবটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ফেরত প্রদান করে এবং নতুনভাবে পুনরায় প্রস্তাব প্রেরণের অনুশাসন প্রদান করেন। তবে যেদিন আমরা সভায় যোগদান করি সেইদিন এধরণের প্রস্তাবের নমুনা গণপূর্ত মন্ত্রণালয় হতে পাই যা আমাদের পরবর্তীতে প্রস্তাব প্রেরণে সহজ হয়। পুনরায় জেলা কনডেমনেশন কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত, কক্সবাজার হতে প্রস্তাব তত্ত্বাবধায় প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় হয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করি। এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়েই নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিসের মাধ্যমে ভবন অপসারনের নিলাম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দ্রূততম সময়ের মধ্যে ভবন গুলো আমরা অপসারণ করি। কলেজ ক্যাম্পাসের নির্মাণ কাজ এবং ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা কৃতজ্ঞতা চিত্রে স্মরণ করতে হবে। শুরুতে টিন শেড ভবন নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়। ভবনের নির্মাণ সামগ্রী কক্সবাজারের শিক্ষানুরাগী ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের হতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে জেলা আওয়ামীলীগের প্রাক্তণ সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র জনাব মো: মুজিবুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সদর, কক্সবাজার মাহফুজুর রহমান এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রামু, কক্সবাজার প্রণয় চাকমা এর আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। একটি কলেজের জন্য কক্সবাজারবাসীর এই সহযোগিতা, ভালোবাসা আর পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা অভিভূত হয়েছিলাম। আর এতেই আমরা জুলাই ২০১৯ সেশনে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য দুঃসাহসিক স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।

জুলাই ২০১৯ সেশনে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠদানের অনুমতি, ইআইআইএন নম্বর, শিক্ষক নিয়োগ, ভর্তি বিজ্ঞপ্তি আর কলেজ পরিচিতি। প্রায় একই সাথে কাজ গুলো হাতে নেওয়া হয়েছিল। এখন চিন্তা করলে গা শিউরে উঠে কিভাবে সম্ভব হয়েছিল একসাথে এতগুলো কাজ। দৈনন্দিন দাপ্তরিক দায়িত্ব আর কক্সবাজারের মতো শহরে লাগাতার প্রটোকলের ফাঁকে এই কাজগুলো আমরা করতাম সন্ধার পর। প্রায় প্রতিদিন বাঙলোতে ডিসি স্যারের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতাম। জেলা প্রশাসনের অগ্রজ-অনুজ সকল অফিসারের সহযোগিতা ছিল। বিশেষ করে ডিডিএলজি শ্রাবস্তী রায় এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জনাব মোহাম্মদ আশরাফুল আফসারের অবদান অনস্বীকার্য। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জনাব মাসুদুর রহমান মোল্লা, সারওয়ার কামাল আর আমিন আল পারভেজ এর অনবদ্য সমর্থন আর আন্তরিকতা ছিল প্রশংসনীয়।

সে বছর কক্সবাজার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আমরা কক্সবাজার জেলার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জিপিএ ফাইভ প্রাপ্ত সকল শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা প্রদান করি। পৃথক দুই দিনে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। তাদের জন্য সনদ প্রস্তুত, ক্রেস্ট, ফুল ও আপ্যায়ন কোন কিছুর কমতি ছিল না। জিপিএ ফাইভ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের সকল অফিসার গ্রুপে ভাগ হয়ে সকলকে ফোন করে জেলা প্রশাসনের নিমন্ত্রণ জানায়। উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ তাঁর নিজ উপজেলার সকল জিপিএ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জেলায় প্রেরণ করতে যানবাহন সুবিধা প্রদান করেছিল। আমরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটিকে জাঁকজমক করতে পেরেছিলাম। শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা জানাতে কক্সবাজারের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও গুণিজনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। আমার বিশ্বাস সেই সংবর্ধনা আমাদের শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের দিগন্তকে প্রসারিত করেছিল। তবে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের পিছনে কিঞ্চিত স্বার্থ জড়িয়ে ছিল। স্বার্থ ছিল এই জিপিএ ফাইভ প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে কক্সবাজার ডিসি কলেজের নিমন্ত্রণ পৌছে দেওয়া। বিশেষ করে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে এবং শিক্ষার্থীদের কাছে একটি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর সংবাদ পৌছে দেওয়াই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। আর সেই উদ্দেশ্য আমরা অনেকটা পুরণ করতে সক্ষম হয়। এই ধরণের মহতীকাজে এই ধরণের কিছু স্বার্থ থাকলে থাকুক না সেই স্বার্থ আমাদের সবার মাঝে।

সময়ের স্বল্পতা বিবেচনায় স্কুলের পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্তি আমাদের উদ্দীপনা জোগায়। জুলাই ২০১৯ সেশনে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে পাঠদানের অনুমতি অপরিহার্য ছিল। তাই কালক্ষেপন না করেই ডিসি স্যারের পরামর্শে বোর্ডে আবেদন করি। বোর্ড হতে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ, মন্ত্রণালয় হতে বোর্ডকে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ, বোর্ড এর প্রতিনিধিদের কক্সবাজার ডিসি কলেজ পরিদর্শন, রিপোর্ট পেশ, বোর্ড হতে রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ এবং মন্ত্রণালয় হতে পাঠ দানের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় সমাগত হয়ে যায়। তাই আমরা কক্সবাজার ডিসি কলেজের নামে যথাসময়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারিনি। এই ধরণের অনিশ্চয়তা এবং সময়ের দোদল্যমান পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা হই। তবে আমাদের সহযোগিতা করেছিল কক্সবাজার হার্ভাড কলেজ। কক্সবাজার হার্ভার্ড কলেজের শিক্ষক জনাব শফিউল আলমের আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ হয়েছিল। সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই ২৬ জানুয়ারী, ২০২০ খ্রিঃ তারিখ আমরা পাঠ দানের অনুমতি পাই। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় ২৮ জানুয়ারি, ২০২০ খ্রিঃ তারিখ কক্সবাজার ডিসি কলেজের নামে ইআইআইএন নম্বরের অনুমতি পাই। অবিশ্বাস্য কম সময়ে কলেজের পাঠদানের অনুমতি ও ইআইআইএন নম্বর প্রাপ্তি আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। এত কম সময়ে মন্ত্রণালয় হতে পূর্বে কোন কলেজের পাঠ দান ও ইআইআইএন নম্বরের অনুমতি পেয়েছে বলে আমার জানা নাই। তবে দুই জন ব্যক্তির নাম কৃতজ্ঞতা চিত্রে আমি স্মরণ করি। চট্রগাম বোর্ডের সহকারী কলেজ পরিদর্শক জনাব আবুল কাশেম মোঃ ফজলুল হক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব স্যারের একান্ত সচিব ও উপসচিব জনাব কাজী শাহজাহান। চট্রগাম বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক জনাব আবুল কাশেম তাঁর নিজ এলাকা রামু উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল গর্জনিয়ায় শুধুমাত্র ব্যক্তি উদ্যোগে একটি মাধ্যমিক স্কুল গড়ে তোলেন। তার এ উদ্যোগটি অসাধারণ। অন্যদিকে সেই সময়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব স্যারের একান্ত সচিব (বর্তমানে যুগ্মসচিব) জনাব কাজী শাহজাহান স্যারের কাছে পাঠদানের অনুমতি ও ইআইআইএন নম্বর প্রাপ্তিতে একাধিক বার গিয়েছিলাম। স্যারকের অনেক বিরক্ত করেছিলাম। তিনি আমাদের প্রত্যেকটি কাজে ছিলেন আন্তরিক। তাদের সহযোগিতা কক্সবাজার ডিসি কলেজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরেকটি চ্যালেঞ্জিং কাজ আমাদের করতে হয়েছিল। বলতে গেলে চাল নাই চুলা নাই এই ধরনের একটি কলেজের মেধাবী ও উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া ছিল দুরুহ। তা সত্ত্বেও আমরা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলাম। প্রত্যাশার চেয়ে আমরা বেশি সাড়া পেয়েছিলাম। এক শুক্রবার সকালে শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বোর্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসনের সকল বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কড়া নজরদারিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষার ফলাফল দুপুরের মধ্যে আমরা নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করি এবং সে দিনেই আমরা মৌখিক পরীক্ষা শুরু করি। লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষাটি সম্পন্ন ক্রটিমুক্ত ছিল। একাধিক তদবির ছিল। আমরা মেধার ক্ষেত্রে কোন আপোষ করেননি। তাই কোন ধরনের তদবির ছাড়া শুধুমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই আমাদের শিক্ষকদের নিয়োগ সম্পন্ন হয়। এর জন্য আমরা গর্ব করি। অদ্যবধি এই শিক্ষকরাই কক্সবাজার ডিসি কলেজটিকে আগলে রেখেছে।

কক্সবাজার ডিসি কলেজের একাদশ শ্রেণীর প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান ২০১৯ কে ঘিরে সেই স্মৃতি আজও অমলিন। স্বপ্নের শত সহস্র রঙ মেখে সেই দিন শিক্ষার্থীরা নবীনবরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিল। সেই দিন শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে উদ্বেলিত হয়েছিল সৃষ্টির বারতা আর অজানাকে জয় করার তীব্র ইচ্ছা। নবীনবরণ ও ক্লাস শুরুর পূর্বে আমাদের বড় ধরনের হোঁচট খেতে হয়েছিল। কেননা তখন পর্যন্ত আমাদের ভবন প্রস্তুত করতে পারেনি। টিন শেডের আজকের মূল ভবনটির নির্মাণ কাজ খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। তাছাড়া পরিত্যক্ত ভবন অপসারণ করা হয়নি। তাহলে কোথায় আমরা নবীনবরণ অনুষ্ঠান করব আর কিভাবে ক্লাস শুরু করব? এ নিয়ে আমরা বেশ চিন্তিত ছিলাম। এ ধরণের কঠিনতম মুহূর্তে আমরা একটা উপায় বের করেছিলাম। ডিসি স্যারের পরামর্শে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে কক্সবাজার ডিসি কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহার শুরু করি। কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অডিটরিয়াম এর পিছনে পৃথক ভবনে কয়েকটা জরাজীর্ণ রুমকে সংস্কার করি। প্রথম বছরে শুধুমাত্র বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষার্থী থাকায় আমাদের দুটি ক্লাসরুম প্রয়োজন ছিল। অন্তর্বতীকালীন সময়ের কথা বিবেচনা করে আমাদের প্রয়োজন ছিল শিক্ষকদের জন্য একটি কক্ষ এবং অফিস হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি কক্ষ। অফিস কক্ষটি বেশ বড় আকৃতির হওয়ায় এর একপাশে কম্পিউটার ল্যাব বানানো হয়েছিল। ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও বেশ পরিপাটি ছিল আমাদের আয়োজন। নতুন শিক্ষার্থীদের আগমনে মুখরিত হয়েছিল সেই ক্যাম্পাস। সেই ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান। কলেজের সকল শিক্ষক ও স্টাফ নিয়োগ সম্পন্ন হলেও অধ্যক্ষ নিয়োগ পেন্ডিং ছিল। তাই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে সার্বিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্রাক্তন জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শাহজাহান। আজ তিনি বেঁচে নাই। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তিনি আমাদের সকল মানবিক কাজে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর বক্তব্যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সালের সাথে মিল রেখে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭১ এর মধ্যে সীমিত করতে পরামর্শ দেন। কাকতালীয়ভাবে বা আল্লাহর অশেষ কৃপায় প্রথম বর্ষের ৭১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কক্সবাজার ডিসি কলেজের পথচলা শুরু করে। বাঙালী জাতির স্বাধীকারের ইতিহাস জানতে আর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে সমুজ্জ্বল রাখতে ডিসি স্যার দুইটি ক্লাসরুমের নামকরণ করেন বাহান্ন আর একাত্তর।

হাঁটিহাঁটি পাপা করে কক্সবাজার ডিসি কলেজ স্বাগৌরবে তার পদচারণা শুরু করে। কলেজের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থী আমাদের সন্তানতুল্য। এর জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তাদের মেধা ও শ্রম জড়িয়ে রয়েছে। বিষয় ভিত্তিক ক্লাসের জন্য আমাদের অনুজ কর্মকর্তা বা ম্যাজিস্ট্রেটরা সময় করে তাদের সাথে কথা বলতেন এবং ক্লাস নিতেন। ডিসি স্যার প্রতি শনিবার ১ ঘন্টা তাদের সাথে সময় দিতেন। সেই সময় গুলোতে সকল শিক্ষকসহ আমরা উপস্থিত থাকতাম। আমরা সেই ১ ঘন্টাকে ডিসি সেশন বলতাম। সেই সেশনে তাদের ভাল মন্দ ও লেখাপড়ার খবর নেওয়া হতো। প্রত্যেকটি ক্লাস টেস্টের মূল্যয়ন করা হতো। যারা ভালো করত তাদের আরো ভাল করতে উৎসাহ দেওয়া হতো। যারা খারাপ করত তাদেরকে কিভাবে উন্নতি করানো যায় তার দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের সেই প্রানোচ্ছল সময়ে ব্যবচ্ছেদ ঘটলেও অনলাইনে থেমে থাকেনি তাদের সাথে আমাদের পাঠদান ও যোগাযোগ। এরমধ্যে মুল ক্যাম্পাস প্রস্তুত হয়ে যায়। করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে গেলে কক্সবাজার ডিসি কলেজের তেঁতুল তলা ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে। প্রাণ ফিরে পায় কক্সবাজার ডিসি কলেজের মুল ক্যাম্পাসের সবুজ চত্ত্বর।

সকল সংকীর্ণতা, পংকিলতা আর সীমাবদ্ধতাকে জয় করে কক্সবাজার ডিসি কলেজ স্বমহিমায় মহীরুহ ধারণ করবে। আর এ কলেজের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাদের জীবনকে রাঙিয়ে দিবে। প্রকৃত মানুষ হয়ে সমাজকে আলোকিত করবে। একদিন নিজেদের আত্মসম্মান আর আত্মমর্যাদা সমুন্নত রেখে কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে দেশ ও জাতির কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণে অবদান রাখবে। এই রইল আমার প্রত্যাশা। দায়িত্ব গ্রহণের পর হতেই নিষ্ঠার সাথে কাজ করছেন বর্তমান অধ্যক্ষ জনাব মোঃ ইব্রাহিম হোসেন। কক্সবাজার ডিসি কলেজের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন প্রাক্তন জেলা প্রশাসক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোঃ কামাল হোসেন। আর কামাল স্যারের পর যোগ্য অভিভাবক হয়ে কক্সবাজার ডিসি কলেজকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার ডিসি কলেজের সভাপতি মোঃ মামুনুর রশিদ। স্যারদের প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা আর বিনম্র শ্রদ্ধা। কক্সবাজার ডিসি কলেজের জন্য রইল আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে ভালোবাসা।

তবে ব্যথিত হই যখন মনে পড়ে কহিনুর আক্তারের কথা। কলেজের শুরুতেই অফিস সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। অত্যন্ত মনোযোগী ও পরিশ্রমী একজন সহকর্মী ছিলেন। আমি নিজ চোখে দেখেছি কলেজের শুরুতে কি ধকলটাই না গিয়েছিল তার উপর দিয়ে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস কোভিড আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যবরণ করেন। রেখে যান ফুটফুটে দুইটি ছোট সন্তান। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আল্লাহ তাঁকে বেহেশতবাসী করুন। কহিনুর আক্তার ছিলেন ডিসি স্যারের সিএ মিজানুর রহমানের সহধর্মীনি। তারা দুই জনই সৎ ও নিষ্ঠাবান। তাঁর রেখে যাওয়া দুই ছোট সন্তানের জন্য শুভ কামনা রইল।

মোঃ শাজাহান আলী, সিনিয়র যুগ্ন সচিব, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। কক্সবাজারের সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।