বাবুনগরীর দাফন হল আহমদ শফীর পাশে

অনলাইন ডেস্কঃ
এক সময় ছিলেন ঘনিষ্ঠ সহযোগী, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব শেষ বেলায় দূরত্ব গড়ে দিয়েছিল। মৃত্যুতে সেই দূরত্ব দূর হল?

হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরীকে দাফন করা হল হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায়, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফীর পাশে।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ওই মাদ্রাসার দীর্ঘদিনের মহাপরিচালক শফীর মৃত্যুর পর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন জুনাইদ বাবুনগরী।

১১ মাসের মাথায় বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম শহরের সেন্টার ফর স্পেশালাইজড কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ (সিএসসিআর) হাসপাতালে বাবুনগরীর মৃত্যু হয়।

রাত ১১টার দিকে হেফাজতের জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতিতে হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জুনাইদ বাবুনগরীর জানাজা হয়। তারপর সেখানে আহমদ শফীর পাশে তাকে দাফন করা হয় বলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস নদভী জানান।

শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়।

নারী উন্নয়ন নীতির বিরোধিতা করে আসা কট্টর এই ধর্মভিত্তিক সংগঠনটি ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে আলোচনায় আসে।

শফীর নেতৃত্বে হেফাজতের কমিটিতে জুনাইদ বাবুনগরী ছিলেন মহাসচিব। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়ে হেফাজতি তাণ্ডবের পর তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

সে সময় বাবুনগরী ছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম বা সহকারী পরিচালক। মাদ্রাসার শীর্ষ পদের অন্যতম দাবিদার ছিলেন তিনি। কিন্তু শফীর উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ২০২০ সালের জুন মাসে ওই পদ থেকে জুনাইদ বাবুনগরীকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে গতবছর ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ওই মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পদ ছাড়তে বাধ্য হন শফী। বাবুনগরীর অনুসারীদের বিক্ষোভ আর তুমুল হট্টগোলের মধ্যে শফীর ছেলে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক আনাস মাদানিকেও বহিষ্কার করা হয়।

অসুস্থ শফীকে সেদিন মাদ্রাসা থেকেই চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরদিন ঢাকায় এনে পুরান ঢাকার একটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সেখানেই তিনি মারা যান।

শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রভূমি হাটহাজারী মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস এবং শিক্ষা পরিচালক পদে ফেরেন বাবুনগরী।

এরপর ১৫ নভেম্বর শফীর অনুসারীদের বিরোধিতার মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের সম্মেলন হয়, তাতে সাবেক মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির করে হেফাজতের নতুন কমিটি গঠিত হয়।

এদিকে আহমদ শফীর মৃত্যু ‘স্বাভাবিকভাবে হয়নি’ দাবি করে তার শ্যালক গত ডিসেম্বরে যে মামলা দায়ের করেন, তাতে জুনাইদ বাবুনগরীকেও আসামি করা হয়। শফিপন্থিদের একাধিক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠাতা আমিরের মৃত্যুর জন্য সরাসরি বাবুনগরীকে দায়ী করা হয়।

গত এপ্রিলে আহমদ শফীর মৃত্যুর মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পিবিআই। সেখানে বাবুনগরীসহ ৪৩ জনকে দায়ী করে বলা হয়, এটি একটি ‘দণ্ডার্হ নরহত্যাজনিত অপরাধ’। আসামিদের বেপরোয়া আচরণের মাধ্যমে আহমদ শফীর মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বাবুনগরী অবশ্য ওই তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, আহমদ শফীর ‘স্বাভাবিক’ মৃত্যু হয়েছে।

বাবুনগরীর সময়েই গত বছরের শেষ দিকে ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনে নেমে নতুন করে আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলাম। এরপর গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের বিরোধিতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় হেফাজতকর্মীরা।

সেসব ঘটনায় কয়েকটি মামলায় বাবুনগরীকেও আসামি করা হয়। হেফাজত নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জ্যেষ্ঠ নেতাদের কয়েকজন প্রকাশ্যেই সংগঠন ছাড়ার ঘোষণা দেন। বাবুনগরী সংগঠনকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

৬৮ বছর বয়সী জুনাইদ বাবুনগরী হৃদরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। বুধবার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জুনাইদ বাবুনগরীর জানাজা হয়। তাতে ইমামতি করেন তার মামা হেফাজতের প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী।

জানাজার আগে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকেই সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আমির ঘোষণা করা হয় বলে ইদ্রিস নদভী জানান।

এদিকে প্রয়াত হেফাজত আমির জুনাইদ বাবুনগরীর দাফন কোথায় হবে তা নিয়ে হেফাজত নেতৃবৃন্দের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিয়েছিল। দুপুরে মৃত্যুর পর হেফাজত নেতারা জানিয়েছিলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসাতেই তার দাফন হবে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে ফটিকছড়ির বাবুনগরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার আগ্রহ দেখান।

একাধিকবার সিদ্ধান্ত বদল শেষে রাত ১১টার পর জুনাইদ বাবুনগরীর জানাজা হয়। তখনও দাফন নিয়ে হেফাজত নেতৃবৃন্দ একমত হতে পারছিলেন না।

হেফাজতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাবুনগরী হুজুরের মামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী চেয়েছিলেন দাফন ফটিকছড়িতে হোক। কিন্তু অপর একটি পক্ষ হাটহাজারী মাদ্রাসায় দাফনের পক্ষে ছিলেন।”

শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে মাদ্রাসায় আহমদ শফীর কবরের পাশেই বাবুনগরীকে দাফন করা হয় বলে মাদ্রাসার সিনিয়র মোহাদ্দিস আশরাফ নিজামপুরী জানান।

সূত্রঃ বিডিনিউজ