জলাবদ্ধতার দূর্ভোগে অফিসেরচরবাসি : রামুতে পানি চলাচল পথ বন্ধ করে সড়ক সম্প্রসারণ কাজ

খালেদ শহীদ, রামুঃ
রামুতে শতবছরের পানি চলাচল পথ বন্ধ করে, সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এতে চরমদূর্ভোগে পড়েছে, রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের বৃহত্তর অফিসের চর, সিকদার পাড়া, চরপাড়া, জুলেখার পাড়া, হাজারীকুল, শ্রীকুল, পূর্ব মেরংলোয়া গ্রাম সহ সড়কের পাশের বাসিন্দারা। বর্ষা মৌসুমে পানি চলাচল পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ভারী বর্ষনে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এসব এলাকার বসতবাড়ির আঙ্গিনা, চলাচল পথের কোথাও কোথাও হাঁটু সমান পানি এখন। এই জলাবদ্ধতার কারণে দূষিত ময়লা পানি দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে এলাকার বাসিন্দরা স্বাস্থ্যে বিপর্যয়ের আশংকা করছেন। হুমকীর মুখে পড়েছে এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল বসতবাড়ির চারপাশের সুপারী গাছ গুলোও।

পানি চলাচল পথ বন্ধ করে দেয়ার কারণে, কয়েক ঘন্টা টানা বৃষ্টি হলেই পানি বন্দি হয়ে পড়ে এসব এলাকা। ফলে তিন-চারশত পরিবারকে জলাবদ্ধতায় দুর্বিসহ দিনযাপন করতে হচ্ছে। বর্তমানে অফিসেরচর এলাকায় পানি সরে যাওয়ার কোনো পথই খোলা নেই। এ জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো সুরাহা হচ্ছে না। প্রশাসন বা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে জরুরী কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলে আক্ষেপ করেন, স্থানীয়রা।

জানা গেছে, কক্সবাজারের প্রাচীন জনপদ রামুতে নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ‘ফতেখাঁরকুল-মরিচ্যা জাতীয় মহাসড়ক’ প্রশস্তকরণ কাজ উদ্বোধন করা হয়, গত বছরের ৩০ আগস্ট। সড়কটির দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৭২৬ কিলোমিটার ও ৩৪ ফুট প্রস্থে উন্নীত করার কাজ চলছে। রামু বাইপাস ফুটবল চত্ত¡র থেকে চৌমুহনী হয়ে মেরংলোয়া উত্তর বাইপাস এবং চৌমুহনী স্টেশন থেকে ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল হয়ে মরিচ্যা পর্যন্ত এই জাতীয় মহাসড়কের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণে জাতীয় মহাসড়কটির কার্যক্রম চালানো হলেও, সড়কের পাশে বিদ্যমান শত বছরের প্রাচীন পানি চলাচল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সড়কটির নির্মাণ কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্স (প্রা:) লিমিটেডের অংগপ্রতিষ্ঠান ‘মাসুদ হাই-টেক ইঞ্জিনিয়ারিং লি:-হাসান টেকনো বিল্ডার্স লি:-জেভি।

রানা বিল্ডার্স (প্রা:) লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত হাইওয়ে ইঞ্জিনিয়ার মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, অফিসের চর এলাকায় সম্প্রতি জলাবদ্ধতা হয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণের কারণে পানি চলাচল পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ওই এলাকায় কিছুটা জলাবদ্ধতা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত, ওই স্থানে ড্রেন নির্মাণ হবে কিনা বলা যাচ্ছে না।

প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে সড়ক উন্নয়ন কাজ কিছুটা ধীরে চলছে উল্লেখ করে, ইঞ্জিনিয়ার মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রায় ১৭ কিলোমিটার এ সড়কের কিছু বিদ্যমান স্থানে এক-দেড় ফুট প্রস্ত ড্রেনেজের কাজ করা হবে। তাও ১৪০০ মিটারের মতো, পুরো সড়কে নয়। বিদ্যমান স্থান গুলো হচ্ছে দীর্ঘ ওই সড়কের ব্রীজ-কালভার্ড ও হাটবাজার এবং স্টেশন এলাকায়। তবে সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরে, সড়ক বিভাগের নির্দেশিত এলাকায় ওই ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বুধবার (৭ জুলাই) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, অফিসের চর, সিকদার পাড়া ও চর পাড়ার এলাকাস্থ সড়কের পাশে দীর্ঘ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমের পানি চলাচল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, ‘ফতেখাঁরকুল-মরিচ্যা জাতীয় মহাসড়ক’ প্রশস্তকরণ চলমান কাজের অংশ হিসেবে, সড়কের পাশে বিদ্যমান পানি চলাচল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিকল্প হিসেবে সড়ক সম্প্রসারণের পরে, পাশে কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা পানি চলাচলের জন্য কোন পথ (নালা) করে দেয়া হয়নি। এতে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় চরম দূর্ভোগে পড়েছে, রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের বৃহত্তম অফিসের চর, সিকদার পাড়া ও চরপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা। ফতেখাঁরকুল-মরিচ্যা সড়কের পাশের কয়েকশত বছর আগে জনবসতী গড়ে উঠা ওই এলাকায় প্রাচীনকাল থেকেই এই পানি চলাচল পথ (নালা) বিদ্যামান ছিলো বলে জানান, এলাকাবাসীরা।

অফিসেরচর এলাকার বাসিন্দা ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল হক জানান, শতবছর আগে থেকেই এই সড়কের পাশে বর্ষায় পানি চলাচল করার নালা (ড্রেন) ছিলো। সম্প্রতি ফতেখাঁরকুল-মরিচ্যা সড়কটি সম্প্রসারণের সময় পানি চলাচল পথটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে বৃহত্তর অফিসের চর, সিকদার পাড়া, চর পাড়া এলাকা পানি বন্দি হয়ে পড়েছে দীর্ঘ একমাস ধরে। দিনের পর দিন জলাবদ্ধতার কারণে দুষিত হয়ে পড়েছে, বসতবাড়ির আঙ্গিনায় আটকে থাকা পানি। অনেক স্থানে দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসনকেই এগিয়ে আসতে হবে।

চরপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষক সাজ্জাদ সরওয়ার জানান, এখন বর্ষার মৌসুম। জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হঠাৎ ভারি বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকা পানি বন্দি হয়ে পড়ে। কয়েক ঘন্টার বৃষ্টি কয়েক দিনেও কমে না। যোগাযোগের জন্য সড়কের উন্নয়ন দরকার। সড়কের উন্নয়নের জন্য পুরোনো পানি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দূভোর্গের কথা চিন্তা করে বিকল্প হিসেবে সড়কের নির্ধারিত স্থানের পরে, পানি চলাচলের জন্য পথা করে দেয়া দরকার ছিলো। গত এক মাস ধরে বসতবাড়ির চারপাশে ও চলাচল পথে পানি জমে জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে। এতে মানুষ ও যান চলাচলে দুর্ভোগসহ অবর্ণনীয় কষ্ট বেড়ে গেছে।

অফিসের চরের বাসিন্দা সোহেল রানা, জাহেদুল হক, এইচ এম মোমেন ও মাসুদ রানা আক্ষেপ করে বলেন, সড়ক উন্নয়নের নামে পানি চলাচলের স্বাভাবিক ব্যবস্থাটা ধংস করা হয়েছে। আগে মানুষকে ভালোভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে হবে। কয়েকটি গ্রামকে জলাবদ্ধতায় রেখে, বাড়িতে নিরাপদে বসবাস করতে না দিয়ে, অপরিকল্পিত সড়ক উন্নয়ন মানুষের কি কাজে আসবে। বৃষ্টি হলেই বৃহত্তর অফিসের চরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এই জলাবদ্ধতা দূর করতে হবে আগে। তারপর সড়কের উন্নয়ন কাজ করা দরকার। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁরা বলেন, বসতবাড়ির আঙ্গিনায় টানা জলাবদ্ধতার কারণে পানির রং কালো হয়ে গেছে। পানির মধ্যে নানা ধরনের ময়লা ও অনেক ধরনের পোকা দেখা যাচ্ছে। বাড়ির আঙ্গিনায় জমে থাকা পানি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এখন। বসতবাগানের সুপারী গাছগুলোও হুমকীর মুখে পড়েছে। বেশীদিন পানি জমে থাকলে, সুপারী গাছগুলো মরে যাবে।

অফিসের চরের বাসিন্দা রামু সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সাজিদ আবদুল্লাহ নওশাদ জানান, গত ১৬ জুন থেকে আমাদের বাড়ির চারিপাশে ও উঠোনে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের পাশে পুরোনো পানি চলাচল পথ বন্ধ করে দেয়ায়, এই সমস্যা বিরাজ করছে। প্রায় এক মাস ধরে পানি বন্দি থাকায়, আমাদের বসত বাড়ির বাগানের তিন-চার হাজার সুপারী হুমকীর মধ্যে পড়েছে। ওই সুপারী গাছগুলো আমাদের পরিবারের প্রধান অর্থকরী ফসল। বেশী দিন পানিতে থাকলে সুপারীগাছ গুলো মরে যাবে। জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে কবে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে জানিনা।

এলাকার বাসিন্দা হাবিব উল্লাহ, সালাহ উদ্দিন, মো. ইয়াহিয়া আক্ষেপ করে বলেন, জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে রয়েছে, পুরো বৃহত্তর অফিসের চরের বাসিন্দারা। বৃষ্টি হলেই ভোগান্তি বেড়ে যায়। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

অফিসের চরের মতো প্রায় একই অবস্থা হাজারীকুল, শ্রীকুল ও পূর্ব মেরংলোয়া এলাকায়। এসব এলাকার মূল সড়ক কিছুটা ভালো থাকলেও এলাকার ভেতরের বেশির ভাগ সড়কই কাঁচা ও ভাঙা। ফলে বৃষ্টি হলেই কাঁদা ও পানিতে ভরপুর থাকে এসব এলাকা। সড়ক হয়ে যায় চলাচলের অযোগ্য। বৃষ্টি শুরুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা কাঁদায় ভরে যায়। আর আধ ঘণ্টার বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা। এলাকার বাসিন্দাদের চলাচল করতে হয়েছে কাঁদাপানি মাড়িয়ে। জানালেন, সংস্কৃতিকর্মী এইচ বি পান্থ। তিনি বলেন, রামু চৌমুহনীর উত্তর পাশে ইনস্টিটিউট অব মিউজিক, এভারেস্ট টিচিং ইনস্টিটিউট সহ পূর্ব মেরংরোয়া গ্রামের প্রায় শতাধিক বাড়ি-ঘর দীর্ঘদিন ধরে পানি বন্দি হয়ে আছে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কোন ব্যবস্থা না নিলে, করোনাকালীন সময়ে ওই এলাকার জনগন নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম জানান, স্থানীয় লোকজনের দুর্ভোগ লাঘবের স্বার্থেই দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরিকল্পনা নিয়েই এলাকায় উন্নয়ন কাজ করা হবে। তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেই বৃহত্তর অফিসেরচর এলাকায় হাঁটু পানি সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় শেষেও এই পানি সরে না। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সাথে পরিকল্পনা করে, সড়কের পাশে পানি চলাচলের জন্য পরিকল্পিত ভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে।

রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার বিষয়টি সরেজমিন খোঁজ নিয়েছি। করোনা পরিস্থিতির কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও, অফিসের চরে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।