কোভিড টিকা: অন্তঃসত্ত্বা নারীদের যা জানা দরকার

অনলাইন ডেস্কঃ
সারা বিশ্বে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরন। মহামারীর এই কঠিন সময়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর ডেল্টা ধরনের প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিভিন্ন দেশের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাজ্যের শীর্ষ কয়েকজন চিকিৎসা কর্মকর্তা এক যৌথ বিবৃতিতে গর্ভবতী নারীদের করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

নতুন একটি সমীক্ষার ফল তুলে ধরে তারা বলছেন, গত মে মাস থেকে যুক্তরাজ্যে কোভিডে আক্রান্ত যে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাদের ৯৮ শতাংশেরই টিকা নেওয়া ছিল না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর আগে জানিয়েছিল, কোভিডে আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠার ঝুঁকি একই বয়সী অন্য নারীদের তুলনায় বেশি।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেই ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য ডেল্টা ধরন কি বেশি বিপজ্জনক?

ডেল্টা ধরন করোনাভাইরাসের অন্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক। অন্তঃসত্ত্বাসহ সবার ক্ষেত্রেই করোনাভাইরাসের এই ধরনটি আরও বেশি গুরুতর শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

প্রসূতি নারীদের নিয়ে কাজ করা ‘ইউকে অবস্টেট্রিক সার্ভেইলেন্স সিস্টেম’ (ইউকেওএসএস) এর তথ্য অনুযায়ী ডেল্টা ধরনের কারণে কোভিড আক্রান্ত গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার বাড়ছে।

‘কিংস কলেজ লন্ডন’ এর প্রসূতিবিদ্যা বিষয়ক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু শেন্নান বলেন, “কোভিডের আদি ভাইরাসের তুলনায় নতুন ধরনগুলোর (আলফা ও ডেল্টা) কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের গুরুতর জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।”

যুক্তরাজ্যের সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কোভিডে আক্রান্ত প্রসূতিদের ক্ষেত্রে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজনীয়তা, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি এবং নিওমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ৫০ শতাংশ বেশি।

ইউকেওএসএস এর তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ৩৩ শতাংশ নারীকে কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ১৫ শতাংশকে নিবিড় পরিচর্যা দিতে হয়েছে।

গর্ভের শিশুর ঝুঁকি কতটা?

আগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড সংক্রমণ মা এবং শিশু দুজনেরই স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে প্রিক্ল্যাম্পশিয়া, সংক্রমণ এবং হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তিসহ মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে।

গত এপ্রিলে ‘দ্য জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (জেএএমএ) পেডিয়াট্রিকস’ এর এক সমীক্ষায় জানানো হয়, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের ক্ষেত্রে অকালে শিশু জন্মদানসহ কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

১৮টি দেশের ৪৩টি চিকিৎসা কেন্দ্রে দুই হাজারের বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারীর তথ্য সংগ্রহ করে এ সমীক্ষা চালানো হয়েছে বলে জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদেনে বলা হয়।

‘ইউকেওএসএস’ এর সংগ্রহ করা নতুন তথ্য অনুযায়ী কোভিডের গুরুতর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পাঁচজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর মধ্যে অন্তত একজন নির্ধারিত সময়ের আগে শিশু জন্ম দিয়েছেন।

এছাড়া ‘সি-সেকশন’ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু জন্মের হারও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মায়েদের জন্ম দেওয়া পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুকে হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করতে হয়েছে।

গর্ভবতী নারীদের জন্য টিকা কী নিরাপদ?

বিভিন্ন গবেষণা এবং সরাসরি পাওয়া তথ্য যাচাই করে অন্তঃসত্ত্বা নারী কিংবা তাদের সন্তানের ওপর টিকার বাড়তি কোনো বিরূপ প্রভাব বা ঝুঁকির তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল কলেজ অব মিডওয়াইভস’ এর প্রধান নির্বাহী গিল ওয়াল্টন এক বিবৃতিতে বলেন, বিশ্বজুড়ে লাখো অন্তঃসত্ত্বা নারীকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের কার্যকরভাবে কোভিড থেকে নিরাপদ রাখছে। তাদের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং শিশুদের ক্ষতির হারও অনেক কমিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট কমিটি অন ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন এবং অস্ট্রেলিয়ার টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রপ অন ইমিউনাইজেশন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়া উচিত।

এমনকি কিছু কিছু দেশ অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা দেওয়ার উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া কেবল ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা দিলেও অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে সেই সীমা রাখা হয়নি।

কানাডার ওন্টারিও এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশেও সন্তান সম্ভবা নারীদের করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে এর মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির (জেএইচইউ) তথ্য অনুযায়ী, ২০টি দেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩৯টি দেশে।

কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের উল্লেখ করে গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আরও ৩৩টি দেশ। যেমন- মা হতে যাওয়া নারী যদি কোভিড-১৯ সংক্রমিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন কিংবা তার স্বাস্থ্য যদি গুরুতর রোগের ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে টিকা নিতে বলা হয়েছে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য বলছে, গর্ভবতী নারীদের টিকা না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে নয়তো বিশেষ পরিস্থিতিতে টিকার অনুমোদন দিয়েছে ৫১টি দেশ।

এসব দেশের মধ্যে জার্মানিও রয়েছে। দেশটি বলছে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে টিকার প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট তথ্য না থাকা তাদের এই অবস্থান।

যারা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তারা টিকা নেবেন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন যে সব নারী, তাদের অবশ্যই টিকা নেওয়া উচিত। টিকা নেওয়ার কারণে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। স্তন্যদাতা মা টিকা নিলে তার শিশুর ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।

বন্ধ্যাত্বের গুজব

কোভিড টিকা বন্ধ্যাত্বের কারণ হয়ে উঠছে কিংবা গর্ভের ক্ষতি করছে বলে সোশাল মিডিয়ায় যে কথা রটেছে, তার কোনো ভিত্তি নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

তারা বলছেন, টিকার কারণে ‘গর্ভফুল’ এর ক্ষতি হতে পারে- এমন কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। গর্ভকালীন সময়ে ‘গর্ভফুল’ এর মাধ্যমে বাড়ন্ত শিশুর অক্সিজেন এবং পুষ্টির সরবরাহ সচল থাকে।

‘ইমিউনাইজেশন, ইনফেকশাস ডিজিজ, অ্যান্ড পাবলিক হেলথ প্রিপেয়ার্ডনেস এক্সপার্ট ওয়ার্ক গ্রুপ অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ান্স অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস’ এর সদস্য ড. রিচার্ড বেইগি বলেন, “টিকার কারণে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা তৈরি হতে পারে এমন চিন্তার স্পষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।”

আর যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ এর পরামর্শে বলা হচ্ছে, “টিকার কারণে আপনি কোভিডে সংক্রমিত হবেন না এবং বুকের দুধের মাধ্যমেও আপনর শিশুর দেহে তা যাবে না।”

গবেষণায় দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা যে নারীরা ফাইজার/বায়োএনটেক এবং মডার্নার কোভিড টিকা নিয়েছেন, তাদের শরীরে তৈরি হওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি নবজাতকের শরীরেরও সঞ্চারিত হয়েছে।

সূত্রঃ বিডিনিউজ