কোভিড: দেশবাসীকে সতর্ক করতে পাহাড়, জঙ্গল চষে বেড়াচ্ছেন ভুটানের রাজা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
মাথায় বেসবল ক্যাপ, পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সঙ্গে পিঠে ঝোলানোর ব্যাগ; এভাবেই সাপ আর জোঁকে পরিপূর্ণ একের পর এক জঙ্গল ও মাইলের পর মাইল পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে ভুটানের বিভিন্ন প্রান্তে নাগরিকদের কাছে গিয়ে তাদেরকে কোভিড মোকাবেলায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করছেন দেশটির রাজা জিগমে খেসার নামগিল ওয়াংচুক।

কেবল তা-ই নয়, প্রত্যেকটি এলাকা থেকে ফিরে নিয়ম মেনে রাজধানীর একটি হোটেলে কোয়ারেন্টিনেও থাকছেন তিনি।

প্রতিবেশী ভারতকে দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে ৭ লাখের মতো জনসংখ্যার দেশটিকে রক্ষায় কর্তৃপক্ষ যেসব নির্দেশনা দিয়েছে তার বাস্তবায়ন ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণে গত ১৪ মাস ধরে ভুটানের রাজা এভাবেই পায়ে হেঁটে, গাড়িতে কিংবা কোথাও কোথাও ঘোড়ায় চেপে দেশের এমাথা-ওমাথা চষে বেড়াচ্ছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

৪১ বছর বয়সী রাজার এ পরিশ্রম যে বৃথা যায়নি, সেখানকার পরিস্থিতিই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত চীন আর ভারতের মাঝে থাকা হিমালয়ের দেশটিতে করোনাভাইরাস তেমন সুবিধা করতে পারেনি, মৃত্যু হয়েছে মাত্র একজনের।

“জনগণকে মহামারী নিয়ে সতর্ক করতে রাজা যখন মাইলের পর মাইল সফর করছেন, দরজায় কড়া নাড়ছেন, তখন মানুষও তার কথা গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে। জনগণের জন্য নির্দেশনা জারি করার তুলনায় তার উপস্থিতি বেশ শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে,” বলেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।

মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে তারা একা নয়, রাজার উপস্থিতি তাদেরকে আশ্বস্ত করছে, বলেছেন তিনি।

লোটে শেরিং নিজেও চিকিৎসক। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা রাজার সঙ্গী হিসেবে তিনিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গেছেন।

রাজা নিজের সর্বময় ক্ষমতা কমিয়ে ভুটানে ২০০৮ সাল থেকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র চালু করলেও দেশটির সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো রাজ পরিবারের প্রতি আনুগত্যের প্রভাব প্রবল।

দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া কর্মীদের ধন্যবাদ দিতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও ভুটানের রাজা ৫ দিন পাহাড়ি পথে হেঁটেছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

রাজার সাক্ষাৎকার নিতে রয়টার্সের অনুরোধ তার কার্যালয় প্রত্যাখ্যান করেছে; অবশ্য তার ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুক পেইজেই মহামারীর মধ্যে তার কর্মকাণ্ড ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সফরের সচিত্র বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে।

“মহামারী দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়লে আমাদের জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, আর এটাই আমাদের রাজার সবচেয়ে বড় ভয়,” বলেছেন রাজপ্রাসাদের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা।

বিভিন্ন এলাকা সফর শেষে দুই ছেলের জনক জিগমে ওয়াংচুক রাজধানী থিম্পুর একটি হোটেলে উঠেন, মেনে চলেন কোয়ারেন্টিনের নির্দেশনা। ভুটানের বেশিরভাগ নাগরিকের মতো তিনিও করোনাভাইরাসের টিকার মাত্র একটি ডোজই নিয়েছেন।

গত শতকের ৭০-র দশক পর্যন্ত বিদেশিদের জন্য দ্বার বন্ধ করে রাখা ভুটানে এখনও প্রতি দুই হাজার নাগরিকের জন্য চিকিৎসক মাত্র একজন।

সংক্রমণ এড়াতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দেশটি আবারও তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে; দেশের ভেতরেও কিছু কিছু এলাকায় দেওয়া হয়েছে লকডাউন, কোভিড রোগী শনাক্তে বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষা।

ভুটানে যারা টিকা পাওয়ার উপযুক্ত, তাদের ৯০ শতাংশের দেহে এরই মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেরিং।

সরবরাহ না থাকায় বাকিদের প্রথম ডোজ দেওয়া যায়নি; দ্বিতীয় ডোজ কবে মিলবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। এ কারণে দেশটি এখন অন্য ভ্যাকসিনের দিকে ঝুঁকছে বলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কথা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সূত্র: বিডিনিউজ