টিকাদানে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সরকার

অনলাইন ডেস্কঃ
করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সরকার। এজন্য টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে এ-সংক্রান্ত সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায় স্বাস্থ্য বিভাগ। যাতে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক কিংবা প্রশ্ন না ওঠে। সরকারের গাইডলাইন মেনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সবাইকে টিকার আওতায় আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্নিষ্ট বিভাগ ও সংস্থাগুলো কাজ করছে। সংশ্নিষ্টদের আশঙ্কা, টিকা নিয়ে একটি মহল গুজব ও অপপ্রচার সৃষ্টি করতে পারে। এতে করে টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সুতরাং যে কোনো ধরনের গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে টিকার সার্বিক বিষয় তুলে ধরে জনসাধারণকে অবহিত করতে জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার টিকা আসার পর এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি চক্র সরকারবিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছে। ওই চক্রটি সব নিয়ে গুজব ও অপপ্রচারে লিপ্ত। প্রথমে টিকাপ্রাপ্তি নিয়ে তারা গুজব ছড়িয়েছিল। এরপর টিকার দাম নিয়ে। এখন টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে ওই চক্রটি প্রক্রিয়াটিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এজন্য সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টিকা নিয়ে গুজব ও অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টিকাদানের পরিকল্পনা : ভারত সরকারের উপহারের টিকার ২০ লাখ ডোজ ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে ২৫ জানুয়ারি ভারত থেকে সরকারের কেনা অক্সফোর্ডের টিকার ৫০ লাখ ডোজ দেশে পৌঁছাবে। ওই টিকা হাতে আসার পর আগামী ২৭ অথবা ২৮ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার একটি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষণমূলক টিকাদান শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। প্রথম দিন সরাসরি করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার ২০ থেকে ২৫ জনকে টিকা দেওয়া হবে। ব্যাপকহারে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চারশ থেকে পাঁচশজনকে টিকা দিয়ে সাত দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর গণটিকাদান শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই টিকাদান কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। প্রতিদিন দুই দিন দুই লাখ ডোজ করে প্রথম মাসে ৬০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হবে। এই টিকা নিয়ে আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন শুরু হবে।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর সমকালকে বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অক্সফোর্ডের টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও দেশে এই টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়নি। এ কারণে গণটিকাদান শুরুর আগে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সাফল্যের পর গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। প্রতিদিন ২ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। মাসে ৬০ লাখ মানুষ টিকার আওতায় আসবে।

টিকা নিয়ে সতর্কতামূলক প্রচার :করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে যাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিংবা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেজন্য বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য থেকে শুরু করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে টিকা নেওয়ার পর কয়েকশ মানুষের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ কারণে সেসব দেশে টিকা নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকে টিকা নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। টিকা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দূর করতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সচেতন করছে সরকার।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকার ন্যায্যতা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কভিড-১৯ টিকা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা অগ্রাধিকার পাবেন। জরুরি সেবাপ্রদানকারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, সামনের সারির সেবাপ্রদানকারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক, শিক্ষক ও যাদের বয়স আঠারো বছরের ওপরে তাদেরসহ জনগণকে পর্যায়ক্রমে টিকা দেওয়া হবে। নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নির্ধারিত কেন্দ্রে নির্দিষ্ট দিনে টিকা দেওয়া হবে। নিবন্ধনের জন্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।

টিকায় জটিলতা হলে করণীয় : সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণের পর জটিলতা ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে বলা হয়, কভিড-১৯ টিকা নিরাপদ। তবে টিকা নেওয়ার পর কারও কারও ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- টিকা প্রয়োগের জায়গায় ফুলে যাওয়া, সামান্য জ্বর হওয়া, বমি বমি ভাব, মাথা ও শরীর ব্যথা। এ লক্ষণগুলো দুই-একদিন থাকতে পারে। টিকা নেওয়ার পর যে কোনো ধরনের শরীরিক সমস্যা দেখা দিলে নির্ধারিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা স্বাস্থ্যকর্মী অথবা চিকিৎসকের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করুন। টিকা নেওয়ার পর টিকাকেন্দ্রে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। টিকা গ্রহণের পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন।

জাতীয় টিকা বিতরণ কমিটির সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক সমকালকে বলেন, কোভিশিল্ড টিকায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার দুই থেকে তিন শতাংশের মতো। তবে যেকোনো টিকার ক্ষেত্রেই মাইল্ড থেকে মডারেট বা সিভিয়ার সাইড এফেক্ট হতে পারে। বাংলাদেশে শিশু এবং বড়দেরও যে টিকা দেওয়া হয় সেখানে এনাফাইলিক্সিস বলে একটা কথা রয়েছে। এই এনাফাইলিক্সিস হচ্ছে একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া। এটি হতেই পারে। এই এনাফাইলিক্সিসের আবার বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। সুতরাং যারা মানুষকে টিকা দেবেন, টিকাদান কেন্দ্রে যারা থাকবেন, তাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত করা হবে।

ডা. শামসুল হক আরও বলেন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিন্তা করে উপজেলা, জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কেন্দ্রভিত্তিক মেডিকেল টিম থাকবে এবং কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সংখ্যক ওষুধ এনাফাইলিক্সিসের জন্য মজুদ রাখা হবে। যাতে চিকিৎসক দল সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত হতে পারেন অথবা উপজেলা হাসপাতালে চলে আসেন। উপজেলা হাসপাতালেও যদি এমন দুর্ঘটনা ঘটে সে বিষয়টি ভেবে সেখানে প্রস্তুতি নেওয়া থাকবে বলে জানান তিনি।

টিকা নিয়ে ভীত না হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের : করোনাভাইরাস নিয়ে জনসাধারণকে ভয় কিংবা আবেগতাড়িত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দেশে দেশে করোনাভাইরাসের যেসব টিকা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো ফার্স্ট জেনারেশন বা প্রথম প্রজন্মের টিকা। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে ফোর্থ ট্রায়ালও বলা যায়। হাজার হাজার মানুষকে এই টিকা দেওয়ার পর তা আবার বিশ্নেষণ করা হবে। তারপর সেকেন্ড জেনারেশন বা দ্বিতীয় প্রজন্মের টিকা দেওয়া শুরু হবে। প্রথম প্রজন্মের টিকা আগে এত বড় আকারে ব্যবহার হতো না। কারণ, আগে হাতে সময় ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এখন হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই। যত দ্রুত টিকা পাওয়া যায়, সেই চেষ্টা সবাই করছে। এ জন্য প্রথম প্রজন্মের টিকাই বিশ্বজুড়ে সবাই নিচ্ছে। কয়েকটি দেশে টিকা গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, টিকা নেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। টিকা নিয়ে অযথা ভয় কিংবা আবেগতাড়িত হওয়ার কিছু নেই।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, টিকা আসা নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এখন সেটি কেটে গেছে। এখন ন্যায্যতা অনুযায়ী জনগণকে টিকা নিশ্চিত করতে হবে। টিকা নেওয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় কয়েকটি দেশে টিকা নিয়ে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। টিকাগ্রহীতাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। টিকা নেওয়ার পর কোনো ধরনের শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হলে সঙ্গে সঙ্গে তার চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাহলে টিকা নিয়ে জনমনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দূর হবে বলে মনে করেন তিনি।

টিকা পেতে নিবন্ধন করতে হবে অ্যাপে : টিকাদানের সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন হবে ‘সুরক্ষা’ নামে একটি অ্যাপের মাধ্যমে। তথ্য ও যোগযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই অ্যাপটি তৈরি করেছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে আজ এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে এই অ্যাপের মাধ্যমে টিকাগ্রহীতাদের নিবন্ধন শুরু হবে। এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অ্যাপটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। স্মার্ট মোবাইল ফোনে অ্যাপটি ডাউনলোড করে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ থেকেই নিবন্ধন করতে পারবেন। নিবন্ধনের জন্য ফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, নাম, জন্মতারিখ, অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা আছে কিনা, পেশাগত পরিচয় ইত্যাদি বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি করোনাভাইরাসের দুই ডোজ করে টিকা পাবেন। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের বিস্তারিত তথ্য অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে। ভারতসহ অনেক দেশ টিকাদানে এ ধরনের অ্যাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কারা আগে টিকা পাবেন, সেই অগ্রাধিকারের তালিকাটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকেও সংগ্রহ করা যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার মূল লক্ষ্য যাতে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়। কারণ, অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের কারণে সব তথ্য সার্ভারে সংরক্ষিত থাকবে। কারা কোন সময়ে টিকা পাবেন, তাও অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে। একই সঙ্গে প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর পরবর্তী ডোজ কতদিন পরে পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কিত তথ্যও এসএমএসে জানিয়ে দেওয়া হবে। কারণ, কোটি কোটি মানুষ যখন টিকা কর্মসূচির আওতায় আসবে, তাদের সুশৃঙ্খল রাখতে হলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া বিকল্প নেই। অ্যানালগ পদ্ধতিতে এটি সম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক দেশই অ্যাপের মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। বাংলাদেশও এই প্রক্রিয়ায় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে জানান তিনি।

সূত্রঃ সমকাল