কীর্তিমান ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী

নীতিশ বড়ুয়াঃ
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল এর পিতা, বিশ^নন্দিত পর্যটন নগরী বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্ত জনপদের সমুদ্র সন্তান, সাবেক ডাকসু নেতা, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সংসদ সদস্য, কক্সবাজার জেলার শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক, বর্ণাঢ্য রাজনীতিক মরহুম আলহাজ¦ অধ্যক্ষ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী।

জন্ম :
তিনি ১৯৩৭ সালের ১৮ অক্টোবর রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের মন্ডল পাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মালেকুজ্জামান সিকদার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন বোর্ডের আজীবন প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

শিক্ষা :
ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ১৯৫৫ সালে রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএ, ১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে এমএ পাশ করেন।

রাজনৈতিক জীবন :
কক্সবাজার জেলার সফল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ১৯৬১-১৯৬২ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের এজিএস ও ১৯৬২-১৯৬৩ সালে ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে লাহোরে ছাত্র নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেন। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ওই সময় এলাকার কতিপয় চিহ্নিত পাক-হানাদার, রাজাকার, আলবদর বাহিনী তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০-১৯৭৩ সালে রামু-উখিয়া-টেকনাফ নির্বাচনী এলাকা হতে প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় বাংলাদেশ বন মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সাল হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত সফলতার সাথে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত-এর দায়িত্ব পালন করেন।

সমাজকর্ম :
সফল রাজনীতিক আলহাজ্ব ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী ছিলেন। নারী ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার, সমাজসেবা আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি। দুর্যোগ, জলোচ্ছ্বাস আর দরিদ্র মানুষের দুর্দিনে নিজেকে উৎসর্গ করতেন ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। বর্ণিল কর্মময় জীবনের অধিকারী এ রাজনীতিককে তাই এখনো পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে মানুষ। ১৯৮৮, ১৯৯১ ও ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষতিগ্রস্থদের ত্রাণ-পুর্নবাসন কার্যক্রমে উলে¬খযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। রেডক্রস সমিতির সহ-সভাপতি হিসেবে ১৯৭৮ সালে মায়ানমারের শরণার্থীদের ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের উল্লেখযোগ্য :
* রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (১৯৭৬ সাল), কক্সবাজার সৈকত বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৮২ সাল), কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ (১৯৮৬ সাল), কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভাই মরহুম মনির আহমদ চৌধুরী সহ জমি দান (১৯৬৮ সাল), মৈষকুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয় (২০০১ সাল), রামু কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের ভবন নির্মাণ (১৯৯১-৯৬ সাল), রাস-আল-খাইমা উচ্চ বিদ্যালয় সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯৯৭ সাল), রামু সরকারি কলেজে জমিদান, রামু খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়কে পুনঃ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান সহ তিনি ১৭টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অসংখ্য মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির নির্মাণে সহযোগিতা করেন। উল্লেখ্য, তিনি ১৯৬২-৬৯ সাল পর্যন্ত রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে অবৈতনিক শিক্ষকতা করেন।

সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী। তিনি ১৯৫৭-১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজ সাময়িকী ‘মসিরেখা’ সম্পাদনা করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৬৮-৬৯ সালে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের সভাপতি, ১৯৬৯-১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম জেলা লবণ উৎপাদক সমিতির সভাপতি, কক্সবাজার মহকুমা রেফারী ও আম্পায়ার এসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি, লায়ন্স ক্লাব, রামু দুর্বার শিল্পীগোষ্ঠিসহ অনেকগুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি ও উপদেষ্টা ছিলেন। বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আলহাজ্ব ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ২০১০ সালের ২৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

লেখকঃ নীতিশ বড়ুয়া, সাংবাদিক ও রামু উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক।