সুপথে ফেরার সুযোগ পাবে উগ্রপন্থিরা

অনলাইন ডেস্কঃ
উগ্রপন্থায় জড়ানোয় ঝুঁকিতে থাকা বা এরই মধ্যে সীমিতভাবে সম্পৃক্তদের শুরুতেই আটক বা গ্রেপ্তার না করে সুপথে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু অস্ত্র দিয়ে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা নয়, বিপথগামীদের ভালো পথে এনে পুনর্বাসন করতে চায় র‌্যাব। এরপর তারা যাতে সমাজের মূল স্রোতধারায় মিশে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে, সে ব্যাপারে জনসচেতনতাও তৈরি করা হবে।

সামগ্রিকভাবে ডি-র‌্যাডিকালাইজেশনের (উগ্রপন্থা প্রশমন) একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে র‌্যাব। প্রাথমিকভাবে একটি কমিটি করা হয়েছে; সেই কমিটিতে শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় পণ্ডিত ও র‌্যাব সদস্যদের রাখা রয়েছে। ভবিষ্যতে ডি-র‌্যাডিকালাইজেশনের ব্যাপারে আলাদা একটি স্বতন্ত্র ইউনিট খোলার চিন্তাভাবনা করছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। উগ্রবাদ মোকাবিলায় ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা যুক্ত করবে বলে মনে করছেন র‌্যাবের নীতিনির্ধারকরা।

গতকাল রোববার র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ‘মাদকসেবীর পুনর্বাসনের জন্য রিহ্যাব সেন্টার রয়েছে। যারা নানা পর্যায়ে উগ্রপন্থার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বা অদূর ভবিষ্যতে জড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে, তাদের সঠিক পথে ফেরাতে একই আদলে ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন সেন্টারও থাকা দরকার। এটা কোনো এনজিও করতে পারে। আটক বা গ্রেপ্তারের প্রাথমিক ধাপের উগ্রপন্থিদের ডেকে এনে মোটিভেশন করা হবে। শুধু আইনের কাছে সোপর্দ নয়, আমরা যদি তাদের বুঝিয়ে সঠিক পথে ফেরাতে পারি- এটাই হবে আমাদের সফলতা। উগ্রপন্থা দমনে শুধু অস্ত্র ব্যবহার করা সমাধান নয়। এটা র‌্যাব চাচ্ছেও না।’

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির সমকালকে বলেন, এটা আগে নিশ্চিত করতে হবে ধর্মের নামে কোনো রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। জামায়াতের মওদুদীবাদকে নির্মূল করতে হবে। দলত্যাগী জঙ্গিদের আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। জঙ্গিবাদের পথ থেকে ফেরত আসার পর তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সর্বহারা ও নকশালদের এক সময় সুপথে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমরাও অনেক দিন বলছি জঙ্গিদের মধ্যে যারা এখনও সেইভাবে বড় কোনো অপরাধে জড়ায়নি, তাদের ভালো পথে ফেরার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। জঙ্গিদের সুপথে ফেরানোর প্রক্রিয়া দীর্ঘ। পৃথিবীর অনেক দেশ এই পথ অনুসরণ করে সফল হয়েছে। যারা সুপথে ফিরবে, জঙ্গি দমনে র‌্যাব তাদেরই কাজে লাগাতে পারে। তারা র‌্যাবের তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করবে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, এর আগে ২০১৬-১৭ সালে পাইলট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে র‌্যাবের কাছে সাতজন উগ্রপন্থি আত্মসমর্পণ করেছিল। তারা সুপথে আসার অঙ্গীকার করে ওই সময়। যারা আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। র‌্যাব বলছে, এখন তাদের পর্যবেক্ষণ হলো ওই সময় আত্মসমর্পণকারীরা বর্তমানে ভালো আছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উগ্রপন্থিদের ভালো পথে আনার জানালা আরও বিস্তৃত করতে চায় র‌্যাব।

সে সময় র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বগুড়ার আব্দুল হাকিম, গাইবান্ধার মাহমুদুল হাসান বিজয়, দিনাজপুরের মাসুদ রানা ওরফে হাফেজ মাসুদ, হাফিজুর রহমান, মো. আক্তারুজ্জামান, রাজশাহীর সালাউদ্দিন আহমেদ সুজন ও কুষ্টিয়ার মোর্শেদ শরীফ হাসান কল্লোল। তারা জেএমবির সদস্য ছিলেন।

র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডি-র‌্যাডিকালাইজেশনের এই উদ্যোগটি আরও আগে নেওয়ার দরকার ছিল। দেরিতে হলেও র‌্যাব এখন একে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শুরু করছে। তবে এই ধাপে কতজন এরই মধ্যে র‌্যাবের ডাকে সাড়া দিয়ে ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেই সংখ্যাটি কৌশলগত কারণে স্পষ্ট করেনি র‌্যাব। করোনাকালেও অনলাইনসহ নানা মাধ্যমে উগ্রপন্থিরা সক্রিয় রয়েছে। নতুন নতুন সদস্য রিক্রুটও হচ্ছে।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি একটি গোষ্ঠী ভাস্কর্য ইস্যুতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। এই চক্রটি উস্কানি দিয়ে এর সঙ্গে জঙ্গিবাদকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের ব্যাপারেও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়াজের ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করার নামে যারা বিদ্বেষপূর্ণ ও ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তাদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

র‌্যাব বলছে, উগ্রপন্থার ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচটি ধাপ দেখা যায়। তা হলো- সহানুভূতিশীল, সমর্থক, অ্যাক্টিভিস্ট, এক্সট্রিমিস্ট ও টেররিস্ট। যারা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে তাদের ডি-র‌্যাডিকালাইজেশনের মাধ্যমে সুপথে ফেরানো হবে। এরই মধ্যে যাদের ব্রেন ওয়াশ করার পর উগ্রপন্থায় জড়ানো হয়েছে, তাদেরও এমন প্রক্রিয়ায় ভেতরে নিয়ে আসা হবে।

উগ্রবাদ নিয়ে র‌্যাব গবেষণা করছে। সেখানে উঠে এসেছে- নানা কারণে একজন তরুণ বা যুবক উগ্রবাদে জড়ায়। তখন তার সামনে একটি স্বপ্ন দেখানো হয়। তবে কিছুদিন যাওয়ার পর সেই স্বপ্ন তাদের ভেঙে যায়। যে স্পিরিট নিয়ে তারা ভুল আদর্শের পথে পা বাড়িয়েছিল, সেখান থেকে ফেরত আসার পথ খুঁজতে থাকে। তবে অনেক সময় ফেরত আসার জানালা তারা খোলা পায় না। উগ্রবাদের পথ থেকে ফেরার সেই জানালা উন্মুক্ত করতে চায় র‌্যাব।

এর আগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে জঙ্গিদের সুপথে ফেরার অনুরোধ করা হয়েছিল। তারা আহ্বান করেছিল, ‘সঠিক পথে ফিরে আসুন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে পরিবারের অশান্তি দূর করুন। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহযোগিতা দেবে। সরকারও আপনাদের সাধারণ ক্ষমা করবে।’

তবে দেশে এমন একাধিক নজিরও রয়েছে, উগ্রপন্থার পথ থেকে ফেরত আসায় পুরোনো সহকর্মীরা তাকে হত্যা করেছে। আবার অনেককে হুমকিও দিয়েছে। কারও ক্ষতির জন্য উড়ো চিঠিও দেওয়া হয়। বেশ কয়েকজন গোপনে সুপথে ফিরে এলেও নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকজন উগ্রপন্থি ভুল পথ থেকে সঠিক পথে আসার সুযোগ নিয়েছে। অনেককে কাউন্সেলিং করানো হয়েছে।

সূত্রঃ সমকাল