ভাষানীতি হলো না ৫০ বছরেও

অনলাইন ডেস্কঃ
বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনও উপেক্ষিত। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও হয়নি ভাষানীতি। ফলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও উচ্চ আদালত, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহূত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষাকে গুরুত্বহীন করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব পাচ্ছে ইংরেজি ও আরবি ভাষা। আবার বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিই প্রণীত হয়েছে সম্পূর্ণ ইংরেজি ভাষায়। একইভাবে ভাষানীতি না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষা।

এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই দেশে আজ রোববার ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর পূর্ণ হলো। পালিত হচ্ছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এ দিনে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিল বাঙালিরা। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। অথচ এখনও উপেক্ষিত সর্বত্র বাংলা ভাষা চালুর বিষয়টি। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভাষাসংগ্রামী, শিক্ষাবিদসহ বিশিষ্টজন। তাদের মতে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উদাসীনতায় স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য ভাষানীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সব সরকারি অফিস, আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না। তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনো দিনই বাংলা চালু করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।’ এরপর বাহাত্তরের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পাসের মধ্য দিয়ে দেশে কার্যকর করা হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের বাংলাদেশ সংবিধান। সেই সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্রভাষা’ প্রসঙ্গে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ সংবিধানের আরও তিনটি অনুচ্ছেদে বাংলা ভাষার কথা উল্লেখ রয়েছে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে দেশে আইনও করা হয় ১৯৮৭ সালে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে উচ্চ আদালত কয়েক দফা নির্দেশনা দিলেও টনক নড়েনি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ফলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ এবং বাংলা একাডেমির ‘প্রমিত বানানরীতি’ও মানা হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাতীয় অধ্যাপক ভাষাসংগ্রামী ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে সবার ঘুম ভাঙে। এরপর আবার সবাই ঘুমে চলে যায়। কাজেই এ নিয়ে আলোচনা অর্থহীন।’ তার মতে, ‘যদি সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে আমাদের ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের দিকে নজর দিতে হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের গঠিত এই কমিশন পঁচাত্তরের আগেই রিপোর্ট দিয়েছিল।’

আরেক ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক সমকালকে বলেন, ‘বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রেণিস্বার্থের প্রয়োজন মিটে গেছে। তখন থেকেই তারা ঔপনিবেশিক ভাবধারায় ইংরেজি ভাষাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছেন। ফলে নতুন করে ইংরেজির বাংলা পরিভাষা তৈরি হয়নি। মূলত এ জন্য যে পরিশ্রম করা দরকার সেটি আমরা করতে চাইনি।’

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের সংগঠক আহমদ রফিক আরও বলেন, ‘এখনও সময় আছে, একটি ভাষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। যারা দ্রুততম সময়ে একটি ভাষানীতি প্রণয়ন করে বাংলা ভাষা ব্যবহারে যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। এর সঙ্গে বাংলা পরিভাষা প্রণয়ন এবং অনুবাদের দিকেও আমাদের নজর বাড়াতে হবে। নয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে ইংরেজি ভাষার বিস্তার ঠেকানো যাবে না। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভাষার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’

পৃথিবীর অনেক দেশের মধ্যে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোতে রয়েছে নিজস্ব ভাষানীতি। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালেও রয়েছে নিজস্ব ভাষানীতি। এর আলোকে তাদের উচ্চ আদালতে মাতৃভাষায় রায় দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশের উচ্চ আদালতে এখনও বাংলা ভাষা ব্যবহার হয় কালেভদ্রে। শতাধিক বিচারপতির মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাংলায় রায় দিয়েছেন ১২ জন বিচারপতি। তাদের মধ্যে নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দেন একজন বিচারপতি।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, ‘বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়াটা শুধু জরুরি নয়, অত্যাবশ্যক। কারণ দেশের নাগরিক বিশেষ করে যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন তারা যখন মামলা করেন, তার রায় ও আদেশ মাতৃভাষায় বোধগম্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া আমরা বহু আগেই ঔপনিবেশিক আমল পেরিয়ে এসেছি, সেই মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। এ জন্যই সরকার উচ্চ আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে।’

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, ‘বিচারকদের মানসিকতার কারণে উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। তাদের সদিচ্ছা থাকলে অধস্তন আদালতের মতোই উচ্চ আদালতের সর্বত্র বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া সম্ভব। প্রথম দিকে কিছু সমস্যার মুখোমুখি তারা হবেন ঠিকই, কিন্তু যখন নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিতে থাকবেন তখন আর সে সমস্যাগুলো থাকবে না। সমাধান বের হয়ে আসবে।’

ভাষানীতি প্রণয়ন করতে হলে ভাষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এর আওতায় ভাষা জরিপও করতে হবে। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত কোনো ভাষা জরিপ হয়নি। জানা যায়, ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি থেকে আঞ্চলিক ভাষার জরিপ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র উদ্যোগে কার্যক্রম শুরুর পর জরিপের প্রশ্নমালাও তৈরি করা হয়। জনগণকে এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে। পরে শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইউম তিনটি উপজেলায় প্রশ্নমালার ভিত্তিতে জরিপও করেন। তিনি তখন বাংলা একাডেমির সংকলন বিভাগের সহকারী অধ্যক্ষ ছিলেন। তবে ওই কার্যক্রম পরে সফলতার মুখ দেখেনি। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এখন বাংলা একাডেমির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও কাজ করছে। কিন্তু তাদের ভূমিকা প্রকাশনার পাশাপাশি সেমিনার বা কর্মশালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অবশ্য বাংলা ভাষা সর্বস্তরে প্রচলনের জন্য স্বাধীনতার পর থেকে এক ডজনেরও বেশি আদেশ, পরিপত্র বা বিধি জারি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ভাষাবিজ্ঞানী ড. সৌমিত্র শেখর সমকালকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষানীতি, পররাষ্ট্র্রনীতি, খাদ্যনীতিসহ কত নীতিই না আছে! কিন্তু যে ভাষাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই ভাষা রক্ষার জন্য ভাষানীতি হয়নি স্বাধীনতার ৫০ বছরেও। এটি দুঃখজনক। ফলে বাংলা ভাষা ব্যবহারে যথেচ্ছাচার বেড়েই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাইনবোর্ডগুলোতে ইংরেজি লেখার নিচে ছোট করে বাংলা লেখা হয়। বইপুস্তকেও ভুলে ভরা বানান লক্ষণীয়। ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষ প্রায়ই প্রতারিত হচ্ছে। একই অবস্থা শেয়ারবাজারেও। তারা যেসব বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে তার সবই ইংরেজিতে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার হলে বরং সাধারণ মানুষই উপকৃত হতো।’

ভাষানীতি প্রণয়নে অবিলম্বে ভাষা কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে সৌমিত্র শেখর আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৎপরতায় ১৯৯৬ সালে আমরা বাংলা ভাষাকে ‘আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছি। ৫০ বছরে ভাষা নিয়ে অর্জন এটুকু। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি ছাড়া ইনস্টিটিউটটি আর কোনো ভূমিকা পালন করছে না। ভাষানীতি প্রণয়নের জন্য কখনও ভাষা কমিশন গঠন করা হয়নি।”

বিষয়টি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের নজরে নেওয়া হলে তিনি সমকালকে বলেন, ‘ভাষানীতি প্রণয়নের বিষয়টি সরকারের কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে। আর বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠানেই সমস্ত কার্যক্রমই এখন বাংলায় হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি- সাহিত্য-সংস্কৃতির সর্বস্তরে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক।’

সূত্রঃ সমকাল