প্রাণঘাতী লড়াইয়ে গৃহযুদ্ধে মিয়ানমার

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
বছরের পর বছর ধরে সামরিক শাসনের অধীনে থাকার অভিজ্ঞতা মিয়ানমারবাসীর রয়েছে। তবে গত এক বছরের জান্তা শাসনে দেশটিতে রক্ত ঝরেছে প্রচুর। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তাবিরোধী তুমুল বিক্ষোভ, বিশেষত তরুণদের প্রতিবাদ, রক্তপাত মিয়ানমারকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অনেকে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন।

দেশটির একটি মানবাধিকার সংগঠনের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি আজ মঙ্গলবার জানিয়েছে, মিয়ানমারে গত এক বছরের সংঘাতে ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই জান্তাবিরোধী। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি–হামলায় তাঁরা প্রাণ হারান। এক বছরে দেশটিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ। আর জান্তার হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মিয়ানমারে ১৬৮ সেনা ও পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান মিশেল ব্যাশেলেট বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মিয়ানমারের এখনকার পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। সংঘাতকবলিত দেশটিতে শান্তি ফেরাতে ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

জান্তার বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে মিয়ানমারের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠনগুলো। জান্তা সরকারকে রুখতে ক্ষমতাচ্যুত আইনপ্রেণতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরাও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন। মিয়ানমারে রাজনীতি–সচেতন তরুণদের মধ্যে পিডিএফের মতো সংগঠনের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জান্তার ওপর গেরিলা হামলার ঘটনাও।

মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী মনোভাব জোরদারের প্রসঙ্গে মিশেল ব্যাশেলেট সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমরা যদি জান্তার বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারি, তাহলে দেশটির পরিস্থিতি দ্রুত সিরিয়ার মতো হতে পারে।’

সেনা অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছে জান্তাবিরোধীরা। মান্দালয় ও বাণিজ্যিক শহর ইয়াঙ্গুনে মঙ্গলবার বিকেলে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ‘করতালি’ কর্মসূচিতে অংশ নেন মানুষ। মান্দালয়ের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেন, ‘আমার প্রতিবেশীরাও জান্তার বিরুদ্ধে এভাবেই প্রতিবাদে শামিল হন।’

অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনে দেশজুড়ে দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছিল জান্তা প্রশাসন। তবে মঙ্গলবার মান্দালয়সহ মিয়ানমারের বড় শহরগুলোয় বেশির ভাগ দোকান বন্ধ ছিল। রাস্তাঘাট ছিল প্রায় ফাঁকা। মহাসড়কগুলোয় সেনাদের টহল দিতে দেখা গেছে। ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের সড়কে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হয়ে জান্তাবিরোধী ফ্ল্যাশমব করেন। তবে এদিন দেশটির কোথাও সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।

অভ্যুত্থানের বর্ষপূতিতে সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইটকে বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) অবৈধ উপায়ে জয় পেয়েছিল। এ জন্য সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এ সময় তিনি দেশে শান্তি ফেরাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন।

দিনটি উপলক্ষে জান্তার তথ্য বিভাগের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে জান্তার পক্ষে বেশ কিছু মানুষকে মিছিল করতে ও স্লোগান দিতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটি মিয়ানমারের কোন অঞ্চলে ও কবে ধারণ করা হয়েছে, তা জানানো হয়নি।

এদিকে অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জান্তার অর্থ ও অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মিয়ানমারের জান্তা এক বছর ধরে নিজ দেশের জনগণের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করে আসছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এরপরও জান্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জান্তার অর্থ ও অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান জরুরি।

সূত্রঃ প্রথম আলো