রাজনীতিতে চাই পরমতসহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধাবোধ: রাষ্ট্রপতি

অনলাইন ডেস্কঃ
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সকলের ঐক্য চান রাষ্ট্রপতি, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চান পরমত সহিষ্ণুতা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সুশীল সমাজকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে বুধবার জাতীয় সংসদের বিশেষ আলোচনায় দেওয়া স্মারক বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাহচর্য পাওয়া আবদুল হামিদ বলেন, “বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের মধ্যে ঐক্য। ঐক্য গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, অগণতান্ত্রিকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক দলসমূহকে পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।”

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে দলমতের পার্থক্য ভুলে উন্নয়নের যাত্রায় সামিল হওয়ার আহ্বান জানান আবদুল হামিদ, যিনি অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে; ছিলেন গণপরিষদ এবং দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য।

তিনি বলেন, “আসুন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।”

বিকাল ৩টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হওয়ার পর সাদা পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট পরিহিত রাষ্ট্রপতি সংসদ কক্ষে ঢোকেন।

তার প্রবেশের সময় বিউগলে বাজান হয় ‘ফ্যানফেয়ার’। রাষ্ট্রপতি সংসদ কক্ষে পৌঁছালে নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। স্পিকারের পাশে রাখা লাল চেয়ারে বসেন তিনি।

পরে স্পিকারের পাশে রাখা ডায়াসে দাঁড়িয়েই বক্তৃতা করেন রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও উন্নয়নের ধারাবাহিক চিত্র তিনি ভাষণে তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, “জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৭৫ এর পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং উপযুক্ত নীতি ও কার্যক্রমের অভাবে অর্থনীতিতে তেমন গতি সঞ্চার হয়নি। তবে বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে জাতির পিতার আদর্শের সরকার দায়িত্বে থাকায় তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলে দেশ আজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।”

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের ‘গুরুত্বপূর্ণ অর্জন’ বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ক্ষণে দেশের এ সাফল্য জাতির জন্য বয়ে এনেছে এক অভাবনীয় গৌরব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী ও অদম্য নেতৃত্বের জন্য আমাদের এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। এজন্য আমি তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই।”

শিল্প, অর্থনীতি, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি আবিদুল হামিদ।

দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশন সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারসহ চাঞ্চল্যকর অন্যান্য মামলার রায় দ্রুত নিষ্পত্তি করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।”

রাষ্ট্রপতি বলেন, দুর্নীতি, মাদক, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে দেশে স্বস্তি বিরাজ করছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। সুশাসনের উদ্দেশ্যে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনার লক্ষ্যে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা, সিটিজেনস চার্টার এবং শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ এবং অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, “সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দল-মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “জাতি হিসাবে আমরা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত অতিক্রম করছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর সোপান বেয়ে আমরা পৌঁছে গিয়েছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর স্বর্ণতোরণে।

“সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নির্মাণ এখন সমাপ্তির পথে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় মনোবল, বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন হয়েছে। এ সেতুর বাস্তবায়ন জাতি হিসাবে আমাদের স্বকীয়তা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, সক্ষমতা, জবাবদিহি, দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীকস্বরূপ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।”

পদ্মা সেতুর মত অন্য বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির তথ্যও রাষ্ট্রপতি তুলে ধরেন তার বক্তৃতায়।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। সমগ্র দেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ‘বিজয় দিবসের উপহার হিসেবে’ দেশের জনগণ প্রথম মেট্রো রেলে চলাচল করতে পারবে।

বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসাবে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এবং ‘এসডিজি প্রোগ্রেস অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার কথাও তিনি বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, “এ প্রাপ্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের এক বিশাল অর্জন। এ সম্মান বাংলাদেশের, এ সম্মান সমগ্র বাঙালি জাতির।”

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ‘উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেসব বিষয়ও বক্তৃতায় সবিস্তারে তুলে ধরেন রাষ্ট্রপ্রধান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদযাপনে গত বছরকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে নানা কর্মসূচি নিয়েছিল সরকার। তবে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে কর্মসূচিগুলো যথাযথভাবে করতে না পারায় মুজিববর্ষের মেয়াদ ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

এ বছরের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ উদযাপন করেছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করবে বাংলাদেশ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে গত বছরের নভেম্বর মাসে ইতিহাসে প্রথমবারের মত বিশেষ অধিবেশনে বসে জাতীয় সংসদ। ওই অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের উপর ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

বুধবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে তার স্মারক বক্তৃতা শেষে নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। সংসদ কক্ষ থেকে তিনি চলে যাওয়ার পর স্পিকার শিরীন শারমিন অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করেন।

সূত্রঃ বিডিনিউজ