হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরীর মৃত্যু

অনলাইন ডেস্কঃ
সাম্প্রতিক সময়ে নানা ঘটনায় আলোচনায় থাকা ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় আমির জুনাইদ বাবুনগরী মারা গেছেন।

অসুস্থ অবস্থায় বৃহস্পতিবার তাকে চট্টগ্রাম শহরের সেন্টার ফর স্পেশালাইজড কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ (সিএসসিআর) হাসপাতালে নেওয়া হলে বেলা পৌনে ১টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস নদভী জানান।

তিনি বলেন, তাদের আমির রাত থেকেই অসুস্থ বোধ করছিলেন। সকালে পরিস্থিতি গুরুতর হলে তাকে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ের ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়; কিন্তু বাঁচানো যায়নি।

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রভূমি হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস এবং শিক্ষা পরিচালক বাবুনগরীর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিনি স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলেকে রেখে গেছেন।

হেফাজত নেতারা জানান, বাবুনগরী হৃদরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ৮ অগাস্ট তিনি করোনাভাইরাসের টিকাও নিয়েছিলেন।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ওই মাদ্রাসার দীর্ঘদিনের মহাপরিচালক এবং হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন জুনাইদ বাবুনগরী। ১১ মাসের মাথায় তারও জীবনাবসান ঘটল।

ফটিকছড়ির নানুপুর মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের শুরা সদস্য মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জুনাইদ বাবুনগরীর জানাজার পর সেখানকার কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

অনুসারীদের কাছে জুনায়েদ বাবুনগরী ছিলেন একজন ‘অসাধারণ’ ইসলামিক পণ্ডিত এবং ‘গতিশীল ও উদ্যোগী’ নেতা। হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মাওলানা মোহাম্মদ ইয়াহিয়ার ভাষায়, ইসলাম ধর্ম নিয়ে জুনাইদ বাবুনগরীর ‘জ্ঞানের গরিমা বলে শেষ করা যাবে না’।

“তিনি উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ছিলেন। উনার মৃত্যুতে বাংলদেশের ইসলামি আন্দোলনের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।”

তবে বিরোধীরা হেফাজতে ইসলামকে ‘ভুল পথে’ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন বাবুনগরীর বিরুদ্ধে। শফীর সময়ের শেষ দিকে সরকারের সঙ্গে হেফাজতের যে সখ্য দেখা যাচ্ছিল, বাবুনগরী দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে তৈরি হয় দূরত্ব।

তার সময়েই গত বছরের শেষ দিকে ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনে নেমে নতুন করে আলোচনায় আসে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।

গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফর ঘিরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে তাণ্ডব চালায় কট্টর ভাবধারার এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেসব ঘটনায় কয়েকটি মামলায় বাবুনগরীকেও আসামি করা হয়।

আহমদ শফীর মৃত্যু ‘স্বাভাবিকভাবে হয়নি’ দাবি করে তার শ্যালকের করা মামলাতেও আসামি ছিলেন জুনাইদ বাবুনগরী। পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বাবুনগরীসহ ৪৩ জনের ‘দায়’ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

বাবুনগরী অবশ্য ওই তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, আহমদ শফীর ‘স্বাভাবিক’ মৃত্যু হয়েছে।

হেফাজতে ইসলামের নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার বাবুনগর গ্রামে জুনাইদ বাবুনগরীর জন্ম।

আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করার পর ১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করেন বাবুনগরী। পরে পাকিস্তানের দারুল উলুম আল্লামা বিন্নুরি টাউন মাদ্রাসা থেকে ইলমে হাদিস ডিগ্রি নেন।

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে বাবুনগরী তার শৈশবের বিদ্যাপীঠ ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ২০০৫ সালে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। ২০১৭ সালে তিনি সেই মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস হন।

কওমি মাদ্রাসার একটি বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এছাড়া নাজিরহাট বড় মাদ্রাসার মুতাওয়াল্লী এবং মাসিক মুখপত্র দাওয়াতুল হকের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।

শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়, যাতে ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও যুক্ত হয়। বলা হয়, বাংলাদেশে ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠাই হেফাজতের আন্দোলনের লক্ষ্য।

নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ২০১১ সালে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষণা করলে তার বিরুদ্ধে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। মূলত তখন থেকেই এ সংগঠন সারা দেশে পরিচিতি পায়।

পরে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হলে সেই আন্দোলনকারীদের ‘নাস্তিক ব্লগার’ আখ্যায়িত করে তাদের শাস্তির দাবিতে সক্রিয় হয় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটি।

ওই দাবি সামনে রেখেই তারা সে সময় ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যার মধ্যে ‘ইসলামবিরোধী’ নারীনীতি, ‘ধর্মহীন’ শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার দাবিও ছিল।

ওই ১৩ দফা দাবি নিয়ে ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ এবং পরে ৫ মে ঢাকার ছয়টি প্রবেশমুখে অবরোধ কর্মসূচি দেয় হেফাজতে ইসলাম। অবরোধ কর্মসূচি শেষে হেফাজতের নেতা-কর্মীরা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়।

শাপলা চত্বরে ওই অবস্থান ঘিরে দিনভর পুলিশের সঙ্গে হেফাজতকর্মীদের সংঘর্ষ চলে। মতিঝিল, পল্টন ও আশপাশ এলাকায় ফুটপাতের শত শত দোকান ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করে কওমি শিক্ষার্থীরা। তাণ্ডবের শিকার হয় আশপাশের অনেক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা।

সে সময় হেফাজতের মহাসচিব পদে থাকা বাবুনগরীকে ঢাকার লালবাগ থেকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ২৩ দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক মাহফিলে বাবুনগরী হুমকি দেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য না সরালে ‘আবারও শাপলা চত্বরের মত ঘটনা’ ঘটবে।

হাটহাজারী মাদ্রাসায় শফীর উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম বা সহকারী পরিচালকের পদে থাকা জুনাইদ বাবুনগরীকে ২০২০ সালের জুন মাসে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন মাদ্রাসার শীর্ষ পদের অন্যতম দাবিদার।

এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ১৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর আগের দিন চট্টগ্রামের ওই মাদ্রাসায় তুমুল হট্টগোলের মধ্যে শফী মহাপরিচালকের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। তার ছেলে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক আনাস মাদানিকেও বহিষ্কার করা হয়।

১৫ নভেম্বর শফীর অনুসারীদের বিরোধিতার মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের সম্মেলন হয়, তাতে সাবেক মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির করে হেফাজতের ১৫১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত হয়।

নতুন ওই কমিটি গঠনের মধ্যেই মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতায় সোচ্চার হয় ধর্মভিত্তিক এই গোঁড়া দলটি।

হাটহাজারীর পার্বতী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক মাহফিল থেকে বাবুনগরী ঘোষণা দেন, ভাস্কর্য বসালে তা ‘টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেওয়া হবে’।

তারপর চার মাস না যেতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের বিরোধিতায় বিক্ষোভ থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীরা সারা দেশে তাণ্ডব চালায়। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামে সহিংসতায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়।

এসব ঘটনায় অর্ধশতাশিক মামলা হওয়ার পর হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ কয়েক ডজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, হেফাজত নেতারা নাশকতার বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলেন, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত এপ্রিলের শেষ দিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেন সংগঠনের আমির জুনাইদ বাবুনগরী। পরে গত ৭ জুন তাকে আমির করেই ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

তার আগে ২ জুন ঢাকায় শফীপন্থি হেফাজত নেতাদের এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, আলেমদের ‘সরলতার সুযোগে’ জুনাইদ বাবুনগরী তাদের ‘ভুলপথে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা’ করছেন।

তবে ফটিকছড়ির নানুপুর মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের শুরা সদস্য মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী মনে করেন, আহমদ শফীর মৃত্যুর পরে তার শূন্যতা জুনাইদ বাবুনগরী ‘কিছুটা হলেও’ পূরণ করতে পেরেছিলেন।

“প্রত্যেক মানুষের জীবনে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। বাবুনগরী হুজুর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তার মৃত্যু দেশের জন্য, মুসলমানদের জন্য বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে। আমরা সকলেই, বিশেষ করে মাদ্রাসার সকল ছাত্র-শিক্ষক ও দেশের জনগণ সকলেই শোকাহত।”

জুনাইদ বাবুনগরী হাদিস বিষয়ে ‘দেশের অন্যতম বিজ্ঞ ব্যক্তি’ ছিলেন মন্তব্য করে সালাউদ্দিন নানুপুরী বলেন, “ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সবার মুরুব্বি ছিলেন। সবসময় ইসলাম ও ইসলামী শরিয়তের ক্ষেত্রে তিনি আপসহীনভাবে কাজ করে গেছেন। হুজুর চলে যাওয়াতে সারাদেশের ওলামায়ে কেরাম, মুসলমান জনগণের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ