মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞায় সমন্বিত উদ্যোগ চান জাতিসংঘ দূত

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ।

রোববার ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সেনাবাহিনীর অর্থের উৎস চিহ্নিত করার মাধ্যমে তা সমন্বিতভাবে বন্ধ করে দিতে পারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

”তবে, আমি জানি পরবর্তী প্রশ্ন সম্ভবত আসবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, যেসব দেশ কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, রাজস্ব আয়ের পথ এবং অর্থায়ন বন্ধ করতে চায়, তারা মিলে এ কাজ করতে পারবে না।”

অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মিয়ানমারে অস্ত্র যাওয়া বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে, চলুন তাই করি। “নিরাপত্তা পরিষদে যদি এটাও সম্ভব না হয়, তাহলে যেসব দেশ এই নিষেধাজ্ঞা চায়, তারা মিলেও সমন্বিতভাবে করতে পারে। এভাবে মিয়ানমারের উপর চাপ বজায় রাখা যায়।”

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ক্ষমতাদখলকে এখন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পথের কাঁটা হিসাবে দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী।

এর আগে থেকে প্রত্যাবাসনের পক্ষে কথা বলে আসলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিক থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে বাংলাদেশে ছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।

আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি।

২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইন রাজ্যের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরে ফিরতে রাজি হননি রোহিঙ্গারা।

প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে গত সোমবার এক সপ্তাহের বাংলাদেশ সফরে আসেন জাতিসংঘের মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার টম অ্যান্ডুজ।

ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনসহ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি কক্সবাজার ও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসতিও পরিদর্শন করেন তিনি।

রোববার সফরশেষে ঢাকা ছাড়ার আগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সঙ্কটের কারণ ও সমাধান বাংলাদেশে নয়, এসব মিয়ানমারের কাছেই।

”এ সঙ্কটের আরও জোরালো, আরও সমন্বিত আন্তর্জাতিক সাড়াদানের লক্ষ্যে আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা করব। এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত থাকবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ‍উপর চাপ প্রয়োগ এবং এ সঙ্কটের জন্য সামরিক জান্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে বাস্তবিক পদক্ষেপ।”

ভাসানচরের নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চলাচলের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সেখানে নেওয়ার ক্ষেত্রে জোর করার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন অ্যান্ড্রুজ।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে আমার কাছে স্পষ্ট, তাদের বেশিরভাগের মূল ভূখণ্ডের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখার করার ও ভ্রমণের সুযোগ নেই। প্রত্যেকে এটাকে বড় করে দেখিয়েছে।

সম্প্রতি তাদের ৬০ জনের একটি দলকে কক্সবাজারে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া সুযোগ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “স্বাধীনভাবে চলাচলের মূলনীতি বাস্তবায়নের জন্য ওই দ্বীপ থেকে মূল ভূখণ্ডে আসা-যাওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য, নিয়মিত ও বিনামূল্যের পরিবহন সুবিধা থাকতে হবে।”

’হত্যা-অপহরণে আরসা’, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাকচ

কক্সবাজারের ক্যাম্পে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর পরিবার ও তার সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা তুলে ধরে জাতিসংঘের বিশেষ দূত বলেন, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা তাকে খুন করে বলে ধারণা করা হয়।

”আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, আরসা রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ ও ভয় দেখিয়ে আসছে।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তুলে ধরার কথা উল্লেখ করে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। ওই আলোচনার বিস্তারিত আমি বলতে চাই না।

”তদন্ত চলছে। ক্যাম্পের মানুষদের উদ্বিগ্ন করার মতো বিভিন্ন ধরনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড চলার বিষয়ে এক ধরনের জানাশোনা আছে। এগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা দরকার।”

এ বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, “উনি আরসার কথা বলেছেন, আমরাতো আরসা বাংলাদেশে দেখিনি কখনও।

”উনি যদি চিহ্নিত করতে পারেন, কোন কোনটা আরসা, তাহলে আমরা ধরে ওদেরকে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেব। আমরা দেখতে চাই, কারা কারা আরসা আছে।”

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার ‘উদ্বিগ্ন’ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা এজন্য বেড়া দিচ্ছি, যাতে যে কেউ যখন তখন ঢুকতে না পারে। উনারা এটা অপছন্দ করেন।

”আমরা চাচ্ছি, ওদেরকে আরও নিয়মবদ্ধ জীবনযাপন করার জন্য। উনারা অপছন্দ করেন।”

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে চলাচলের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রসঙ্গেও সরকারের ভিন্নমত থাকার কথা তুলে ধরে মোমেন বরেন, “উনারা চান, ওদের ফ্রি মবিলিটি। আমরা ওদেরকে ফ্রি মবিলিটি দিতে রাজি না।

”উনাদের বক্তব্য হলো তারা অন্য বাংলাদেশিদের মত, তাদেরকে চলাচলের স্বাধীনতা দিতে হবে। না। এরা আমাদের এখানে স্বল্পকালীন সময়ের জন্য আশ্রয় পেয়েছে। তারা বাংলাদেশিদের মতো এদের স্বাধীন চলাচল, চাকরির সুযোগ পাওয়ার কথা বলেন। আমরা এটা গ্রহণ করি না।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা মনে করি, তাদের ভবিষ্যত ভালো হবে তাদের স্বদেশে। মিয়ানমার এ সমস্যা তৈরি করেছে, তারা এটা সমাধান করতে পারে”

সূত্রঃ বিডিনিউজ