এ রকম হত্যাকাণ্ড যেন আর না ঘটে: সিনহার মা

অনলাইন ডেস্কঃ
কক্সবাজারে তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খানের মা নাসিমা আক্তার বলেছেন, এভাবে আর যাতে কেউ প্রাণ না হারায় সেটাই তার চাওয়া।

এখনকার ছোট ছোট শিশুদের সামনে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেছেন সন্তানহারা এই মা।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়া’র নেতারা সোমবার দুপুরে উত্তরায় সিনহাদের বাসায় যান তার মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তাদের সঙ্গে আলোচনার পর সাংবাদিকদের কাছে এই প্রতিক্রিয়া জানান নাসিমা আক্তার।

রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) চেয়ারম্যান খন্দকার নুরুল আফসার এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।

তিনি বলেন, “ওই ঘটনায় যে সমস্ত পুলিশ জড়িত ছিল তাদের অস্ত্রগুলো যাতে জব্দ করা হয়। এটা লাগবে তদন্তের খাতিরে। যারা তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে তারা হয়ত এটা করবে। যারা তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে তারা অত্যন্ত দক্ষ এবং পক্ষপাতহীনভাবে তদন্ত করবে।”

তদন্তের অগ্রগতিতে সন্তোষ জানান অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা। সিনহার মাও ছেলের হত্যা মামলার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

নাসিমা আক্তার বলেন, “সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত তদন্তে আমরা সন্তুষ্ট। আমার ছেলে পজিটিভ ছিল এবং সব সময় বলত ‘বি পজিটিভ’ এবং আমিও ‘বি পজিটিভ’র পক্ষে আছি।”

প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী প্রধানসহ সব বাহিনীর প্রধানদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার হৃদয় ছিঁড়ে যাচ্ছে… দেশের সুন্দর একটি পরিবর্তন আমরা আনব, আপনারাই আনবেন। একটা সুন্দর পরিবর্তনের দরকার। সামনের যে ছোট ছোট বাচ্চাগুলো রয়েছে।


“প্রত্যেক মায়ের প্রতিনিধি হিসেবে বলব যে, এই জিনিসগুলো (বন্দুকযুদ্ধ) যাতে আর না হয়। প্রত্যেকে যাতে সচেতন থাকে।”

সিনহা কেমন ছিলেন, কেন চাকরি ছেড়েছিলেন, জীবন ও চারপাশ নিয়ে তার ভাবনা কেমন ছিল তার একটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন মা।

তিনি বলেন, “আমার ছেলে সাধারণ জনগণ থেকে আরম্ভ করে সবাইকে আপন করে ভাবত, আপন করে দেখত প্রত্যেকটা মানুষকে। তার সঙ্গে গাড়িতে করে অনেক ঘুরেছি কিন্তু দেখতাম সে মেজর পরিচয় দিত না। তার যে ব্যবহার, ব্যবহার দিয়ে সে তার কাজগুলো করতে।

“আমি তাকে এই শিক্ষাই দিয়েছি, আমার এটা ভালো লাগত।”

সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর ছেলের কাছে কারণ জানতে চেয়েছিলেন জানিয়ে নাসিমা আক্তার বলেন, “তার কাছে জানতে চাইলাম যে বাবা তুমি যে চলে আসলে তাহলে প্রতিটা কোর্স এত কষ্ট করে কেন করলে? এখন কত প্রমোশন হত কত কিছু হত।

“বলত মাম্মি ক্ষমতা কী? সবার আজ আছে তো কাল নেই, মানুষের হৃদয়ের মধ্যে থাকব, মানুষের জন্য কাজ করব।”

ছেলে কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাকে মুখে বলত না, কিন্তু বুঝতাম যে, কর্মে বিশ্বাসী ছিল সিনহা। এই যে বিশ্ব ভ্রমণ করবে কিন্তু পরিকল্পনা এবং প্রতিটা বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করত। জানাতে চাইত না সারপ্রাইজ দিবে দেশকে।

“পরবর্তী জেনারেশনের কথা অনেক ভাবত। বলত, এই পৃথিবীতে আমরা ভালো থট রেখে যাই। যারা নেগেটিভ ভাবত তাদের বিষয়ে বলত যে, কেন হবে না? হবে না কেন?”

সিনহার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে তার পূর্ণ সমর্থন ছিল জানিয়ে মা বলেন, “ও যেটা করত ভেতরে ভেতরে গর্ব বোধ করতাম। আসলে ওর চরিত্রের সঙ্গে আমার চরিত্রের মিল আছে- কোনো চাহিদা ছিল না, কোনো কিছু ছিল না। সিনহা শুধু কাজ করতে চাইত, আর সে কাজের জন্য আমি কখনও বাধা দেইনি, কেন দিব?”

সিনহার বিয়ে না করার বিষয়ে তিনি বলেন, “সবাই বিয়ে করে তুমি বিয়ে করো না কেন জানতে চাইলে সিনহা বলত, আরে ওসব ঝামেলায় জড়ায়ে লাভ নেই। আমি ঘুরতে যাব, এখানে যাব সেখানে যাব, পিছুটান থাকলে সব কাজ সঠিকভাবে করা যায় না।

“ডকুমেন্টারি করতে গেল এটার বিষয়ে সিনহা ভাসা ভাসা বলত, সারপ্রাইজ দিতে চাইত।”

নাসিমা আক্তার বলেন, সিনহা চাকরি ছাড়ার পরে তিনি নিজে ও আত্মীয়-স্বজনরা জানতে চাইতেন, কী কাজ করে যে কোনো টাকা-পয়সা আসে না?

“সিনহা বলত, আমি তো আমার মনের খোরাকের জন্য কাজ করি। আমার মনের খোরাক এটা দিয়ে কেউ উপকৃত হবে। আমার দুইটা উদ্দেশ্য- আমার যেটা ভালো লাগে সেটা করব এবং এটা দিয়ে যেন কেউ উপকৃত হয়। এখানে টাকা-পয়সার কথা আসে না, আসবে না।”

নাসিমা আক্তার বলেন, “কী কাজ করো জানতে চাইলে আমাকে বলে, ডকুমেন্টারি তৈরি করছি। বলার মতো যখন হবে তখন বলব।

“ছেলের প্রতি শতভাগ আস্থা নিয়ে আমি বসে আছি, আমার ছেলে কাজ করতেছে।”

সিনহা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা-মায়ের গতানুগতিক ভাবনার বিরোধী ছিলেন জানিয়ে তার মা বলেন, “সিনহা বলত আমাদের দেশের পিতা মাতা কেমন জানি শুধু সন্তানদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চান। আরে তোমাদের (পিতা-মাতা) জন্য কেন আমরা বলির পাঠা হব?

“তোমরা সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে গল্প করবে, আর আমরা আমাদের তো মনের ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে; কেন? তাই বলত। এগুলো বলে আমার সঙ্গে মজা করত আর আমিও তাকে বুঝাতাম আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এ রকম।”

ছেলের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “বাসায় আসত টুকটাক কাজ করত- আমার মশারি টাঙিয়ে দিত, সারা রাত কাজ করত, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরত-ফিরত। বাসায় এসে নিজে রান্না ঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে খাবার নামিয়ে গরম করে খেয়ে রান্না ঘর অনেক পরিষ্কার করে রাখত। এখানে যে সে খেয়েছে দেখলে বোঝা যেত না এত পরিষ্কার করে রাখত। কত কথা কত কী… এভাবেই দেখতাম আমার ছেলেকে।”

সিনহার একটি বিষয়ে ভয় কাজ করত জানিয়ে তার মা বলেন, “সে গাড়ি অনেক জোরে চালাত। এত জোরে গাড়ি চালায় কখন যে কী হয়ে যায়, এটাই ভাবতাম।”

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে বাহারছড়া চেকপোস্টের কাছে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা। এই হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ সাত পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিন কর্মকর্তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব।

টেকনাফ থানা থেকে ওই রাতে যোগাযোগ করা হলেও ছেলের মৃত্যুর খবর তাকে দেওয়া হয়নি জানিয়ে সিনহার মা বলেন, “সে রাতে এক ভদ্রলোক ফোন দিয়ে জানতে চাইলেন, সিনহা আপনার কী হয়? আমি বললাম, আমার ছেলে হয়। ওই লোক জানতে চাইলেন, কী করে জানেন? তখন আমি বললাম, টুকটাক কাজ করে। ডকুমেন্টারি বানানোকে আমি টুকটাকই বলি।

“এত রাত্রে এই ভদ্রলোক আমাকে ফোন করে এত কিছু জানতে চাচ্ছে কেন তা ভেবে আমি একটু রূঢ়ভাবে বললাম, আপনি কে? ওই ভদ্রলোক বললেন আপনি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতেছেন কেন, আমি টেকনাফ থানার ওসি।

“তখন ভাবলাম ওসি যেহেতু, আমার ছেলে যেহেতু গাড়ি চালায় নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। আমি ওসির কাছে জানতে চাইলাম যে, আমার ছেলের ফোনটা বাজছে কিন্তু ফোন ধরছে না ওকে একটু ফোনটা দিন।

“ওসি বলল, দেওয়া যাবে ও একটু দূরে আছে, বলে রেখে দিল। কিন্তু পরে বার বার ফোন দিচ্ছি ফোন ধরছে না।

“রাত ১টা বেজে গেছে, কিন্তু আমি কার কাছ থেকে খবর নিব অস্থির হয়ে যাচ্ছি। যেসব ছেলেরা তার সঙ্গে কাজ করে তাদের ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল না।”

সিনহা এর আগেও একবার হাওরে গেলে তাকে ফোনে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন জানিয়ে নাসিমা আক্তার বলেন, “ফিরে আসার পরে বললাম, এভাবে ফোনে না পেলে তো আমি অস্থির হয়ে যাই, আমি চিন্তা করি তখন সে তার দুই কোর্সমেটের নম্বর আমাকে দেয়। সেই রাতে আমার মোবাইলে সেভ করে দেওয়া ওই দুই কোর্সমেটের নম্বর খুঁজে পাই না, মাথাও ঠিক মতো কাজ করছিল না। পরে মেজর মহসিনের নম্বর খুঁজে পাই এবং তাকে ফোন করি।

“মহসিনকে বললাম টেকনাফ থানার ওসি ফোন করেছে তখন সে আমাকে জানায়, ওখানে আমাদের কোর্সমেট আছে আপনি টেনশন করবেন না। আপনি ঘুমান, ওরা দেখতেছে।

“সকালে মহসিনকে ফোন দিতে একটু সময় নিচ্ছি কারণ ঈদের দিন ওদের অনেক বিধি থাকে, আমি তো আমার ছেলেকে দেখেছি তাই একটু সময় নিচ্ছি ওকে ফোন দিতে। এর মধ্যে সকাল ১১টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ এসেছে। জানতে চাইল এটা মেজর সিনহার বাসা কি না। আমি ভাবলাম অনেকে ভুয়া মেজর পরিচয় দিয়ে থাকে; হয়ত আমার ছেলে সত্যিকারের সাবেক মেজর কি না এটা যাচাই করতে এসেছেন।

“আমি ভেবেছি ওখানে (কক্সবাজার) যদি কোনো জটিলতা তৈরি হয়ে থাকে তাহলে এটা থাকবে না। আমি পুলিশকে সহযোগিতা করেছি এবং ওনারাও আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে চলে যান।

“তবে পুলিশ জানতে চেয়েছিল, সিনহা কেন চাকরি ছেড়েছে এবং কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না। আমি যা যা সত্য তা বলে দিয়েছি এবং সে কখনও কোনো দিন দেখিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে।”

সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার বলেন, “আমাদের একটাই আবেদন, দ্রুত তদন্ত করে এবং সঠিকভাবে তদন্ত করে বিচারটা যেন হয়।

“এটা যেন একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অন্যদের মোটিভেট করে যে, আইনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল এবং আমাদের দেশে আইন আছে, আমাদের দেশে বিচার হয়।”

রাওয়া-এর চেয়ারম্যান খন্দকার নুরুল আফসার বলেন, “মর্নিং শোজ দা ডে। এ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে আমরা যা দেখেছি, সরকারের যে মনোভাব, প্রশাসনের যে মনোভাব। আপনারা শুনতে পেলেন সিনহার মাও খুশি এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের অ্যাসোসিয়েশনের আমি চেয়ারম্যান, তাদের পক্ষ হয়ে বলছি, আমরা এ পর্যন্ত খুশি।

“আমাদের আবেদন বিচারটা যাতে দীর্ঘায়িত না হয়। কারণ এটা ইতোমধ্যে প্রমাণিত, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যে প্রমাণিত ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যা যাতে আর না হয়।”

অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “আজ সিনহার বিষয়ে আমরা সোচ্চার হয়েছি। কিন্তু ওই যে ১৪০টা মার্ডার হয়েছে, একটা একটা করে প্রত্যেকটার বিচার হোক।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ