একুশের পথরেখাঃ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

সেলিনা হোসেনঃ
ফেব্রুয়ারি বাঙালির ভাষার মাস। একই সঙ্গে ফাল্কগ্দুনের বসন্ত বাতাসের মাস। বাঙালি তার একুশের চেতনার বসন্ত বাতাস ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে। এ বছরে পালিত হচ্ছে একুশের ৬৯ বছর পূর্তি। আমরা একুশকে দেখি সেই মর্যাদার জায়গা থেকে, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ।’ এটি শুধু ইতিহাসের কথা নয়- এই উচ্চারণ বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের বড় পরিসর। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির দার্শনিক চেতনার আলোকিত দিকদর্শন।

বিশ্বের যে দেশে বাঙালিরা আছে, তারা একুশের উদযাপন করে বিদেশিদের উদ্ভাসিত করে তুলেছে। মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে প্রাণ দিয়েছে বাঙালি। অধিকারের দাবিতে রাজপথ আলোকিত করে নির্ভয়ে সংগ্রাম করেছে। মাতৃভাষার মর্যাদার দাবিতে জীবন উৎসর্গ করার এমন নজির বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। সুতরাং একুশে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বের মানুষের সামনে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।

ইউনেস্কো এই দিবসটিকে এভাবে ঘোষণা করেছে। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে দিবসটির তাৎপর্য। ইউনেস্কোর জরিপে উঠে এসেছিল যে, বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা তার জাতিসত্তার অধিকার। এই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। সুতরাং ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। বিশ্বের নানা দেশে বাস করা বাঙালিরা এই দিবস উদযাপন করে, আবার নিজের সন্তানদের বাংলা ভাষা শিখিয়ে মর্যাদার জায়গাটা সুরক্ষিত রাখছে।
নিউইয়র্কে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ১৯৯২ সাল থেকে বইমেলার আয়োজন করছে। এই বইমেলা প্রবাসী বাঙালির জীবনে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত করে। বাংলাদেশের লেখকরাও প্রতিবছর বইমেলায় যোগদান করেন। নিউইয়র্কে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। শিশুদের শহীদ মিনারে নিয়ে উৎসবের আয়োজন করা হয়। প্রবাসী বাঙালিরা একুশের বোধকে সম্প্রসারিত করে চলেছে বিশ্বের প্রতিটি দেশে।

বইমেলার আয়োজন করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ। বিদেশের মাটিতে বাঙালির বইমেলা একুশের চেতনার বড় দিগন্ত। মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের প্রতীকী দিন একুশে ফেব্রুয়ারি দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মাত্রায় পৌঁছেছে।

কানাডার মন্ট্রিয়লে কয়েক বছর ধরে একুশের বইমেলার আয়োজন করা হয়। ‘কানাডা-বাংলাদেশ সলিডারিটি’ সংগঠন এই বইমেলার আয়োজন করে ‘কানাডা একুশে বইমেলা’ নামে। আমি ২০১৮ সালে ষষ্ঠ বইমেলায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম। বিদেশের মাটিতে একুশের বইমেলা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। শিশুদের হাতে বাংলা বই তুলে দেওয়া ছিল গভীর আনন্দের। ওদের অনেকেই বলেছিল, আমরা পড়তে পারব। যারা এখনও বাংলা শেখেনি, তাদের আমরা বাংলা শেখাব। ছোটদের মুখে এমন কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। একুশের কথা ওরা বাবা-মায়ের কাছে শোনে। অনুষ্ঠানে গেলে প্রাণভরে গান গায়- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ ৬৯ বছর ধরে এই গান বাঙালির প্রাণ জুড়িয়েছে। মাথা উঁচু করেছে। বিদেশি মানুষকে গানের সুরে মাতিয়েছে একুশের চেতনায়। বিদেশের মাটিতে অনবরত প্রবাহিত হচ্ছে একুশ।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়েছিলেন। এই দিনটিকে নিউইয়র্কের গভর্নর ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিবছর দিবসটি উদযাপিত হবে। এটিও আর একটি নবতর সংযোজন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। তিনিও বাংলা ভাষার মর্যাদাকে এগিয়ে নেওয়ার চিন্তায় আছেন। চিন্তায় শুধু নন, ধারাবাহিকভাবে কর্মেও এগিয়ে নিচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ নানাভাবে বিশ্বের পত্র-পত্রিকায় উঠে আসছে।

একুশের যাত্রাকে ধরে প্রবাসী বাঙালিরা যদি বাংলাদেশের সাহিত্য বিদেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন, তবে সেটি হবে আমাদের আন্তর্জাতিক মাত্রার একটি গর্বের জায়গা। বিদেশি পাঠকরা বাংলাদেশের সাহিত্যের সূত্র পাবে। আমাদের গভীর বিশ্বাস, বাংলাদেশের সাহিত্য আন্তর্জাতিক দরবারে পৌঁছে যাবে।
১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসেছিলেন। তিনি ভাষণের এক জায়গায় বলেছিলেন, বাংলা সাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ। এই সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে পৌঁছে দিতে হবে। তার মৃত্যু আমাদের এই স্বপ্ন থেকে ছিটকে ফেলেছে। আমাদের নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

প্রত্যাশা করি নতুন প্রজন্মের কাছে। বিদেশে লেখাপড়া শিখে তারা যদি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চার আগ্রহী হয়, তাহলে বাঙালির একুশের চেতনা নতুন মাত্রায় ফুটে উঠবে। শুধু উৎসব-অনুষ্ঠানে নয়; ইংরেজি ভাষায় রচিত্র কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি রচনা বাঙালির জনজীবনকে ফুটিয়ে তুলবে।
মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় সমতার জায়গা তৈরি করব, প্রেমের গল্প তৈরি হবে নানা ধারণায়। বাংলাদেশের সাহিত্য ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে কিংবা ইংরেজিতে রচনার মাধ্যমে একুশের চেতনার মূলধারা সম্প্রসারিত করুক। প্রবাসী বাঙালিদের একুশ হোক আরও সুদূরপ্রসারী চিন্তায় বাংলা ভাষা-বাংলাদেশের সীমানার আকার বৃদ্ধি।

২০২১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শান্তি-স্বস্তির দিগন্তজুড়ে করোনাকালের সমাপ্তি ঘটাক। আমাদের প্রজন্ম স্বস্তির নিঃশ্বাসে তৈরি হয়ে উঠুক।

সূত্রঃ সমকাল।