শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আওয়ামী লীগ মজবুত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে: শেখ হাসিনা

অনলাইন ডেস্কঃ
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের নেতা-কর্মীদের অবদান স্মরণ করেছেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলছেন, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে আমাদের সকল নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা শত প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে আজ অত্যন্ত মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।”

আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার এক বাণীতে একথা বলেন শেখ হাসিনা।

করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে গত বছরের মতো এবারও সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপদযাপন করবে ক্ষমতাসীন দলটি।

বুধবার সূর্যোদয়ের ক্ষণে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা তোলার মধ্যদিয়ে শুরু হবে দিনের কর্মসূচি। এরপর ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া হবে।

বিকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে ভিডিও কনফারেন্সিয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি টানা তৃতীয় মেয়াদে এখন সরকারে রয়েছে। এক যুগ ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব চালিয়ে আসা শেষ হাসিনা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার কথা বলে আসছেন।

বাণীতে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের লক্ষ্যই হল দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ এবং বাঙালিদের বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস দলের মধ্যে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও গণতন্ত্রের চর্চা অটুট থাকলে কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।”

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের, প্রায় দুই যুগ পর যে দলটির নেতৃত্বে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

মুসলিম লীগের প্রগতিশীল একটি অংশের উদ্যোগে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।

প্রতিষ্ঠাকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দলটির সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ঘটনাক্রম তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “দলটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা, বিশ্বের মুসলমানদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব জোরদার এবং বিশ্বশান্তির পথকে প্রশস্ত করা।”

১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর তিনি সেই দায়িত্ব পালনের পর সভাপতি নির্বাচিত হন।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘসময় এই দলটি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করে জনগণের মধ্যে আস্থার স্থান তৈরি করে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেন বঙ্গবন্ধু, যাকে বাঙালির মুক্তির সনদ নামে অভিহিত করা হয়। ছয় দফার ভিত্তিতেই ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।

বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের ভূমিকা তুলে ধরে বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৪ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি মুক্তির সনদ রচনা এবং ৬৯ এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসন অবসানের প্রতিশ্রুতি অর্জন দলটিকে মুক্তিকামী মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত করে।

“শেখ মুজিবের নেতৃত্বের জন্য আওয়ামী লীগকে ৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের মুক্তির ম্যান্ডেট দিয়েছিল। জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জনগণের এ রায়কে উপেক্ষা করে, শুরু করে প্রহসন। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্য ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের শপথ গ্রহণ করেন।”

এরপর পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অভ্যূদয় ঘটে বাংলাদেশের। তিনি হন জাতির পিতা।

শেখ হাসিনা বলেন, “তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণশক্তি। তার অবিচল নেতৃত্বে বাঙালি জাতি মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়।”

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, “জাতির পিতার আহ্বানে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বন্ধু দেশসমূহ দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। অতি অল্পদিনের মধ্যেই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং মাত্র সাড়ে তিন বছরেই স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

“১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী চক্র আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে ‘৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। বিদেশে থাকায় আমি এবং আমার বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যাই।”

ওই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “মোশতাক-জিয়া চক্র খুনিদের বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারা মার্শাল ল’ জারির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করে পাকিস্তানি কায়দায় দেশ শাসন করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে।”

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসনে নির্যাতন আর নিপীড়নের মধ্যে পড়ে ঐতিহ্যবাহী এই দলটি। নেতাদের মধ্যেও দেখা দেয় বিভেদ।

১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি হিসাবে দেশে ফিরে কয়েকভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন, আন্দোলন শুরু করেন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে।

২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। পাঁচ বছর শাসনের পর ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। কিন্তু, দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কারচুপির মাধ্যমে তাদের হারানো হয়েছে।

এরপর দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়ী হয়ে পুনরায় সরকারে ফেরে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

সূত্র: বিডিনিউজ