ব্যক্তিগত অডিও-ভিডিও ফাঁস বন্ধ করতে আইন সংশোধন হচ্ছে: মন্ত্রী

অনলাইন ডেস্কঃ
ফোনে আলাপের অডিও কিংবা ভিডিও ফাঁস রোধ করে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা দিতে এই সংক্রান্ত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

 

আনুষ্ঠানিক প্রয়োজন ছাড়া এবং গ্রাহকের অজান্তে তার ফোনের কল রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রকাশ বন্ধে হাই কোর্ট জোর দেওয়ার প্রেক্ষাপটে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার একথা জানিয়েছেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বর্তমান বিশ্বে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে- জানতে চাইলে মোস্তফা জব্বার বলেন, “মোবাইল ফোনে অডিও-ভিডিও রেকর্ড করে তা ফাঁস করার মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে আইনের একটি ধারা সংশোধন করা হচ্ছে।

“ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ডাটা প্রাইভেসি রক্ষার বিষয়টি একটি ধারা সংযুক্ত করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

একটি মামলায় আসামির মোবাইল কললিস্ট তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে প্রত্যাখ্যান করে সম্প্রতি হাই কোর্ট এক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলে, “হরহামেশাই আমরা দেখতে পাচ্ছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অডিও, ভিডিওসহ নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছড়িয়ে পড়ছে বা প্রকাশ করা হচ্ছে।

“আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে চিঠিপত্রসহ নাগরিকের অন্যান্য যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী কেউ বা কোনো অংশ চাইলেই তা সহজেই লঙ্ঘন করতে করতে পারে না।”

মোবাইল ফোন অপারেটররা গ্রাহকের কল রেকর্ড সংরক্ষণ করলেও ভয়েস রেকর্ড করে না বলে জানিয়েছে।

তবে ব্যক্তিগতভাবেও নানা অ্যাপে কলরেকর্ড সংরক্ষণ করার নানা উপায় এখন রয়েছে। যে কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য রেকর্ড করে তা সহজেই ছড়িয়ে দিতে পারেন সোশাল মিডিয়ায়।

মোস্তফা জব্বার বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, এসব বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন-২০১০ সংশোধন করা হচ্ছে।

“সোশাল মিডিয়া পরিচালনা করতে হলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী করতে হবে, এখানে আর্থিক লেনদেন, নিরাপত্তা ও ডাটা সংক্রান্ত বিষয়গুলো থাকবে। এখানেও আইনের দিক থেকে এগিয়ে যাওয়া যাবে।”

ভয়েস কল রেকর্ড করে না মোবাইল অপারেটররা

মোবাইল ফোন অপারেটরটা জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী তারা ভয়েস কল রেকর্ড রাখতে পারে না, শুধু কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) রাখতে পারে।

একাধিক মোবাইল ফোন অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জিজ্ঞাসায় বলেন, আইন মেনে ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’ সরকারের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছেই এ তথ্য সরবরাহ করে থাকেন তারা।

সিডিআর হচ্ছে কোনো গ্রাহক কার কাছে কী কল করেছে বা তাকে কে কল দিয়েছে, তার রেকর্ড। ফোর-জি নীতিমালা অনুযায়ী এই রেকর্ড অপারেটরদের কাছে দুই বছরের জন্য সংরক্ষিত থাকে।

যে কেউ চাইলেই এ সিডিআর সংগ্রহ করতে পারে না জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “আইন অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট করা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা এই সিডিআর সংগ্রহ করতে পারে। ওই তালিকার বাইরে কেউ সিডিআর সংগ্রহ করার ক্ষমতা রাখে না।”

তিনি বলেন, ভয়েস কল রেকর্ড মোবাইল ফোন অপারেটররা না রাখলেও সরকারি কোনো কোনো সংস্থা ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’ রেকর্ড করার ক্ষমতা রাখে এবং মোবাইল ব্যবহারকারী কোন এলাকায় রয়েছে বা তার গতিবিধিও তারা শনাক্ত করতে পারে।

সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার আশরাফুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জিজ্ঞাসায় বলেন, “রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কোনো তথ্য নিতে আইনগতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো বাধা নেই।

“অন্য কেউ তা কোনো মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তার উদ্দেশ্যে জাতির জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু তথ্য কেউ প্রকাশ বা সহায়তা করতে চাইলে তা করতে পারে।”

আইনে ফাঁক

টেলিযোগাযোগ আইনের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা স্বার্থে বিশেষ বিধানে বলা আছে, “এ আইনে বা বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে যে কোনো টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যবহারকারীর প্রেরিত বার্তা ও কথোপকথন প্রতিহত, রেকর্ড ধারণ বা তৎসম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য সরকার সময় সময় নির্ধারিত সময়ের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা বা আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থার কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করিতে পারিবে এবং উক্ত কাজে সার্বিক সহায়তা প্রদানের জন্য টেলিযোগযোগ সেবা প্রদানকারীকে নির্দেশ দিতে পারিবে এবং পরিচালনাকারী উক্ত নির্দেশ পালন করতে বাধ্য থাকিবে।”

একেই মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখছেন অনেকে।

তথ্য প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইন করে যেভাবে কল রেকর্ড নেওয়ার উপায় রাখা হয়েছে, তাতেই ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা লঙ্ঘিত হচ্ছে।

“জাতীয় স্বার্থে অনেক কিছুই করা যেতে পারে তবে সেখানে চেইক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকা জরুরি।”

জাপান বা নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “সেখানে কোনো ব্যক্তির কলরেকর্ড বা ইন্টারনেট ডেটা তথ্য নিতে হলে আগে ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে হয়।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ডেটা প্রটেকশন আইন’ থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই।

“এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য কোনো আইন নেই। সরকারের উচিৎ, একটা ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট করা।”

ফোনে আড়ি পাতার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান থাকলেও সেখানেও রয়েছে ফাঁক।

তানজিম বলেন, “বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আড়িপাতাটা একটা অপরাধ। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৭১ ধারায় আড়িপাতার শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির ফোনে আড়ি পাতে তাহলে শাস্তি হবে।

“গোয়েন্দা সংস্থা বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত, তাদের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেওয়া হয়ছে। এখন তাদের কেউ যদি এর অপব্যবহার করে তাহলে কী হবে, যদি কোনো কারণে অপব্যবহার হয়, তাহলে কী হবে এটা কোথাও বলা নাই।”

“আমি মনে করি এই জায়গাটায় আইনের একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর আইনের এই ধারাটি তাদের জন্য বড় একটি রক্ষা কবজ হয়ে দাঁড়িয়েছে,” বলেন তিনি।

হাই কোর্ট নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার তুলে ধরে বলেছে, “আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে চিঠিপত্রসহ নাগরিকের অন্যান্য যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী কেউ বা কোনো অংশ চাইলেই তা সহজেই লঙ্ঘন করতে করতে পারে না।”

তানজিম বলেন, “আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষার যে গোপনীয়তা সেটি একটি মৌলিক অধিকার। এখানে কারও ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তা যদি কেউ ক্ষুণ্ন করে তবে মৌলিক অধিকার প্রশ্নে উচ্চ আদালতে হয়ত এ বিষয়ে প্রতিকার চাওয়া যাবে। যদি কারও কাছে তা (ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষার গোপনীয়তা লঙ্ঘনের) প্রমাণ করার সুযোগ থাকে।”

সূত্র: বিডিনিউজ